শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২২

ফ্রিঙ্গার প্রিন্টের জনক বাংলাদেশী বিজ্ঞানী কাজি আজিজুল হক | Kazi Azizul hoq


কাজি আজিজুল হকের পারিবারিক নাম কাজি সৈয়দ আজিজুল হক। তিনি জন্মেছিলেন ১৮৭২ সালে। ব্রিটিশ ভারতের খুলনা জেলার ফুলতলার পয়োগ্রাম কসবায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজের গণিতের ছাত্র ছিলেন।


আঙুল ছাপ আবিষ্কার

১৮৯২ সালে তিনি কাজ শুরু করেন কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ে। তখন অ্যানথ্রোপমেট্রি (মানবদেহের আকৃতি) পদ্ধতিতে অপরাধীদের শনাক্ত করার কাজ চলত। গণিতের ছাত্র এবং সদ্য সাব-ইন্সপেক্টর পদে চাকরি পাওয়া আজিজুল হক অক্লান্ত চেষ্টার ফলে তিনি যে পদ্ধতি উদ্ভাবন বা আবিষ্কার করলেন, তা-ই ‘হেনরি সিস্টেম’ বা ‘হেনরি পদ্ধতি’ নামে পরিচিত হলো] কাজের পুরস্কার হিসেবে আজিজুল হককে দেওয়া হয়েছিল ‘খান বাহাদুর উপাধি’, পাঁচ হাজার টাকা এবং ছোটখাটো একটা জায়গির। চাকরিতে পদোন্নতি পেয়ে হয়েছিলেন পুলিশের এসপি।


মৃত্যু

অবিভক্ত ভারতের চম্পারানে (বর্তমানে ভারতের বিহার রাজ্যের একটি জেলা যা উত্তর চম্পারান নামে পরিচিত) কাটে তার জীবনের শেষ দিনগুলো।[১] সেখানেই তিনি ১৯৩৫ সালে মারা যান। বিহারের মতিহারি স্টেশনের অনতিদূরে তার নিজের বাড়ি ‘আজিজ মঞ্জিল’-এর সীমানার মধ্যে তাকে সমাহিত করা হয়। ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর তার পরিবারের অন্য সদস্যরা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশে চলে আসেন। মরহুম আজিজুল হকের পুত্র আসিরুল হক পুলিশ বিভাগের ডিএসপি হয়েছিলেন। তার দুই বিখ্যাত নাতি ও নাতনি হচ্ছেন যথাক্রমে ইতিহাসের অধ্যাপক সালাহউদ্দিন আহমেদ (১৯২২-২০১৪) এবং শহীদ জায়া বেগম মুশতারী শফী (১৯৩৮-২০২১)।


মৌলিক গবেষণা

২০০১ সালে প্রকাশিত কলিন বিভান তার ফিঙ্গারপ্রিন্টস গ্রন্থে তার গবেষণার মৌলিকত্ব সম্পর্কে লিখতে গিয়ে জানাচ্ছেন, অ্যানথ্রোপমেট্রিক পদ্ধতি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আজিজুল হক ভয়ানক অসুবিধার সম্মুখীন হন। ফলে নিজেই হাতের ছাপ তথা ফিঙ্গারপ্রিন্টের শ্রেণীবিন্যাসকরণের একটা পদ্ধতি উদ্ভাবন করে সে অনুযায়ী কাজ করতে থাকেন। তিনি উদ্ভাবন করেন একটা গাণিতিক ফর্মুলা। ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙুলের ছাপের ধরনের ওপর ভিত্তি করে ৩২টি থাক বানান। সেই থাকের ৩২টি সারিতে সৃষ্টি করেন এক হাজার ২৪টি খোপ। বিভান আরও জানাচ্ছেন, ১৮৯৭ সাল নাগাদ হক তার কর্মস্থলে সাত হাজার ফিঙ্গারপ্রিন্টের বিশাল এক সংগ্রহ গড়ে তোলেন। তার সহজ-সরল এই পদ্ধতি ফিঙ্গারপ্রিন্টের সংখ্যায় তা লাখ লাখ হলেও শ্রেণীবিন্যাস করার কাজ সহজ করে দেয়।


ব্রিটেনের ‘দ্য ফিঙ্গারপ্রিন্ট সোসাইটি’ ফেন্সির উদ্যোগে চালু করেছে ‘দ্য ফিঙ্গারপ্রিন্ট সোসাইটি আজিজুল হক অ্যান্ড হেমচন্দ্র বোস প্রাইজ’। যাঁরা ফরেনসিক সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে সবিশেষ অবদান রাখবেন, এ পুরস্কার দেওয়া হবে তাদেরই।

মঙ্গলবার, ২ আগস্ট, ২০২২

আল-জাহরাভি : Al-Zahrawi


কর্ডোভার সোনালি যুগের বিখ্যাত শল্যচিকিৎসাবিদ আবুল কাসিম আল-জাহরাভি, যিনি পৃথিবীকে উপহার দেন তার শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ‘আত-তাসরিফ’। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও গবেষকদের মতে, আল-জাহরাভি স্পেনের আরব চিকিৎসাবিদদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ শল্যবিদ ছিলেন। ইউরোপে তিনি আল-বুকাসিস (Albucasis), বুকাসিস (Bucasis) ও আল-য়্যারভিয়াস (Alyaharvious) নামে পরিচিত।


পুরোনাম:

আবুল কাসিম খালাফ ইবনে আল-আব্বাস আল-জাহরাবি ।

জন্ম:

৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে স্পেনের আন্দালুসিয়ার আজ-জাহরা শহরে আল-আনসারি গোত্রে তাঁর জন্ম। এই শরহটি কর্ডোবা থেকে 8 কিলোমিটার উত্তর পশ্চিম  অবস্থিত।

শৈশব ও শিক্ষাদীক্ষা:

তার শৈশব এবং শিক্ষা সম্পর্কে কোনো তথ্যই আমাদের হাতে নেই। যত দূর জানা যায়, জীবনের প্রায় পুরোটা সময়ই তিনি স্পেনের কর্ডোভার বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন শাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা ও চিকিৎসা শাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। খুব সম্ভবত মৃত্যুর কয়েক বছর পূর্বে তিনি এল-জাহরা শহরে স্থানান্তরিত হন এবং বাকি জীবনটা সেখানেই কাটান।

ইতিহাসবিদগণের মতে, তিনি তার আত্মজীবনী লিখে গিয়েছিলেন। তাছাড়া, তিনি জীবিত থাকা অবস্থায়ই তাকে নিয়ে আরো অনেক লেখা হয়েছিল। দুর্ভাগ্যক্রমে, ক্যাস্টিলিয়ান ও আন্দালুসিয়ানদের মধ্যকার যুদ্ধে এল-জাহরা শহর ধ্বংস হয়ে যায়। সাথে তার ব্যক্তিগত তথ্যাদি পাবার রাস্তাও চিরতরে বন্ধ হয়।

বর্ণাঢ্যময় কর্মজীবন:

তিনি কর্ডোবায় তাঁর জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন। শিক্ষা শেষে তিনি জাহরায় চিকিৎসাসেবা শুরু করেন।শল্যচিকিৎসায় প্রথম থেকেই তিনি আশ্চর্যজনক সফলতা লাভ করেন। ফলে দ্রুত সবদিকে তার সুনাম-সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। সফলতার স্বাক্ষর হিসেবে খলিফা আবদুর রহমান ও খলিফা আবুল হাকাম – উভয়েরই চিকিৎসক হিসেবে নিযুক্ত হন। কর্ডোভার বিখ্যাত হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসক হিসেবেও নিয়োগ পান তিনি।আর এখানে থাকাকালীনই তিনি তার জীবনের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ‘কিতাব আল তাশরিফ’ রচনার কাজ শেষ করেন। এই গ্রন্থ বদলে দিয়েছিল মধ্যযুগীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের ধারা। সে সময়কার মুসলিম চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের জন্য তার ত্রিশ খণ্ডের এই বিশ্বকোষটি ছিল অক্সিজেনস্বরূপ। সার্জারি থেকে শুরু করে মেডিসিন, ফার্মাকোলজি, অপথ্যালমোলজি, অর্থোপেডিকস, প্যাথলজি, দন্তবিজ্ঞান, পুষ্টিবিজ্ঞান, শিশু চিকিৎসা- সবই অন্তর্ভুক্ত ছিল আল তাশরিফের ত্রিশ খণ্ডে। ১০০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে এই মহাগ্রন্থ রচনার কাজ শেষ করেন আল জাহরাউয়ি। সে বছরই খলিফার সহায়তায় বইটি প্রকাশিত হয়। তার ভুবনবিখ্যাত চিকিৎসাগ্রন্থ ‘আত-তাসরিফ’র মতো বিষয়বস্তু ও তত্ত্বনির্ভর এতো চমৎকার গ্রন্থ তৎকালীন যুগে আর কেউ লিখেন নি।

শল্যচিকিৎসা বিভাগের প্রভূত সংস্কার ও উন্নতি সাধন করেন তিনি।তিনি নিজেও মূলত একজন শল্যচিকিৎসকই ছিলেন। নিজের প্রিয় অধ্যায়কে সবার শেষ সংযোজন করা নিয়ে তার একটি বিখ্যাত মন্তব্য রয়েছে।

“চিকিৎসাবিজ্ঞানের সর্বোচ্চ শাখা হচ্ছে শল্যচিকিৎসা। একজন চিকিৎসক যতদিন না চিকিৎসাশাস্ত্রের অন্য সকল শাখার সাথে যথার্থভাবে পরিচিত হয়ে উঠবেন, ততদিন তার শল্যচিকিৎসার দিকে যাওয়া উচিত নয়।”

শেষ জীবনে আবুল কাসিম সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন। জীবনসায়াহ্নে তিনি চিকিৎসাগ্রন্থ প্রণয়নে মনোনিবেশ করেন। ব্যক্তিজীবনে জাহরাভি ছিলেন সাদাসিধে ও ‘অল্পে তুষ্টি’ প্রকৃতির। চিকিৎসাবিদ্যা ও ঔষধ তৈরি ইত্যাদির প্রতি ভীষণ ঐকান্তিক ছিলেন। গরিব-দুঃখী ও অসুস্থদের সেবায় নিজের অধিকাংশ সময় ব্যয় করতেন।

আল-জাহরাভির রচনা-সম্ভার:

পদার্থ, রসায়ন ও চিকিৎসা শাস্ত্রের উপর আল-জাহরাভি বিশটি গ্রন্থ রচনা করেন। চিকিৎসাবিষয়ক গ্রন্থগুলোই তাকে তৎকালীন শ্রেষ্ঠ চিকিৎসকের মর্যাদা দেয়। চিকিৎসাবিষয়ক যে গ্রন্থটি তাকে শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি দিয়েছে, সেটি হলো “কিতাবুত তাসরিফ লিমান আজিযা আনিত তা’লিফ”। এই গ্রন্থটি ৩০টি অধ্যায়ে শিক্ষাগত (Educational) ও কার্যকরী (Effective) বিস্তৃত, যার প্রথম খণ্ডে এনাটমি (Anatomy), ফিজিওলজি (physiology) ও ডায়াবেটিকস (Dietetics) নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। দ্বিতীয় খণ্ডে বিশেষত সার্জারি (Surgery) সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে। গ্রন্থটিকে অধ্যাপক সারটন ‘Medical Encyclopedia’ নামে অভিহিত করেছেন। এর চিকিৎসার অংশের চেয়ে সার্জারীর অংশ সর্বদিক দিয়ে উন্নত ও মৌলিকতার পরিচায়ক হলেও চিকিৎসার অংশেও মৌলিকতার অভাব নেই। ঔষধ তৈরি করতে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ অনুসরণে পতন (Distillation) ও ঊর্ধ্বপাতন (sublimation) প্রথা প্রয়োগ করেছেন। এসব দিক বিবেচনায় গ্রন্থটিকে অভিনব বলা চলে। এছাড়াও গ্রন্থটির দ্বিতীয় খণ্ডে বা কার্যকরী-সার্জারি অংশে রয়েছে অভূতপূর্ব বৈশিষ্ট্যবলী।তার এই গ্রন্থ, আরব বিশ্ব ছাড়িয়ে ইউরোপের সকল বিখ্যাত মেডিকেল কলেজগুলোতে প্রায় ৫ শতাধিক বছর প্রধান পাঠ্যপুস্তক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

“যে ব্যক্তি শল্যচিকিৎসাকে জীবনের লক্ষ্যে পরিণত করতে চান, তাকে অবশ্যই অঙ্গব্যবচ্ছেদবিদ্যায় পারদর্শী হতে হবে।”- আল জাহরাউয়ি

তা কিছুতে প্রথম জাহরাভি:

ঐতিহাসিকদের মতে জাহরাভিই সর্বপ্রথম চিকিৎসক, যিনি ইউরোপে বৈজ্ঞানিক প্রথায় সার্জারির প্রচলন ও এর বিশদ বিবরণ প্রচার করেন। সার্জারি খণ্ডের বিশেষত্ব হলো- এর মধ্যে সাধারণ চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে বিশেষ কোনো আলোচনা করা হয়নি, ফলে এটা এমনিতেই পরিপূর্ণ বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ খন্ডটি পৃথকভাবে চিত্রাদিসহ প্রকাশিত হয়। ডা. ক্যাম্পবেলের মতে, “এ হলো এ বিষয়ের সর্বপ্রথম স্বাধীন সচিত্রগ্রন্থ”।

সার্জারির ক্ষেত্রে এই মহান মনীষীর অপরিসীম ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী সাফল্য হলেও মেডিসিন বা ঔষধ বিষয়েও যথেষ্ট অবদান পাওয়া যায়। তিনি কুষ্ঠরোগ ও এর প্রতিকার সম্বন্ধে তাঁর গ্রন্থে আলোচনা করেছেন। তিনি অবস্থা বুঝে এ রোগের চিকিৎসা করতেন। তিনি ই সর্বপ্রথম এ রোগ সম্বন্ধে বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করেন।

জাহরাভি শিশু রোগের চিকিৎসাতেও কিছু কিছু অভিনব পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। পৃথিবীর প্রথম হাইড্রোসেফালিক সমস্যার সমাধান করার কৃতিত্ব দেয়া হয় জাহরাউয়িকে। মানুষের মাথার ক্রেনিয়াল ক্যাভিটি থেকে ‘সেরেব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড’ বা সিএসএফ নামক একপ্রকার তরল নির্গত হয়, যা মস্তিষ্ককে ঘিরে রাখে। হাইড্রোসেফালিক সমস্যা তখন হয়, যখন এই সিএসএফ তরল মস্তিষ্ক থেকে বেরিয়ে যেতে পারে না। ফলে এটি খুলির মধ্যে জমা হতে থাকে এবং শিশুদের মাথার আকৃতি অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে। কেননা শিশুদের খুলির অস্থিগুলো পরিপক্ক এবং একীভূত নয়। অন্যদিক প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে মাথার আকৃতি বাড়তে পারে না এবং প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূত হয়। এই সমস্যাকে অনেক সময় ‘মাথায় পানি জমা’ও বলা হয়।

জাহরাউয়ি তার গ্রন্থে এই সমস্যার অস্ত্রোপচারের কথা সবিস্তারে লিখেছেন।

“নবজাতক শিশুর মাথার খুলি এমনিতেই নানাবিধ তরলে পূর্ণ থাকে। মাথায় পানি জমতে থাকলে প্রতিদিন তার মাথার আয়তন বাড়তে থাকে। ফলে খুলির অস্থিগুলো একীভূত হতে পারে না। এ সমস্যার সমাধানকল্পে, খুলির মধ্যভাগে তিনটি নির্দিষ্ট স্থানে কেটে উন্মুক্ত করতে হবে। জমে থাকা তরল নির্গত হয়ে গেলে ক্ষত সেলাই করে শক্ত করে ব্যান্ডেজ করে দিতে হবে, যেন খুলির অস্থিগুলো একীভূত হতে পারে।”- আল তাশরিফ; ৩০তম খণ্ড

তিনি শিশু রোগের চিকিৎসার জন্য মাতৃস্তন থেকে দূষিত দুধ চুষে বের করার পরিবর্তে এর জন্য এক প্রকার যন্ত্র আবিষ্কার করেন। শিশুদের রিকেটস হবার কারণ এবং এর প্রতিকারেরও এক অভিনব পন্থা উদ্ভাবন করেছিলেন। তিনি শিশুদের মেরুদণ্ড বাঁকা হওয়ার কারণ সম্বন্ধে পূর্বেকার সব মতের ওপর নতুন মত প্রকাশ করেন।

চিকিৎসকদের মধ্যে তিনি সর্বপ্রথম এক্টোপিক গর্ভধারণ নিয়ে বর্ণনা করেছেন। হায়মোফিলিয়াকে তিনি সর্বপ্রথম বংশগত বৈশিষ্ট্য বলে উল্লেখ করেন।

জিরাল্ড কর্তৃক ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ:

‘আত-তাসরিফ’ গ্রন্থের সার্জারী খণ্ডটি জিরাল্ড ল্যাটিন ভাষায় মূল আরবিসহ প্রকাশ করেন। ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করে গ্রন্থটির নাম দেয়া হয় ‘De Chirurgia’। এটি সালার্নো ও মন্টেপেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক হিসেবে কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। এ গ্রন্থ ২০০ প্রকার সার্জারির যন্ত্রপাতির নমুনা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। গ্রন্থটি ইউরোপে কি পরিমাণ মর্যাদা লাভ করেছে, তা এর বারবার অনুবাদ থেকেই বোঝা যায়। ডা. ক্যাম্পবেলের মতে, গ্রন্থটি পরপর পাঁচবার ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়। আর একথা সর্বসম্মত যে, তার এ গ্রন্থের প্রভাবেই ইউরোপে সার্জারির মান বিশেষভাবে উন্নীত হয়।

আল-জাহরাভির চিকিৎসাগ্রন্থের যে কয়েকটি পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়, তন্মধ্যে দুইটি রয়েছে অক্সফোর্ডের বডলিয়েন (Bodleian) লাইব্রেরিতে এবং অন্য একটি রয়েছে গোথাতে। জিরাল্ডের ল্যাটিন অনুবাদের একটি পাণ্ডুলিপি রয়েছে প্যারিসে। এতে তিনি গ্রন্থকারের নাম দিয়েছেন Abul Casim। কিছু পাণ্ডুলিপি ফ্লোরেন্স, ব্যামবার্গ, ফ্রাঙ্কয়েস, মন্টেপেলিয়ার, লিডেন ও ডেনিস রক্ষণাগারে সুরক্ষিত আছে।

ইউরোপিয়ানদের মূল্যয়ান:

“আবুলকাসিসের চিকিৎসাপদ্ধতি এতটাই উন্নত ছিল যে সেগুলোর কাছে গ্যালেনের চিকিৎসাপদ্ধতিও হয়ে যায়! ইউরোপীয়রা অন্ধের মতো অনুকরণ করতে শুরু করে তাকে। তার দেখানো পথে চলেই ইউরোপে শল্যচিকিৎসা আজকের পর্যায়ে পৌঁছেছে!” – চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসবিদ

ডোনাল্ড ক্যাম্পবেল

তথ্য সুত্র:
1. আকবর আলী, বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান, পৃষ্ঠা: ৩৩৯)
2. al-Zahrāwī, Abū al-Qāsim Khalaf ibn ʻAbbās (১৯৭৩)। مقالة في العمل باليد: A Definitive Edition of the Arabic
3. ইন্টারনেটের বিভিন্ন সোর্স
4. উইকিপিডিয়া

লিখেছেন— Raqib Hussain

শুক্রবার, ২৯ জুলাই, ২০২২

ইবনে আল-নাফিস বা ইবনুন নাফিসের পরিচয় ও কৃতিত্ব | Ibn al-Nafis


হৃদযন্ত্রে রক্ত সঞ্চালন তত্ত্ব আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে একটি মৌলিক ও যুগান্তকারী আবিষ্কার। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সংজ্ঞা অনুযায়ী পালমনারি সঞ্চালন মানে হলো হৃদযন্ত্রের ডান প্রকোষ্ঠ থেকে শিরার মধ্য দিয়ে ফুসফুসে রক্ত চলাচল করা এবং ফুসফুসে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন গ্রহণ করার পর শিরার মধ্য দিয়ে হৃদযন্ত্রের বাম প্রকোষ্ঠে পুনরায় রক্ত ফিরে যাওয়া। হৃদযন্ত্রে রক্তপ্রবাহের এ আবিষ্কার হচ্ছে বিখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানী ইবনুল নাফিসের অমর কীর্তি।

তিনিই প্রথম ব্যক্তি গ্যালেন স্কুলের দীর্ঘকাল ধরে চলা বিতর্ককে চ্যালেন্জ করেছিলেন যে, কার্ডিয়াক ইন্টারভেন্ট্রীকুলার দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হতে পারে।

এর সাথে মিল রেখে তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে বাম ভেন্ট্রীকেলে পৌছানো সমস্ত রক্ত ফুসফুসের মধ্যে দিয়ে রায়।

ইবনে আল-নাফিসের ডান দিকের (পালমোনারি) সঞ্চালন সম্পর্কিত কাজ উইলিয়াম হার্ভের পরবর্তী কাজের (১৬২৮) পূর্বের। উভয় তত্ত্বই সঞ্চালন ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। ২য় শতাব্দীর গ্রীক চিকিৎসক গ্যালেনের রক্তসংবহনতন্ত্রের শারীরবিদ্যা সম্বন্ধে তত্ত্বটি ইবন আল-নাফিসের কাজ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন ছিল, যার জন্য তাকে "সংবহনতন্ত্রের জনক" বা "সংবহন শারীরবৃত্তির জনক" হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

উনাকে নিয়ে গবেষণা কম হওয়ার কারণ- তার জীবনী সম্পর্কে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। জানা যায় যে, তাঁর সমসাময়িক অন্য এক বিজ্ঞানী ইবনে আবি উসায়বিয়া মুসলিম স্কলারদের জীবনী লেখে খ্যাতি অর্জন করলেও ঈর্ষাবশত তাঁর নাম উল্লেখ করেন নি।

পুরোনাম:
আলাউদ্দিন আবুল হাসান আলী ইবনে আবিল হাজম ইবনুল নাফিস আল কোরাইশি আল মিসরি আশশাফি। সংক্ষেপে তিনি ‘ইবনুল নাফিস’ নামেই সর্বাধিক পরিচিত।

জন্ম:
তিনি ১২১৩ সালে ৬০৭হিজরী মোতাবেক দামেস্কের কারাশিয়ার নামের একটি গ্রামে আরব পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

জ্ঞানার্জন:
ইবনু নাফিস তার প্রাথমিক জীবন দামেস্কে অতিবাহিত করেন।

এরপর ১৬ বছর বয়সে তিনি দামেস্কের নুরি হাসপাতালে দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে ডাক্তারি পড়া শুরু করেন, যা দ্বাদশ শতাব্দীতে তুরস্কের বাদশাহ নুরউদ্দিন জেনগি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

মহাজজিব উদ্দীন আদ খাওয়ারের নিকট তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানে এত ব্যুপত্তি লাভ করেন যে, তাৎকালীন সময়ে তাঁর সমকক্ষ আর কেউ ছিল না।

তিনি বিখ্যাত দামাসিন চিকিৎসক ইবনে আবি উসাইবিয়ার সাথে সমসাময়িক ছিলেন এবং তারা দুজনেই দামেস্কের একটি মেডিকেল স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা আল-দাখওয়ার কাছে শিক্ষা গ্ৰহণ করেছিলেন।

বর্ণঢ্যময় কর্মজীবন:
১২৩৬ সালে ইবনে আল-নাফিস তার কয়েকজন সহকর্মীর সাথে আইয়ুবিদ সুলতান আল-কামিলের অনুরোধে মিশরে চলে যান। ইবনে আল-নাফিস সালাহউদ্দিন আইয়ুবী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত আল-নাসেরি হাসপাতালে প্রধান চিকিৎসক হিসেবে নিযুক্ত হন।
সেখানে তিনি বেশ কয়েক বছর চিকিৎসা শিক্ষা ও অনুশীলন করেন।

তার অন্যতম উল্লেখযোগ্য ছাত্র ছিলেন বিখ্যাত খ্রীষ্টান চিকিৎসক ইবনে আল-কাফ। ইবনে আল-নাফিস আল-মাসরুরিয়া মাদরাসায় আইনশাস্ত্রও পড়াতেন। অন্যান্য পণ্ডিতদের মধ্যে তাঁর নাম পাওয়া যায়, যা দ্বারা বোঝা যায় যে তিনি ধর্মীয় আইনের অধ্যয়ন এবং অনুশীলনে  কতটা অভিজ্ঞ ছিলেন।

ইবনে নাফিস তার জীবনের অধিকাংশ সময় মিশরে অতিবাহিত করেন।

বাগদাদের পতন ও মামলুকদের উত্থান এজাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলীর সাক্ষী ছিলেন।

একসময় সুলতান বায়বার্স এর ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এমনকি তিনি কায়রোর প্রধান চিকিৎসক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

পরবর্তী জীবনে, যখন তার বয়স ৭৪ বছর, তখন ইবনে আল-নাফিসকে নবপ্রতিষ্ঠিত আল-মানসোরি হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসক হিসেবে নিযুক্ত করা হয় যেখানে তিনি আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

চিকিৎসাশাস্ত্রে খ্যাতি অর্জনের কারণে তিনি বিপুল অর্থের মালিক হয়েছিলেন। কায়রো শহরের প্রাণকেন্দ্রে তাঁর জন্য নির্মিত করা হয়ছিল একটি বিলাসবহুল প্রাসাদ। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি তাঁর প্রাসাদ, বিশাল সম্পত্তি ও মূল্যবান গ্রন্থরাজি সুলতান আলাউদ্দিন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত (১২৮৪) মনসুরী হাসপাতালে দান করে যান।

চিকিৎসা বিজ্ঞানে অবদান:
চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই মুসলিম বিজ্ঞানীর (Muslim Scientist) নাম স্মরণীয় হয়ে আছেন রক্ত চলাচল সম্পর্কে তৎকালীন প্রচলিত মতবাদের বলিষ্ঠ প্রতিবাদ এবং এর সম্পর্কে নিজের নতুন মতবাদের প্রকাশ করার মাধ্যমে। মানবদেহে বায়ু ও রক্ত সঞ্চালনের ব্যবস্থা আবিস্কারের জন্য বিখ্যাত ছিলেন ইবনে নাফিস।

তিনি ফুসফুস এবং হৃৎপিন্ডের এনটামি নিয়ে আলোচনা করেন । ইবনে সিনা এ্যারিস্টটলের মতবাদের সাথে একমত করে হৃৎপিন্ডের ৩টি হৃৎপ্রকোষ্ঠ রয়েছে বলে যে মত প্রকাশ করেছেন। তিনি তাঁর তীব্র প্রতিবাদ করেন । এ্যারিস্টটল মনে করতেন যে, দেহের পরিমাণে অনুসারেই হৃৎপ্রকোষ্ঠর সংখ্যার কম বেশী হয় তিনি এই মতকে ভুল বলে প্রমাণ করেন । তাঁর মতে হৃৎপিন্ডে মাত্র দু’টো হৃৎপ্রকোষ্ঠ আছে । একটা থাকে রক্তে পরিপূর্ণ এবং এটা থাকে ডান দিকে আর অন্যটিতে থাকে জীবনতেজ, এটা রয়েছে বাম দিকে। এ দু’য়ের মধ্যে চলাচলের কোন পথই নেই । যদি তা থাকত তাহলে রক্ত জীবনতেজের জায়গায় বয়ে গিয়ে সেটাকে নষ্ট করে ফেলত ।

হৃৎপিন্ডের এনাটমি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ইবনুন নাফিস যুক্তি দেখান যে, ডান দিকের হৃৎপ্রকোষ্ঠে কোন কার্যকরী চলন নেই এবং হৃৎপিন্ডকে মাংসপেশীই বলা হউক বা অন্য কিছুই বলা হউক তাতে কিছু আসে যায় না।

তিনি মানবদেহে রক্তসঞ্চালন পদ্ধতি, ফুসফুসের সঠিক গঠন পদ্ধতি, শ্বাসনালী, হৃদপিন্ড, শরীরে শিরা উপশিরায় বায়ু ও রক্তের প্রবাহ ইত্যাদি সম্পর্কে গবেষণা করে চিকিৎসা বিজ্ঞানের জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছেন।

রক্ত চলাচল সম্বন্ধে তৎকালীন প্রচলিত গ্যালেনের মতবাদকে ভুল প্রমাণিত করে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ১৩০০ শতাব্দীতে বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন কে এই বিখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানী (Muslim Scientist)।বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞানে এ মতবাদটি সম্পূর্ণ বিজ্ঞান সম্মত বলে গৃহীত হলেও ইবনুন নাফিসকে বিজ্ঞান জগতে স্বীকৃতি দেয়া হয় না।  

শ্বাসনালির অভ্যন্তরীণ অবস্থা, মানবদেহে বায়ু ও রক্তপ্রবাহের মধ্যে ক্রিয়া-প্রক্রিয়ার কিভাবে ঘটে, ফুসফুসের নির্মাণ কৌশল সম্পর্কে গবেষণা করে আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রকে সমৃদ্ধ করেছেন।

ইবনে নাফিসের (Ibn Al Nafis) এ যুগান্তকারী আবিষ্কার আধুনিক ও বিজ্ঞান সম্মত। কিন্তু ছয় শতাব্দী ধরে তাঁর এই মতবাদ সম্পর্কে আমাদের অন্ধকারে রেখেছিল। বর্তমানে এই গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ আবিষ্কারক হিসেবে সম্মান দেয়া হয় সতের শতকের বিশিষ্ট ইংলিশ চিকিৎসাবিদ উইলিয়াম হার্ভকে। অথচ হার্ভের জন্মের ৩০০বছর পূর্বে আরব বিজ্ঞানী ইবনে নাফিস এই থিওরি আবিস্কার করে। মিশরের বিখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞানী ১৯২৪ সালে তার ডক্টরেট অভিসন্দর্ভে ইবনে নাফিসের উক্ত আবিষ্কারের কথা তুলে ধরেন।

অন্যান্য বিষয়ে অবদান:
চিকিৎসা ছাড়াও, ইবনে আল-নাফিস আইনশাস্ত্র, সাহিত্য এবং ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন করেছিলেন। তিনি শাফিঈ মাযহাবের আইনশাস্ত্রের একজন  বিশেষজ্ঞ ছিলেন।

ব্যক্তি জীবনে সুন্নাহর অনুসরণকারী ইবনে নাফিস ধর্ম ও দর্শন পারস্পরিক সম্পর্কিত বিষয় বলে মত প্রকাশ করেন। দর্শন বিষয়ে তিনি মৌলিক গ্রন্থও প্রণয়ন করেন। মুসলিম সভ্যতার পতন রোধের উদ্দেশ্যে ইবনে নাফিস তরুণদেরকে সুন্নতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর অনুসরণ করতে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেন এবং তিনি সুন্নতে রাসূল-এর অন্তর্ভুক্ত আচরণসমূহের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রদান করেন। 

এই সময়ই তিনি রচনা করেন আরবী সাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রথম দিকের মৌলিক উপন্যাস ‘‘আল রিসালাহ  আল কামিল ফি- সিরাতিল নবী’’। 

তার নিজের বৈজ্ঞানিক এবং দার্শনিক মতবাদের প্রকাশ করাও এই উপন্যাস রচনার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। তিনি ১২৬৮ থেকে ১২৭৭ সালের মধ্যে এই গ্রন্থ রচনা করেন। এই গ্রন্থটির নামের অর্থ হচ্ছে ‘‘নবীর সিরাত বা জীবন-এর উপর কামিলের রচনা বা থিসিস। গ্রন্থটি রিসালায়ে ফাদিল বিন নাতিক নামেও পরিচিত।

ইবনে বিভিন্ন শাস্ত্র বিশেষত শরীরবিদ্যা
ও মনোবিজ্ঞান বিষয়ে তার গবেষণার ফলাফল এবং বিভিন্ন বিজ্ঞান বিষয়ে তার মতামত ও এই বইটির মাধ্যমে প্রকাশ করেন। তিনি এই উপন্যাসে প্রমান করতে চেষ্টা করেন যে, মানুষের মন যুক্তি ও বিশ্লেষণের সাহায্য প্রাকৃতিক। দার্শনিক ও ধর্মীয় সার সত্যকে আবিষ্কার করতে পারে।

ইবনে নাফিসের এই উপন্যাস প্রাথমিক কল্পবিজ্ঞান (সায়েন্স ফিকশন) বিষয়ক রচনার একটি অন্যতম উদাহরণ। এই উপন্যাসে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সত্যকে তার কাল্পনিক ব্যবহার দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ইবনে নাফিস তার এই রচনাটিকে বলেছেন ইসলামকে বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিগতভাবে রক্ষার চেষ্টা।

ইবনে নাফিস ছিলেন ইসলামি সভ্যতা ও বিজ্ঞানের একজন প্রধান বিশেষজ্ঞ। বিজ্ঞান বিশেষত শরীরবিজ্ঞান বিষয়ে তিনি ছিলেন প্রথম আধুনিক গবেষক যার গবেষণা এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব কিছু ছাড়াও তিনি পৃথিবীর অন্যতম প্রথম এবং প্রথম মুসলিম সাইন্স ফিকশন রচয়িতা হিসেবেও চির স্মরণীয়।

রচনাবলী:
তার বইগুলির মধ্যে সবচেয়ে বড় বই হল আল-শামিল ফি আল-তিব (মেডিসিনের উপর বই), যা ৩০০টি খন্ড সমন্বিত একটি বিশ্বকোষ হওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। যাইহোক, ইবনে আল-নাফিস তার মৃত্যুর আগে মাত্র ৮০টি প্রকাশ করতে সক্ষম হন এবং কাজটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এই সত্য সত্ত্বেও, কাজটি একজন ব্যক্তির দ্বারা লিখিত সর্ববৃহৎ চিকিৎসাশাস্ত্রে বিশ্বকোষগুলির মধ্যে একটি হিসাবে বিবেচিত হয় এবং এটি তৎকালীন ইসলামী বিশ্বের চিকিৎসা জ্ঞানের সম্পূর্ণ সারসংক্ষেপ দেয়। ইবনে আল-নাফিস তার সমস্ত লাইব্রেরির সাথে তার বিশ্বকোষ দান করেন মনসুরি হাসপাতালে যেখানে তিনি তার মৃত্যুর আগে কাজ করেছিলেন।

সময়ের সাথে সাথে, বিশ্বকোষের বেশিরভাগ খন্ড হারিয়ে গেছে অথবা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে মাত্র ২টি খণ্ড এখনও মিশরে বিদ্যমান রয়েছে। মিশরীয় পণ্ডিত ইউসেফ জিদান এই কাজের বিদ্যমান পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ ও পরীক্ষা করার একটি প্রকল্প শুরু করেছিলেন যা ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার, বডলিয়ান গ্রন্থাগার এবং স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘লেন মেডিকেল গ্রন্থাগার’ সহ বিশ্বের অনেক গ্রন্থাগারে তালিকাভুক্ত করা আছে।

তিনি হাদীসশাস্ত্রের উপরও কয়েকখানা ভাষ্য লেখেন । এছাড়া তিনি আরো বহু গ্রন্থ রচনা করেন । যেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে –  ‘আল্ মুখতার মিনাল আগজিয়া (মানবদেহে খাদ্যের সম্বন্ধে), ‘আল কিতাবুল মুহাজ ফিল কুহল (চক্ষু রোগ সম্বন্ধে), ‘শারহে মাসায়েলে ফিত, তিব্ব’, ‘তারিকুল ফাসাহ’, ‘মুখতাসারুল মানতেক’ প্রভৃতি।

ইবনে নাফিস কর্তৃক রচিত বাইশটি গ্রন্থের নাম জানা যায়। তাছাড়াও অন্যান্য রচনাবলীর মধ্যে রয়েছে-
১. আল-শামিল ফি আল-তিব্ব (Al-Shamil fi Al-tibb)
২. শারহ তাশরিন আল-কানুন (Sharh Tashrih al-Qanun)
৩. ন্যাচার অফ ম্যান (Nature of Man)
৪. এন্ডামিক (Endemics)

এছাড়া তিনি কয়েকটি ব্যাখ্যাগ্রন্থও রচনা করেন। চিকিৎসা, ভাষাতত্ত্ব ও আইন বিষয়কগ্রন্থ। তবে তাঁর রক্ত চলাচল বিষয়ে সুত্রের আবিষ্কার তাঁকে বিজ্ঞান জগতে সু-প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছে।

মৃত্যু:
তিনি ৬৮৭ হিজরী মোতাবেক ১২৮৮ খ্রীঃ কায়রোতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন । তাঁকে সুস্থ করে তোলার প্রায় সকল চিকিৎসাই ব্যর্থ হয়ে যায় । অবশেষে মৃত্যু শয্যায় তাঁর মিসর ও কায়রোর চিকিৎসক বন্ধুরা তাঁর রোগের প্রতিষেধক হিসেবে তাঁকে মদ পান করতে অনুরোধ করেন । মদ পান করলেই তাঁর রোগ সেরে যাবে বলে তাঁরা পরামর্শ দেন । কিন্তু তিনি এক ফোঁটা মদ পান করতেও রাজি হলেন না । তিনি বন্ধুদেরকে উত্তর দিলেন, “আমি আল্লাহ পাকের দরবারে চলে যেতে প্রস্তুতি নিচ্ছি । আমি চিরদিন এ নশ্বর পৃথিবীতে থাকতে আসিনি । আল্লাহ আমাকে যতটুকু ক্ষমতা দিয়েছেন আমি চেষ্টা করেছি মানুষের কল্যাণে কিছু করে যেতে । বিদায়ের এ লগ্নে শরীরে মদ নিয়ে আল্লাহ পাকের দরবারে উপস্থিত হতে আমি চাই না ।”
অতঃপর ৬৮৭ হিজরীর ২১শে জিলকদ মোতাবেক ১২৮৮ খ্রীষ্টাব্দের ১৮ই ডিসেম্বর রোজ শুক্রবার সকালে এ মহামনীষী ইন্তেকাল করেন । মৃত্যুকালে তিনি তাঁর একমাত্র বাড়িটি এবং তাঁর সমস্ত বইপত্র মনসুর হাসপাতালে দান করে যান ।

তথ্য সুত্র:

1:ইনকিলাব
3: কালের কণ্ঠ ১৫-২-২০২২
3:Numan, Mohammed T. (২০১৪-১০-০১)। "Ibn Al Nafis: His Seminal Contributions to Cardiology"। Pediatric Cardiology
4: উইকিপিডিয়া

লিখেছেন— Raqib Hussain

বুধবার, ২৭ জুলাই, ২০২২

মুয়াল্লিম আল-ফারাবি | Abu Nasr Al-Farabi | Alpharabius


পৃথিবীতে মুসলমানদের উন্নতির জন্য মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আশীর্বাদ হিসেবে যুগে যুগে যে সকল মুসলিম বিজ্ঞানী ও দার্শনিককে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন আল ফারাবি তাদের অন্যতম।

জন্ম:
তার পূর্ব পুরুষগণ ছিলেন পারস্যের অধিবাসী। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ ও রাজনৈতিক কারণে তার পূর্ব পুরুষগণ পারস্য ত্যাগ করে তুর্কিস্থানে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

আবু নসর আল ফারাবী আনুমানিক  ৮৭২, মতান্তরে ৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে তুর্কিস্তানের অন্তর্গত 'ফারাব' নামক শহরের নিকটবর্তী 'আল ওয়াসিজ' নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

নাম:
মুসলিম বিজ্ঞানী ও দার্শনিক আল ফারাবির আসল নাম আবুনাসের মোহাম্মদ ইবনে ফারাখ আলফারাবি।
আল ফারাবির পিতা ছিলেন উচ্চ শিক্ষিত এবং সেনাবাহিনীর একজন উচ্চ পদস্ত কর্মকর্তা।

জ্ঞানার্জন:
তিনি প্রাথমিক শিক্ষা নিজ এলাকা ফারাবেই সম্পন্ন করেন।অত:পর তিনি বুখারারার কাজি নিযুক্ত হন।

ঘটনা বৈচিত্র্য তাঁর জীবন ছিল পরিপূর্ণ।জ্ঞান সাধনার অদম্য বাসনা নিয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্যে তিনিবাগদাদ গমন করেন।  তিনি সেখানে প্রায় ৪০ বছর ধরে অধ্যায়ন ও গবেষণা চালিয়ে যেতে থাকেন। জ্ঞানের অন্বেষণে তিনি ছুটে গিয়েছেন দামেস্কে, মিসরে এবং দেশ-বিদেশের আরও বহুস্থানে।

কয়েকটি ভাষার উপর তিনি পূর্ণ দখল অর্জন করেন।মুসলিম সমাজের একেবারে প্রথম দিককার মনিষীদের মধ্যে আল ফারাবি একজন, যিনি জ্ঞানার্জনের জন্য খ্রিস্টান মিশনারি কিংবা ভারতবর্ষের আর্য বা হিন্দুদের সাথে অনেক সময় কাটিয়েছেন।

বর্ণাঢ্যময় কর্মজীবন:
তিনি জ্ঞান বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায়  পারদর্শী ছিলেন। তবে দার্শনিক বিজ্ঞানী হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছাড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। জ্ঞানের সন্ধানে তিনি ছুটি গিয়েছেন দামেস্কে, দেশ-বিদেশের আরো অনেক স্থানে পদার্থবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, দর্শন, যুক্তিশাস্ত্র, গণিতশাস্ত্র, চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রভৃতিতে তিনি উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। মূলত দর্শন ও বিজ্ঞানে তাঁর অবদান সর্বাধিক। পদার্থ বিজ্ঞানে তিনি শূন্যতার অবস্থান প্রমাণ করেছিলেন। তিনি বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক হিসেবে আরোহন করেছিলেন জ্ঞানের শীর্ষে।তিনি সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন, যুক্তিশাস্ত্র প্রভৃতি বিষয়ে বহু রচনা লিখেছেন। তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় শতাধিক।তবে এ সকল অমূল্য অধিকাংশ গ্রন্থের সন্ধান মেলেনি। পদার্থবিজ্ঞানে তিনি শূন্যতার অবস্থান প্রমাণ করেছিলেন ।

বিভিন্ন শাস্ত্রে অবদান:

দর্শন:
প্লেটো ও এরিস্টটলএর দর্শনের উপর তিনি বিস্তর আলোচনা করেছেন। প্লেটোর রিপাবলিক-এর মত তিনিও একটি আদর্শ রাষ্ট্র-এর কল্পনা করেছেন তার আদর্শ নগর গ্রন্থে।

মধ্যযুগের দার্শনিকগণ, কী মুসলিম কী খ্রিস্টান, সকলেই নিজের ধর্ম দ্বারা ভীষণভাবে প্রভাবিত ছিলেন। সহজ করে বলতে গেলে তাদের নিকট দর্শন মানেই ছিল ধর্মীয় দর্শন।কিন্তু আল ফারাবি এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসেন।

তিনি স্রষ্টার সর্বাধিপত্য স্বীকারের পাশাপাশি সৃষ্টিকেও শাশ্বত বলে মনে করতেন। তিনি কোন চরম মত পোষণ করতেন না এবং চিন্তার ক্ষেত্রে পরস্পর-বিরোধী মতকে প্রায়শই একসাথে মিলাবার চেষ্টা করেছেন।  তিনি ধর্ম আর দর্শনের মাঝে তফাৎ স্পষ্ট করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সৃষ্টিকর্তা মানুষকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ করেছেন জ্ঞান-বুদ্ধিতে উৎকর্ষ সাধনের জন্যই। 

রাষ্ট্র দর্শন:
তার সময়ে মুসলিম দার্শনিকদের মধ্যে রাজনীতি অনীহার যে রোগ ছিল তা থেকেও মুক্ত ছিলেন আল ফারাবি। তিনি বেশ রাজনৈতিক সচেতন ছিলেন এবং রাজনৈতিক দর্শন নিয়েও কাজ করেছেন।

আদর্শ নগর-এ তার রাষ্ট্রনায়ক-এর একনায়ক বৈশিষ্ট্য প্রকট। তার মতে রাষ্ট্রের প্রধান রাষ্ট্রের সর্বৈব ক্ষমতা পোষণ করবেন এবং অন্য সবাই তার বাধ্য থাকবেন। নাগরিকদের ক্ষমতায়ও থাকবে শ্রেণী বিভাজন, যেখানে কোনো শ্রেণী তার উপরের শ্রেণীর আদেশ মান্য করবে ও নিচের শ্রেণীর উপর আদেশ জারী করবে। তৎকালীন বহুধাবিভক্ত সামন্ততান্ত্রিক সমাজকে এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর আওতায় আনতে এই রাষ্ট্র দর্শন প্রভাব বিস্তার করে এবং সময়ের বিচারে এরূপ ভাবধারা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

আদর্শ রাষ্ট্রের নেতার ক্ষেত্রে প্লেটো যেমন ‘ফিলসফার কিং’ এর কথা বলেছিলেন, ফারাবি এখানে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ইমাম বা ধর্মীয় নেতার কথা বলেছেন। তার মতে একজন ইমামই সকল ভালো-মন্দের পার্থক্য সঠিকরূপে বুঝতে পারেন এবং রাষ্ট্র সঠিকভাবে পরিচালনা করতে সক্ষম হবেন। তিনি হযরত মুহাম্মদ (সা) এর সময়ের মদিনা শহরকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পণ্য নগরের উদাহরণ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

আদর্শ রাষ্ট্রকে তিনি অসম্ভব উল্লেখ করলেও এটি অর্জনের জন্য মানুষের চিরন্তন প্রচেষ্টাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করেন। মুসলিম মিল্লাতে তার অবদান অনস্বীকার্য।


যুক্তিশাস্ত্র:

যুক্তিশাস্ত্রে আল ফারাবি অ্যারিস্টটলীয় পন্থা অবলম্বন করলেও তিনি অ্যারিস্টটলের বাইরে গিয়েও অনেক কিছু আলোচনা করেছেন। তিনি ‘কন্ডিশনাল সিলোজিজম’ বা শর্তাধীন অনুমান এবং ‘অ্যানালজিক্যাল ইন্টারফিয়ারেন্স’ বা সাদৃশ্যমূলক হস্তক্ষেপ (যুক্তিশাস্ত্রের কিছু পদ্ধতি) নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেন। তিনি অ্যারিস্টটলের কাজের উপর বেশ কিছু টীকাও লেখেন। আল-ফারাবীর মতে, যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনে তেমন কোন পার্থক্য নেই। বরং দর্শন হল উচ্চতর যুক্তিবিদ্যা।

রচনাবলী:
আল ফারাবি দর্শন, ধর্মতত্ত্ব,রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি, চিকিৎসা, যুক্তিশাস্ত্র,পদার্থ বিজ্ঞান,সমাজ বিজ্ঞান,সঙ্গীত,গণিত,
ফালসাফা প্রভৃতি বিষয়ে শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেন।তবে বিজ্ঞান ও দর্শনে তার অবদান ছিল সর্বাধিক। পদার্থ বিজ্ঞানে তিনিই “শূন্যতার” অবস্থান প্রমাণ করেছিলেন। দার্শনিক হিসেবে ছিলেন নিউ প্লেটনিষ্টদের পর্যায়ে বিবেচিত।

তিনি সর্বপ্রথম ইসলামী তর্কশাস্ত্র ও ইসলামী বিশ্বকোষ রচনা করেন।

তাঁর রচিত গ্রন্থে পীথাগোরাস, হিরোক্লিটাস, সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল, থিও ফ্রিসটাস, অ্যারিস্টিপাস, ডাইওজেনিস, ইপিকিউরিয়ান, স্টোয়িক প্রমুখ দার্শনিকের উদ্ধতি ও ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। আল-ফারাবী একজন সত্যের সন্ধানী দার্শনিক ছিলেন। তিনি অতি সাবধানে তাঁর দর্শনগ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর দর্শনে ধর্মতাত্ত্বিক মতবাদের প্রকাশ নেই।

তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হচ্ছে:
১: আল মদীনাতুল ফাজীলা
২: আল মদীনাতুল মাদানিয়া
৩: জাওয়ামিনুস সিয়াসাত
৪: ইজতিমাউ মাদানিয়া
৫: খাওয়ামি নেয়ামত
৬: কিতাব আল মুসিকি আল কবির (দ্য গ্রেট বুক অব মিউজিক)
৭: কিতাব ইহসা আল উলুম (দ্য ইন্ট্রোডাকশন টু নলেজ)
৮: কিতাব ইহসা আল ইকাআত (ক্লাসিফিকেশন অব রিদমস)

আল ফারাবি একজন উর্বর লেখক ছিলেন, যার লেখার প্রধান দিক ছিল নিওপ্লেটোনিজম এবং লেখার স্টাইল ছিল অ্যারিস্টটলীয়। তার একটি ভালো দিক ছিল এই যে তিনি নিজ দর্শন প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে অসংখ্য দার্শনিক এবং তাদের দর্শনের কথা আলোচনা করেছেন। অন্যদিকে তার লেখা রাজনৈতিক ট্রিটিগুলো মধ্যযুগের সবচেয়ে প্রভাবশালী ইহুদি দার্শনিক ম্যামোনাইডসকেও প্রভাবিত করেছিল। তিনি আল ফারাবিকে মুসলিমদের মধ্যে প্রথম যুক্তিবাদী বলে আখ্যায়িত করেছেন। এজন্য তাকে মুয়াল্লিম আছ-ছানী বলা হয়।

মৃত্যু:
আল ফারাবি শেষ জীবনে সিরিয়ার আলেপ্পোতে বসবাস শুরু করেন। সেখানেই ৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যু বরণ করেন।

তথ্যসূত্রঃ
1. আল ফারাবি ইসলামী দর্শনে এক গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক, রোদ্দুরে ডটকম।
2. দর্শনকোষ সরদার ফজলুল করিম।
3. বিশিষ্ট দার্শনিক আল ফারাবি
4. উইকিপিডিয়া

লিখেছেন— Raqib Hussain

শুক্রবার, ১৫ জুলাই, ২০২২

মুসলিম নাবিক 鄭和 Zheng He জেঙ হি, পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কোদাগামার প্রায় ১০০ বছর আগে, ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে হুরমুজ প্রণালী ঘুরে পূর্ব আফ্রিকা ও দক্ষিণ আফ্রিকা পর্যন্ত পাড়ি জমান


১৪০৫  সালে সুবিশাল ৫০০ ফুট লম্বা ৩২০ টি   জাহাজের  নৌবহর  নিয়ে চীনের   নানজিং বন্দর  থেকে যাত্রা শুরু করে মিং সম্রাজ্যের  নৌবাহিনী।  ওই নৌবহরের এডমিরাল মুসলিম নাবিক মোহাম্মদ সাওবাও   ,চীনারা যাকে    জেঙ হিঃ নামে ডাকে। প্রতিটি জাহাজ কলম্বাসের জাহাজ থেকে  ৫ গুনের ও বেশি বড় সাইজের, জাহাজগুলি  ছিল কাঠের তৈরী   ফুটবল মাঠের  সমান  এবং  এই   নৌবহরে  সব মিলিয়ে  প্রায়  ৩০ হাজার  নাবিক, সৈনিক   ছিল, ওই সময়ে যেটা ছিল লন্ডনের জনসংখ্যার  অর্ধেক।  জেঙ হির  এই নৌবহর ছিল ওই সময়ে  পুরো   ইউরোপের সব দেশের মিলিত  নৌবাহিনীর   থেকেও বড়। 

কে এই মুসলিম নাবিক জহেঙ হি ? কিভাবে তিনি মিং সম্রাজ্যের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং চীন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নৌবহর এর এডমিরাল হলেন।  জহেঙ হির জীবন , তার বিশ্ববিখ্যাত ৭ টি অভিযান এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ান মুসলিম জন্য তার  রেখে যাওয়া গৌরবময় ঐতিহ্য ও ইতিহাস সম্পর্কে লিখার   চেষ্টা   করবো।  

জহেঙ হির জন্ম ১৩৭২ সালে চীনের উনান প্রদেশে , যেখানে কেবলই মুসলিম  মঙ্গোল শাসকদের পরাজিত করে মিং সম্রাজ্য দখল করে নেয়।

জহেঙ হির বাবা মা প্রকৃত পক্ষে মদ্ধ এশিয়ার মুসলিম। জহেঙ হির বাবা মুসলিম ছিলেন এবং হজ ও করেছিলেন ১৩০০ সালে মাঝামাঝি সময়ে। তারা বাবা মঙ্গোলদের  সাথে , মিং সম্রাজ্যের বিপক্ষে যুদ্ধ করে মারা যায়। অনাথ হিসেবে জহেঙ হি  কে সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য নিয়ে   যাওয়া হয় পিকিং (বেইংজিং)   এ , নানজিং শহর বিদ্রোহীরা দখল করে নিলে, সেখানে যুদ্ধে  লড়েন , এই সূত্রে প্রিন্স জু ডি র সাথে বন্ধুত্ব হয়।  পরবর্তীতে জুডি রাজা হলে জহেঙ হি কে সেনাবাহিনীর জেনারেল বানান। 

জুডি   মিং সম্রাজ্যের ক্ষমতা পুরু দুনিয়ার কাছে জানাতে চেয়েছিলো , আর বহির্বিশ্বের সাথে বাণিজ্যিক আর কূটনৈতিক সম্পর্ক   স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। 

এজন্যই  নানজিং শহরের পাশেই ইয়াংসি  নদীর কূলে    জাহাজ তৈরীর   কারখানা গড়ে তুলেন।  আশেপাশের সব বন্দর নগরী থেকে      সম্ভব  আরব   নাবিকদের     নিয়োগ দেওয়া হয়।  সুমাত্রা থেকে মালাক্কা পর্যন্ত   আরব নাবিকদের খুঁজে খুঁজে নিয়োগ দেয়া  হতো ,   কারণ ওই সময়ে আরব নাবিকদের     জোতিষবিদ্যা আর জাহাজ চালানোর  জন্য সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল। 

পরবর্তী ৩০ বছরে এডমিরাল জেঙ হির এই ভাসমান শহরের সমান নৌবহর আর জাহাজ ভর্তি সোনা, রুপার মূদ্রা আর অন্নান্ন উপহার নিয়ে   সাগর পথে পুরো পৃথিবী  চোষে বেড়িয়েছেন। ৩০ হাজার দক্ষ নাবিক, সৈনিক আর নৌবহরে পর্যাপ্ত যুদ্ধসরঞ্জাম থাকা সত্যি ও জহেঙ হি তার এই ঐতিহাসিক অভিযানে কোথাও কোনো রাজ্যে আক্রমণ করেনি , কোনো ধরণের লুন্ঠন ও করেনি।  বরং যেখানে গিয়েছে সেখানেই উপঢৌকন হিসেবে আদিবাসীদের সোনা , রুপা, চীনা তৈজসপত্র দিয়েছেন। 

জহেঙ হি পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কোদাগামার  প্রায় ১০০ বছর  আগে ,  ভারত মহাসাগর পারি দিয়ে হুরমুজ প্রণালী ঘুরে  পূর্ব আফ্রিকা পর্যন্ত পাড়ি  জমান   এবং পরবর্তীতে দক্ষিণ আফ্রিকা পর্যন্ত ভ্রমণ করেন।  

ঝেঙ হির এই এক শহরের সমান ❝নৌবহর নিয়ে ২৮ বছর ৩৬ টি দেশে ভ্রমণ করেন।❞ ইউরোপিয়ান নাবিকদের মতো জহেঙ হি প্রতিরক্ষার প্রয়োজন ছাড়া কোথাও আক্রমণ করে না। 

জহেঙ হির তৃতীয় অভিযানে শ্রীলংকার উপকুলে নোঙ্গর ফেললে , শ্রীলংকার রাজা বাধা দেয় এবং আক্রমণ করে, জহেঙ হির দক্ষ  সৈন্যরা তাদের আধুনিক অস্ত্র দিয়ে শ্রীলংকার রাজা কে পরাজিত করেন  এবং বন্দি করে রাজাকে পিকিং (বেইংজিং ) নিয়ে যান তার বিচার করতে।

মালাক্কার কাছ থেকে ওই সময় থাইল্যান্ড প্রতিবছর ট্যাক্স হিসেবে স্বর্ণ মুদ্রা নিতো ওই সময় , মালাক্কার রাজা মিং রাজ্ দরবারে গিয়ে সাহায্য চাইলে , জহেঙ হি মাল্লাকা আসে থাইল্যান্ডের ট্যাক্স নেয়া বন্ধ করে।  পরবর্তী ১৩০ বছর মালাক্কা শান্তিতে ছিল মিং সম্রাজ্যের সাহায্যে। 

জহেঙ হির বাংলা ভ্রমণঃ

১৪১৪ সালে চিটাগাং পোর্টে এসে ভিড়েন জহেঙ হির নৌবহর।  নৌবহর থেকে জহেঙ হি আর তার সাথে কয়েকজন নাবিক আর সাথে সঙ্গী নিয়ে সোনারগাওঁ   নৌকা নিয়ে আসতেছিলেন।  জহেঙ হির মধ্যস্থতায় ওই সময়ে জৈনপুর রাজ্যের সাথে বেঙ্গল রাজ্যের  বিরোধের অবসান ও হয়। এই বাংলা ভ্রমণ সম্পর্কে তাদের লিখায় পাওয়া যায়— ❝আমরা সুমিত্রার সম্রাজ্য থেকে রওনা দিয়ে ২০ দিন জাহাজ চালিয়ে চিটাগাং বন্দরে আসি , তারপর ৫০০ লি  (২৫০কিঃমিঃ ) ছোট নৌকায় করে সোনারগাঁ যাই। তারপর আমরা সুলতানের প্রাসাদে যাই , আমাদের  অভ্যর্থনা জানানোর জন্য কয়েক হাজার লোক দাঁড়িয়েছিল।  সুলতানের রাজপ্রাসাদে অনেক উঁচু উঁচু পিলার  রঙে তার মধ্যে পাখি আর ফুল  খচিত নকশা করা।❞

আর বাংলার মানুষ সম্পর্কে বলেছেন— ❝স্থানীয় লোকজন সবাই ইসলামের অনুসারী ,  সবাই  সৎ  ও  সহজ সরল, তারা একটা ভাষায় কথা বলে নাম হচ্ছে বাঙালি ,  পুরুষরা   মাথায় সাদা কাপড় পেঁচিয়ে রাখে (পাগড়ী ) আর সাদা লম্বা শার্ট পরে।  কোমরের নিচে থেকে পা পর্যন্ত বিভিন্ন রঙের কাপড় পরে ( লুঙ্গি) , মহিলারা  খুব ছোট শার্ট পরে (ব্রাউস) আর লংব কাপড় দিয়ে শরীর পেঁচিয়ে রাখে।  পুরুষ আর মহিলা আলাদা স্থানে খাবার খায়।  পুনর্বিবাহ করার কোনো প্রথা নেই এখানে।  এতিম আর বিধবা , যারা নিজেদের ভরণ পোষণ করতে পারে না , গ্রামের সবাই মিলে পালা করে তাদের দায়িত্ব নেয় , যাতে করে তাদের অন্য গ্রামে গিয়ে ভিক্ষা করে খেতে না হয়, যেটা দেখে এখানে লোকজনের ন্যায়পরায়ণতার পরিচয় পাওয়া যায়।  পুরু রাজ্যই ঘন বসতি , প্রচুর সম্পদ আর অঢেল আবাদি জমি রয়েছে এখানে।  এখানে  আইন কানুন অনেক সহজ , অপরাধী আর আইন অমান্যকারীদের বেত্রাঘাত, জেল আর নর্বাসনে পাঠানোর প্রথা চালু আছে।❞

বাংলা ভ্রমণের শেষে বাংলার সুলতান জহেঙ হির নৌবহরে একটি আফ্রিকান জিরাফ উপহার দেন।  সেই জিরাফ চীনে  নিয়ে গেলে রাজদরবারে এক হট্টগোল বেজে যায়, কারণ চীনারা কখনোই জিরাফ দেখেনি , আর জিরাফ দেখতে চীনা কুইলিন নামক এক কাল্পনিক প্রাণীর মতো দেখতে , এই প্রাণী আসলে , সেই রাজ্যে আশীর্বাদ আসবে বলে তারা বিশ্বাস  করতো।

রাজদরবারের কবি সাহিত্যিক গান পদ্য লেখকরা ওই জিরাফ আর রাজার গুনগান করে ১৬ টি ভলিউমের বই লিখেন। 

মা হাওয়ান ৭ম এবং সর্বশেষ অভিযানে মক্কায় জহেঙ হির সাথে হজ করার জন্য যায়। ঐসময়ের কাবা আর চারপাশের বর্ণনা দেন এবং হজ সম্পর্কে বলেন— ❝প্রতি চন্দ্রবর্ষের ১২তম  মাসের ১০ম দিন বিদেশী মুসলিমরা , অনেক সময় ১বছর বা দুইবছর  দীর্ঘ ভ্রমণের পর , হলের ভিতর প্রার্থনা করতে আসে।  সবাই কাবা ঘরের  শণ সিল্ক এর টুকরা কাপড় যাওয়ার আগে স্মৃতি হিসেবে নিয়ে যায়।  যখন এই কাপড় কেটে নেয়া হয়ে যায় , রাজা এখানে আবার ও আরেকটা কাপড় দিয়ে আবার ও ঢেকে রাখে।  এই ঘটনা ঘটতেই থাকে, বছরের পর বছর - কোনো বিরতি ছাড়া।❞

জহেঙ হয় দীর্ঘ ২৮ যশোরে ৭ টি অভিযান পরিচালনা করেন , এ সময় ৩৬ টি দেশ ভ্রমণ করেন , সব জায়গা থেকে কিছু কিছু নিদর্শন নিয়ে আসেন মিং  সম্রাজ্যের দরবারে।  অনেক অধিবাসী লোক আসেন জহেঙ হির সাথে, রাজা জুডি কে শুভেচ্ছা জানাতে। 

তারা নানজিং থেকে মোল্লাকে সিলন কালিকট হয়ে হুরমুজ হয়ে আফ্রিকার উপকূলের বন্দরে বন্দরে ঘুরে বেড়ান। 

১৪২১ সালের   Zheng He জেঙ  হী র নৌবহর একবার আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল থেকে ৪৫ দিন সাগর পথে ভ্রমণ করেন। তার এই আল্টান্টিক সাগরের বুকে ভ্রমণের  ম্যাপ ও ড্রয়িং ও রয়েছে। ব্রিটিশ নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত লেফটেনেন্ট কমান্ডার ও লেখক গ্যাভিন মেনজিস তার বই "১৪২১: যে বছর চীন আমেরিকা আবিষ্কার করে " বইতে  Zheng He জেঙ  হী র ম্যাপ আর ড্রয়িং এর সাথে ক্যারিবীয়ান দ্বীপ  পুঞ্জ্যের সদৃশ ও আরো অন্নান্য প্রমানের ভিত্তেতে সিদ্ধান্তে পৌঁছেন। জহেঙ হির নৌ বহর আমেরিকা পর্যন্ত এসেছিলো এবং পুরো পুরু পৃথিবী জলপথ ঘুড়ে আবার ফিরে এসেছিলেন। তার মানে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের  ৭০ বছর আগে আমেরিকা গিয়েছিলেন এবং ফার্দিনান্দ ম্যাগেলেন এর ১০০ বছর  পূর্বে পুরু পৃথিবী জল পথে চক্কর দিয়েছেন। 

যদিও   Zheng He জেঙ  হী কোনো কিছু আবিষ্কারের কথা দাবি করেননি কখনো।  কারণ   Zheng He জেঙ  হী র যাত্রায় তার কাছেও আফ্রিকার বিভিন্ন উপকূলের বন্দর থেকে সংগ্রহ করা ম্যাপ ছিল , যে ম্যাপ গুলোতে দক্ষিণ আর উত্তর আমেরিকার ছিল।

আরেক ইতালিয়ান বিখ্যাত ভ্রমণকারী অভিযাত্রিক নিকোলো দে কোনটি , যে কিনা ২৫ বছর আরবের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেরিয়েছিলেন।  সে নিজেও একবার   Zheng He জেঙ  হী র নৌ বহরে করে ভারত থেকে আফ্রিকা এসেছিলেন , এবং তার সহায়তায় ফেরা মাউরো নামক বিখ্যাত ইতালিয়ান ম্যাপ প্রস্তুতকারী ১৪৬০ সালে পৃথিবীর ম্যাপ তৈরী করেন যেখানে আল্টান্টিক সাগরের অন্যপাশে আরেক মহাদেশের উর্ল্লেখ ছিল।  ১৪৯২ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকা যাত্রার সময় তার হাতে চার-পাঁচটি  ম্যাপ ছিল,  তার মধ্যে এই ম্যাপটিও ছিল, অন্নান্য ম্যাপ আফ্রিকা থেকে সংগ্রহ  করা 

Zheng He জেঙ  হী র সাথে আরবদেড় আরবিতে   যোগাযোগ করার জন্য  ছিল কয়েকশো অনুবাদক। 

ওই অভিযানে মা হুয়ান নামের আরেক মুসলিম ভ্রমণকারী ও ছিল   Zheng He জেঙ  হীর সাথে। তার লিখা বই  'The Overall Survey of the Ocean's Shores' " "সমগ্র মহাসাগরের উপকূলের জরিপ "

জহেঙ হির সাথে আরবদেড় আরবিতে   যোগাযোগ করার জন্য  ছিল কয়েকশো অনুবাদক। 

ওই অভিযানে মা হুয়ান নামের আরেক মুসলিম ভ্রমণকারী ও ছিল ঝেঙ হির সাথে। তার লিখা বই  'The Overall Survey of the Ocean's Shores'

❝সমগ্র মহাসাগরের উপকূলের জরিপ❞

আরেক নাবিক ফেই জিন তার লিখা বই "(Description of the Starry Raft) “নক্ষত্র খচিত ভেলার বর্ণনা” । 

জহেঙ হির অভিযান সম্পর্কে যা কিছু জানা যায় প্রায় সব কিছুই এই দুইটি বই থেকে।  জহেঙ হির লিখা জাহাজের লগ বই, মানচিত্র, চার্ট সব কিছুই  আগুন ধরিয়ে মিং সম্রাজ্যের সব অবদান মুছে দেয়ার চেষ্টা করে ১৫২২ সালে ওই সময়ের ঈর্ষাপরায়ণ রাজা।

**দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় ইসলামের প্রচারে জহেঙ হির ভূমিকা অনেক।**  তিনি যেখানেই যেতেন সেখানেই ইসলাম প্রচার করতেন।  ইন্দোনেশিয়া, বিশেষ করে জাভা এবং সুমাত্রাতে , মালায়শিয়া , ফিলিপিন , মালাক্কা (সিঙ্গাপুর) এসব দেশে ইসলাম প্রচারের পিছনে এডমিরাল জহেঙ হি  এই নৌ অভিযান অনেক গুরুত্বপূর্ণ।  মালাক্কার (সিঙ্গাপুর) রাজা পরমেসওরা    Zheng He জেঙ  হীর ভ্রমণের পরপরই নাম পরিবর্তন করে ইস্কান্দার শাহ রাখেন , তিনি মুসলিম হয়েছিলেন কিনা এটা নিয়ে বিভিন্ন ধরণের মতবিরোধ ছিল , কিন্তু তার ছেলে মেঘাট ইসলান্দার শাহ (২য়  সুলতান) এবং নাতিন মোহাম্মদ শাহ (৩য়  ) মুসলমান ছিলেন। 

জহেঙ হির   স্মরণে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশেই অনেক মসজিদ আর জাদুঘর আছে। 

ইউরোপিয়ান বিখ্যাত  আবিস্কারক ভাস্কো দাগামা , ক্রিস্টোফার কলোম্বাস , ফার্দিনার্ড   ম্যাগেলেন ,   আমেরিগো ভেসপুচ্চি , ক্যাপ্টেন কুক এর ইতিহাস ঘাটলে বুঝা যায় , তারা আসলে কিছুই আবিষ্কার করেননি।  তাদের সবার হাতে খুব স্পষ্ট ম্যাপ আর ন্যাভিগেশানাল চার্ট ছিল।  তারা অজানা কোনো    অভিযানে  কখনোই বের হয়নি।  তারা  এমন জায়গায় গিয়েছে যেখানে অনেক আগে থেকেই    সাহসী নাবিকেরা গিয়েছে এবং সেইসব জায়গার সুস্পষ্ট ম্যাপ বানিয়েছে। ইতিহাসে দেখা যায় ,  অন্য সভ্যতার আবিষ্কারে , কৃতিত্বে নিজেদের বলে  চালিয়ে দেওয়াটা  ইউরোপিয়ানরা হরহামেশাই করেছে।  তাদের যাত্রা পথে আদিবাসীদের  খুন খারাপি  ধর্ষণ এমন কোনো নেক্কারজনক অপরাধ নেই যেটা তারা করেনি।  তারপরও  তারা বিখ্যাত , কারণ  ইতিহাস তারা   নিজেরাই লিখেছে, এবং  নৌঅভিযানের আসল পথিকৃতি নায়ক যারা তাদের নাম ছাপিয়ে গেছে। 

প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কেন জেঙ হীর  নাম শুনিনি ? জেঙ একাই ক্রিস্টোফার কলম্বাস, ভাস্কোদাগামা , মাগেলেন যা যা আবিষ্কার করেছে বলে ক্রেডিট নেয় , তার সব কিছুই প্রায় একশো বছর  আগেই করেছেন।  জিঙ হী  মুসলিম ছিলেন  ,  আমাদের মুসলমানের কাছে তিনি কোন জাতি গোত্রের এটা মুখ্য   হওয়া উচিত না।  জাতীয়তাবাদের কালবিষ যেন আমাদের আরেক মহান মুসলিম বীরের অবদানকে সম্মান করা থেকে বিরত না রাখে।  আমিন

Zheng He জেঙ  হী নিয়ে বাংলা ডকুমেন্টারী: https://youtu.be/0qyh37VxV2c


তথ্যসূত্র—
১. The Overall Survey of the Ocean's Shores by Ma Huan (1451 )
২. Description of the Starry Raft by Fei Xin (1436)
৩. 1421: The Year China Discovered America, Gevin Manzies (2003)
৪. When China Ruled the Seas: The Treasure Fleet of the Dragon Throne, Louise Levethes (1997)


লিখেছেন— মোহাম্মদ জুলফিকার রিজন


ক্রিস্টোফার কলম্বাসের ১৮১ বছর আগে আমেরিকায় আগমন করে মুসলিম নাবিক মানসা আবু বকর


কে ছিলেন এই মনসা আবু বকর আর মনসা মুসা যাদের থেকে  Walt Disney র লায়ন কিং এবং ব্ল্যাক পন্থার সিনেমার  চরিত্র অনুপ্রাণিত হয়ে করা। মালি সম্রাজ্যের এই দুই মানসা, বিশেষ করে আবু বকর আর তার ২০০০ জাহাজ নিয়ে পশ্চিম আফ্রিকা থেকে আমেরিকা অভিযানের ইতিহাস শুনবো প্রথম অংশে , আর দ্বিতীয় অংশে শুনবো তার নৌবহর আমেরিকা যেতে পেরেছিলো কিনা এবং ইউরোপীয়ানদের আগমনের  কয়েকশো বছর আগে থেকে আমেরিকার ভূখণ্ডে মুসলমানদের উপস্থিতির ইতিহাস উদঘাটন করার চেষ্টা করবো। 

১২৩৩ সালের মধ্যে আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে মালি  সম্রাজ্য স্থাপিত হয়েছে এবং  কয়েক দশকের  মধ্যেই পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী সম্রাজ্যে পরিণত হয়। মালি সম্রাজ্যের শাসককে বলা হতো মানসা , এই ম্যানডিঙি  শব্দের অর্থ হচ্ছে  রাজা বা সুলতান। এই মালি সম্রাজ্যের ৯ম সুলতান হলো : মানসা আবু বকর যিনি ১৩১০ সালে সিংহাসনে বসেন।

মানসা আবু বকর (২য় ) ছিলেন প্রচন্ড ভ্রমণ প্রেমিক এবং শান্তি প্রিয় শাসক হিসেবে তার সুনাম ছিল সমগ্র আফ্রিকায় । মানসা আবু বকর এর যেকোনো কিছু জানার প্রতি অনেক ঝোঁক ছিল। 

তিনি ❝আফ্রিকার উপকূল থেকে পশ্চিম দিকে আটলান্টিক সাগর পাড় হয়ে নতুন ভূখণ্ড আবিষ্কার❞ করতে চেয়েছিলেন, মালি সম্রাজ্যকে আরো বড়ো এবং সমৃদ্ধ করার জন্য। মানসা আবু বকর এমন এক সুলতান ছিলেন , যে সব সময় তার প্রজাদের কথা ভাবতো , আর সম্রাজ্যকে আরো শক্তিশালী করার কথা সব সময় চিন্তা করতেন।  তার দূরদর্শী মনে আগে থেকেই বুঝতে পারতেন , সম্রাজ্যকে বাড়াতে না থাকলে একসময় টিকে থাকবে না। 
তার নির্দেশে সাগরের উপকুলে এক বিশাল নৌবহর গড়ে তোলা হয়, প্রতিটি কাঠের জাহাজ এমন ভাবে তৈরী করা হয় যাতে, এগুলি দিয়ে মহাসাগর পারহও যায়, এবং প্রয়োজন হলে এক বছর পর্যন্ত জাহাজেই অবস্থান করা যায়। 


এই নৌবহরের এডমিরালকে নির্দেশ দেন কোনো ক্রমেই যাতে  আটলান্টিকের ওপর পাশের ভূখণ্ডে না পৌঁছা পর্যন্ত যাত্রা স্থগিত না করে। শুধুমাত্র খাবার আর পানির সংকট দেখা দিলে আর আর মধ্যে ভূখণ্ডের দেখা না পেলে ফিরে আসার নির্দেশ দেন। 

২০০ জাহাজের বিশাল নৌবহর নিয়ে সাগরের অভিযানে বের হয়  নৌবহর।  মানসা আবু বকর তখন ও মালি সম্রাজ্যের সুলতান, তাই তিনি এই অভিযানে যেতে পারেননি।

শুধু  একটা জাহাজ কিছুদিন পর  উপকূলে  ফিরে  আসে। জাহাজের ক্যাপ্টেনকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জানান, বাকি সব জাহাজ থেকে তার জাহাজ  বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল । 

তিনি আরো বলেছিলেন , তার সামনে ঘন কুয়াশা ছিল, সামনে থেকে খরস্রোতা নদীর মতো স্রোত জাহাজের দিকে ধেয়ে আসছিলো।  বাকি সব জাহাজ ফিরে না আসায় , তিনি তার জাহাজ ঘুরিয়ে  আফ্রিকার দিকে ফিরে আসেন। 

এই ঘটনার পর মানসা আবু বকর আরো বড় এক নৌ বহর প্রস্তুত করেন,  এইবার নৌবহরের এডমিরাল মানসা আবু বকর নিজেই।

চাদ হ্রদে ঐসময়ের সবচেয়ে ভালো ইঞ্জিনেয়ারদের  দীর্ঘ ভ্রমণের জন্য প্রযোজ্য জাহাজ বানাতে বলেন। 

মানসা আবু বকর  নাবিক , সৈনিক, লেখক , কবি নিয়ে নৌবহরের জন্য প্রস্তুত হন, এবং সবার জন্য দুই বছরের খাবার দাবার এবং নিত্য প্রয়োজনীয় সব কিছু জাহাজে নেন।

তার কথা মতো হাজার  হাজার নাবিক, জ্যোতির্বিদ , সৈনিক, সম্রাজ্যের যত বড় বড় লেখক, দার্শনিক নিয়ে সাগর অভিযানে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেন। 

১০০০ টি জাহাজ আবু বকর ও অন্যান্য নাবিক, কবি , সাহিত্যিক, ইঞ্জিনিয়ার , দার্শনিক এর জন্য । আরো ১০০০ টি জাহাজ ভর্তি অতিরিক্ত রসদ , খাদ্য, পানি, ফল, ফুল গাছের চারা , কিছু পোষা প্রাণী নেন।

আটলান্টিকের পশ্চিমে যে ভূখণ্ড আছে, এটা ওই সময় আফ্রিকার সবাই জানতো।  বিচ্ছিন্ন নাবিক, অভিযাত্রিক এর আগেও পশ্চিমে বিশাল এক ভূখণ্ডে গিয়ে ঘুরে এসেছে এমন কাহিনী কয়েকশো বছর ধরে সবাই জানতো। 

মানসা  আবু বকর ১৩১১ সালে ওয়েস্ট আফ্রিকার উপকূল থেকে  তার আটলান্টিক অভিযান শুরু করেন।  তিনি আর কখনো ফিরে আসেননি। 

মানসা  আবু বকর নৌবহর নিয়ে আটলান্টিকে পাড়ি জমানোর পর, মানসা মুসা সুলতান হন মালি সম্রাজ্যের। ❝মানসা মুসা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী রাজা ছিলেন❞ ওই সময় , কারণ তার মালি সম্রাজ্য সোনা উত্তোলন এবং বাজার নিয়ন্ত্রণ করতো ।  কিছু কিছু আধুনিক অর্থনীতিবিদ মানসা মুসার সম্পদের হিসাব করেন , এখনকার হিসেবে তার ৫ ট্রিলিয়ন US  ডলার সমপরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা ছিল। 

মানসা মুসা নিজেও অনেকটা ভ্রমণ পিপাসু ছিলেন , যেহেতু তার পূর্বসূরি সাগরে পশ্চিম দিকে গিয়েছিলো , মানসা মূসা পূর্বদিকে অর্থাৎ সাহারা মরুভুমি পার হয়ে মিশর হয়ে মক্কায় হজ করতে বের হয়েছিলেন। 

মানসা মুসার দান করার মতো  বড় মন ছিল , ১২ হাজার জনর এক বিশাল কাফেলা নিয়ে বের হন, তার এই কাফেলায়  কয়েকশো  উটের পিঠে সোনা দানা , দামি তৈজসপত্র নিয়ে ৪৫০০ মাইলের পর পাড়ি দিয়ে    হজ করেন  ! পথে যে শহর দিয়েই যেতেন সেখানেই সেখানেই দান  করতেন । 

তিনি কি পরিমান দান করেছেন, তার একটা উদাহরণ দেই , মানসা মুসা মিশরে দান করে চলে যাওয়ার পর  মিশরে এমন পরিমান স্বর্ণ মুদ্রার উপস্থিতি ছিল যে , পরবর্তী ১২ বছর মিসরে  মুদ্রাস্ফীতি ছিল।  ওই যাত্রায় মানসা  মূসা আনুমানিক ১.২ বিলিয়ন US ডলার সমমূল্যের স্বর্ণ মুদ্রা দান করেছিলেন।  ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের মালিক মানসা মুসার জন্য এটা কিছুই না।

হজ করার জন্য মানসা মুসা যখন মক্কায় গিয়েছিলেন , সেখানে সিরিয়ার ঐতিহাসিকবিদ এবং বিখ্যাত স্কলার শিহাব-আল-উমারির দেখা হয় ।  শিহাব আল উমারি তার বইতে মানসা আবু বকর (২য়) সম্পর্কে মানসা মুসার বক্তব্য সরাসরি লিখেন— আমার আগের যে উত্তসুরী যে ক্ষমতায় ছিল, সে বিশ্বাস  করতো না যে আটলান্টিক পার হওয়া অসম্ভব, তার ইচ্ছে শক্তিতে দৃঢ়তা ছিল।  তিনি দুই হাজার জাহাজ ভর্তি নাবিক, রসদ, সোনা, রুপা,  পানি, খাবার দাবার নিয়ে রওনা দিয়েছিলেন। ... তিনি আর কখনো ফিরে আসেনি। "

মানসা আবু বকর একজন অসাধারণ সুলতান ছিলেন। তিনি ওই সময় পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী রাজা ছিলেন এবং  সাগর অভিযানে যাওয়ার জন্য সব ধোন দৌলত আর ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে নৌ বহরে নিয়ে বের হয়েছিলেন। 

❝মানসা আবু বকর  কি  আটলান্টিক পার হয়ে আমেরিকা যেতে পড়েছিলেন ?❞

মানসা আবু বকরের সুবিশাল নৌ বহর নিয়ে আটলান্টিক পার হওয়ার অভিযানে যাওয়ার ১৮১ বছর পর ক্রিস্টোফার কলোম্বার নামের ইতালিয়ান অভিযাত্রিক , যে কিনা স্প্যানিশ রাজ্যের অর্থায়নে স্পেন থেকে আটলান্টিক পারে হয়ে আমেরিকা গিয়েছিলেন। 

কলম্বাসের জার্নালে পাওয়া যায়ঃ

আমেরিকার অধিবাসীদের কাছ থেকে কলম্বাস জানতে পারেন , দক্ষিণ-পূর্ব দিক দিয়ে কালো  রঙের মানুষ নৌকায় করে এসেছে।  তারা সোনার তৈরী ধনুকের মাথা দিয়ে বিনিময় করতো আদিবাসীদের সাথে। এই ধরণের ধনুকের মাথাকে অধিবাসীরা বলতো গুয়ানিন। 

ক্রিস্টোফার কলম্বাস নিজে আমেরিকায় এই আফ্রিকান লোকজনের উপস্থিতি এবং আদিবাসীদের শুনা কথা নিজে  পরোক্ষ করে দেখেন। 

ক্রিস্টোফার কলম্বাস স্পেনের রাজদরবারে এরকম ধনুকের মাথা আনেন   ৩২ টি , তার মধ্যে ১৮ টি সোনার, ৬ টি রুপার আর ৮তা তামার তৈরি। 

পরবর্তীতে গবেষণা করে দেখা যায় যে, ঐসব ধনুকের মাথায় সোনার, রুপার অনুপাত, এবং তামার প্রলেপ,  পশ্চিম আফ্রিকায় যেরকম পাওয়া যায় হুবহু তার মতো।  আর আমেরিকার অধিবাসীরা যে সোনার ধনুকের মাথাকে গুয়ানিন নামে ডাকতো, এই শব্দটা মানডিঙি , মালি সম্রাজ্যের মাতৃভাষা।  গুয়ানিন শব্দের অর্থ হলো সোনার তৈরী। 

আর ক্রিস্টোফার কলম্বাস আর তার ছেলে পশ্চিম আফ্রিকানদের  মতো ডিজানের হাতের রুমাল , আর স্পেনে মরিস মুসলিমদের মতো কাপড়চোপড় আদিবাসীদের পরে থাকতে দেখতে পান । 

১৫১৩ সালে এক স্প্যানিশ নাবিক ভাস্কো নুমেজ ডে  ভালবোয়া আমেরিকা এসেছিলেন , তিনি পানামার  এসেছিলেন , সেখানে গিয়েও অধিবাসীদের কাছ থেকে জানতে পারেন, আফ্রিকান কালো রঙের মানুষ পানামার পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস করছে। 

আমেরিকান  ভূখণ্ডে মুসলিমদের উপস্থিতি সম্পর্কে সবচেয়ে সুস্পষ্ট প্রমানও  পাওয়া যায় কলম্বাসের লেখাতেই।  তিনি তার জার্নালে লিখেছিলেন—
❝সোমবার, অক্টোবার ২১, ১৪৯২ সালে গিবার'র কাছাকাছি, কিউবার  উত্তর-পূর্ব উপকূলের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় খুব সুন্দর পাহাড়ের উপর একটা মসজিদ দেখতে পান।❞

হিংসাপরায়ণ ইউরোপিয়ানরা সব সময়ই বলে আসছে, ক্রিস্টোফার কলম্বাস ভুল দেখেছেন।  তাদের মতে , কলম্বাস উপমা স্বরূপ বলেছেন , যে মসজিদ দেখেছেন। 

এটা হাস্যকর যে ইউরোপীয়ানরা কলম্বাসের জার্নালের সব কিছুই  বিশ্বাস করে শুধু এই অংশ বাদে।  সম্প্রতিকালে অনেকে আবার বলে, কলম্বাস চিনতেন ই না মসজিদ দেখতে কিরকম ছিল ।  এইসব হিংসা পরায়ণদের জন্য জবাব হলো , কলম্বাস যেবছর স্পেন থেকে যাত্রা শুরু করে অর্থাৎ ১৪৯২ সালে , সেই বছর ও গ্রানাডাতে ১৩৭ টি মসজিদ ছিল আর শুধু কর্ডোবা শহরেই এক সময়  ৩০০০ মসজিদ ছিল, খৃস্টানরা দখল করে নেয়ার পরও অনেক বিখ্যাত মসজিদ রয়ে গেছে  ।  পরবর্তীতে ওই মসজিদগুলো খ্রীষ্টান রাজা ভেঙে পুড়িয়ে ফেলে আর কিছু চার্চ বানায়।  ওই সব মসজিদের মধ্যে ১০/১২ তা বিখ্যাত মসজিদ এখনো আছে, আর ওগুলোই স্পেনের ইতিহাসের সেরা স্থাপত্য।

সুতরাং , এ কথা বলা যে কলম্বাস মসজিদ চিনতেন ই না , হিংসাপরায়ণ হয়ে ইতিহাসকে বিকৃতিকে মনোভাবের প্রমান।

ইউরোপীয়ানদের পূর্বে মুসলমানদের আমেরিকা যাওয়া সম্পর্কে  আরেক  প্রমান দিচ্ছি , ইউরোপিয়ানরা অনেক সময় আমেরিকার আদিবাসীদের সাথে চুক্তি করতো।  এই সব চুক্তির দলিল এখনো মার্কিন জাদুঘরগুলুতে পাওয়া যায়, সম্প্রতি আমেরিকার ন্যাশনাল আর্কাইভ ৩০০ টির মতো দলিল ডিজিটাললি স্ক্যান করেছে।

এইসব চুক্তি নামায় , এক মজার বিষয় উঠে আসে, অনেক চুক্তি নামার কাগজের উপরে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।  এটা প্রমান করে যে , আমেরিকার অধিবাসীরা ইসলাম করা গ্রহণ শুরু করেছে ইউরোপীয়ানদের আগমনের অনেক আগে থেকে। 

হারনান কর্টেজ এর মেসো-আমেরিকা জয় করার ইতিহাস লেখক বার্নাল দিয়াজ ডেল কাস্টিলো লিখেছেন—
❝আমেরিকার আদিবাসী মহিলারা অনেকে মুসলিম  মরিস মহিলাদের মতো শরীর ঢেকে কাপড় পরে।❞

অনাহুয়াক (এখন যেটা টেক্সাস আর মেক্সিকো ) এলাকার মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় কর্টেজ ❝৪০০ টি মসজিদ দেখতে পান।❞এটা ছিল ১৫১৯-১৫২১ সালের কাহিনী। 

ইন্টারেষ্টিং সাইড নোট হচ্ছে , ক্যালিফোর্নিয়া নামটিও মুসলিমদের কাছ থেকে নেয়া।

স্পেনের সেভিল শহর যেটা ৫০০ বছর ধরে মুসলিম শহর আর  এটা উম্মায়িদ খেলাফতের প্রাণকেন্দ ছিল।  খলিফা কে ইউরোপীয়ানরা ক্যালিপ Calif /ক্যালিফ বলতো।  ১৫১০ সালে সেভিলে এক বিখ্যাত রোমান্টিক উপন্যাস প্রকাশ হয়, Las Sargas De Esplandian এস্প্লানদিয়ানের এডভেঞ্চার শিরোনামে।  সেখানে রাজা কে ক্যালিফ Calif  আর রানীকে Califia বলা হতো।  এই উপন্যাসে এক কাল্পনিক দ্বীপের উর্ল্লেখ রয়েছে ক্যালিফর্নিয়া। Calif >Califia>আইল্যান্ড অফ California>California

এখান  থেকেই ক্যালিফোর্নিয়ার নামকরণ করা হয় ১৫৩৫ সালে। 

পরবর্তীতে  মুসলিমদের আমেরিকায় টিকে থাকার সংগ্রাম , দক্ষিণ আমেরিকায় বিভিন্ন বিপ্লবে মুসলিমদের অবদানের ইতিহাস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।

মানসা আবু বকরের আমেরিকা অভিযান নিয়ে বাংলা ডকুমেন্টারী: https://youtu.be/fg2Vz4rpVHQ


তথ্যসূত্র—
১. Díaz del Castillo, Bernal (1963) [1632]. The Conquest of New Spain.
২. Thomas, Hugh (1993). Conquest: Montezuma, Cortes, and the Fall of Old Mexico
৩. Ruth Putnam. California: The Name. University of California Publications in History, 4, No. 4 (1917).

৪. Al-Umari , Masalik al Absar fi Mamalik el-Amsar,  Translation by Gaudefroy-Demombynes, Paris, Paul Geuthner, 1927


লিখেছেন— মোহাম্মদ জুলফিকার রিজন  

বুধবার, ১৩ জুলাই, ২০২২

রোবটিকসের জনক ইসমাঈল আল-জাজারি


জকে আমরা পরিচিত হব একজন মহান বিজ্ঞানীর সঙ্গে। যাঁকে রোবটিকসের জনক হিসেবে অভিহিত করা হয়। এ ছাড়া তিনি একাধারে একজন পণ্ডিত, আবিষ্কারক, যন্ত্রপ্রকৌশলী, কারিগর, শিল্পী ও গণিতবিদ ছিলেন।


বাদিউজ জামান আবুল ঈজ ইবনে ইসমাঈল আল-জাজারি। তিনি ১১৩৬ খ্রিস্টাব্দে তুরস্কের দাজলা (টাইগ্রিস) নদীর তীরবর্তী ‘জাজিরা ইবনে উমার’ এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট স্কলার, উদ্ভাবক ও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। ছিলেন মুসলিম সভ্যতার একজন মহান বিজ্ঞানী।

১১৭৪ সাল থেকে দীর্ঘ ২৫ বছর পর্যন্ত বিজ্ঞান সাধনায় লেগে থাকেন তিনি। বিজ্ঞানে প্রথম রোবটিক যন্ত্রের আবিষ্কার করেন এই মহান বিজ্ঞানী। তাঁর গবেষণাকর্মে সহযোগিতা করেন আদির অঞ্চলের শাসক নাসির উদ্দীন মাহমুদ (তিনি সালাহউদ্দীন আইয়ুবির বংশধর ছিলেন)। তাঁরই অনুরোধে ইসমাঈল আল-জাজারি তাঁর গবেষণাগুলো পুস্তিকা আকারে সংরক্ষণ করেন। যার নাম দেওয়া হয়, ‘কিতাবুল হিয়াল’। যেহেতু তিনি একজন সুদক্ষ চিত্রশিল্পীও ছিলেন, তাই তাঁর উদ্ভাবনের থিওরিগুলো আরব্য চিত্রশিল্পের ধাঁচে এমনভাবে চিত্রাকারে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, যা পাঠককে তাঁর থিওরিগুলো সহজে বুঝতে ও পুনর্গঠন করতে সাহায্য করেছিল।

(ওয়ান থাউজেন্ড অ্যান্ড ওয়ান ইনভ্যানসন্স মুসলিম হ্যারিটেজ ইন আওয়ার ওয়ার্ল্ড, পৃ. ১৫)গ্রন্থটি বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এটির কয়েকটি মূল কপি বিশ্বের বিখ্যাত কিছু জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। যার মধ্যে ফ্রান্সের বিখ্যাত ‘ল্যুভ মিউজিয়াম’ ও যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের ‘আর্টস মিউজিয়াম’ অন্যতম।

মিউজিয়ামগুলোতে আসা দর্শনার্থীরা খুব যত্নের সঙ্গেই গ্রন্থটি দেখেন। তাঁর মৃত্যুর ১০০ বছর পর ইউরোপের বিজ্ঞানীরা সেসব ধারণা নিয়ে বিভিন্ন যন্ত্র আবিষ্কার করেন। ইংরেজ ইতিহাসবিদ ডোনাল্ড আর হিল তাঁর রচিত ‘স্টাডিজ ইন মেডিয়েভল ইসলামিক টেকনোলজি’ পুস্তকে উল্লেখ করেন : ‘প্রকৌশলের ইতিহাসে আল-জাজারির গুরুত্ব অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। আধুনিককাল পর্যন্ত আর কোনো সভ্যতা থেকে এর তুলনীয় যন্ত্রের নকশা, উৎপাদন ও বিভিন্ন নির্দেশসংবলিত তেমন কোনো রচনা পাওয়া যায়নি। এর প্রভাব পরবর্তীকালের স্টিম-ইঞ্জিন এবং অন্তর্দাহ যন্ত্রের (internal combustion) নকশায় দেখা যায়।’

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় ইংরেজ প্রাচ্যবিদ এবং বিজ্ঞানী ডোনাল্ড হিল (১৯২২-১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দ) গ্রন্থটি অনুবাদ করে জাদুঘরের আড়াল থেকে জ্ঞানপিপাসুদের দৃষ্টির সামনে নিয়ে আসেন। যার নাম দেওয়া হয়, ‘দ্য বুক অব নলেজ অব ইঞ্জিনিয়ার্স মেকানিক্যাল ডিভাইসেজ’।

মার্কিন ইতিহাসবিদ ও ইঞ্জিনিয়ার প্রফেসর লেইন হোয়াইট জুনিয়র (১৯০৭-১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দ) ‘দ্য বুক অব নলেজ অব ইঞ্জিনিয়ার্স মেকানিক্যাল ডিভাইসেজ’-এর ভূমিকায় লেখেন, অধুনা ইউরোপে আবিষ্কৃত অনেক স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মূল ধারণা ও নকশা আল-জাজারির গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।

আল-জাজারি শুধু স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের ধারণা দিয়েই ক্ষান্ত হননি। বরং তাঁর বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে কিছু মূল্যবান যন্ত্রও আবিষ্কার করেছিলেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, স্বয়ংক্রিয় ফ্লাশ মেকানিজমসমৃদ্ধ একটি ওয়াশিং মেশিন। যার মাধ্যমে বাদশাহ নাসির উদ্দীন মাহমুদ অজু করতেন। আজকের বিজ্ঞানীদের ধারণা, এটাই পৃথিবীর সর্বপ্রথম রোবটিক যন্ত্র! এখান থেকেই অন্যান্য রোবটিক যন্ত্রের ধারণা তৈরি হয়। (প্রাগুক্ত)এ ছাড়া তাঁর আবিষ্কারের মধ্যে রয়েছে এলিফেন্ট ক্লক বা হাতিঘড়ি, যার একটি নমুনা বর্তমানে দুবাইয়ের ইবনে বতুতা শপিং মলে সাজানো আছে। রয়েছে আল-জাজারির ১১ ফুট উঁচু জ্যোতির্বিদ্যাবিষয়ক দুর্গ-ঘড়িটিতে সময় গণনা ছাড়াও রাশিচক্র এবং সৌর ও চন্দ্র কক্ষপথ দেখানো হয়েছে।

আল-জাজারি পানির শক্তির সাহায্যে ময়ূর-রোবট এবং পানির শক্তিতে চালিত ঘড়ির অংশ হিসেবে স্বয়ংক্রিয় দরজাও নির্মাণ করেন। তিনি একটি মানবাকৃতির রোবট পরিচারিকা তৈরি করেন, যা পানীয় পরিবেশন করতে পারত। ফ্লাশ প্রযুক্তিসহ আল-জাজারি একটি স্বয়ংক্রিয় বেসিন উদ্ভাবন করেন, যা আজকাল আধুনিক ফ্লাশ টয়লেটে ব্যবহৃত হয়। এতে একটি নারী-রোবট পানিভর্তি বেসিনের কাছে দাঁড়িয়ে থাকে। ব্যবহারকারী একটি লিভার টান দিলেই পানি নিচে চলে যায় এবং নারী-রোবটটি আবার বেসিনে পানি ভরে দেয়।

রাজকীয় আসরের অতিথিদের চিত্তবিনোদনের জন্য আল-জাজারি নির্মিত চারটি সংগীতজ্ঞ রোবটসহ একটি নৌকা একটি কৃত্রিম হ্রদে ভাসমান থাকবে। এর প্রোগ্রামেবল ঢোলকের কাঠিগুলো ঘোরালে ঢোলবাদক বিভিন্ন ছন্দে ও তালে ঢোল বাজাতে পারবে। এমন আরো অনেক উদ্ভাবনের মাধ্যমে তিনি পৃথিবীকে চিরঋণী করেছিলেন।

মুসলিমদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক ও পন্ডিত ইবনে রুশদ।


অজ্ঞতা থেকে ভীতি তৈরি হয়, ভীতি ঘৃণার সৃষ্টি করে আর ঘৃণা থেকে আসে হিংস্রতা। এটাই নিয়ম।”
– ইবনে রুশদ

প্রারম্ভিকাঃ

আমাদের আজকের এ সমাজব্যবস্থা আস্তিক আর নাস্তিক এই দু’ভাগে খণ্ডিত। তারা নির্দিষ্ট করে নিয়েছে ধর্ম মানলে বিজ্ঞান বা দর্শন মানা যাবে না, আর বিজ্ঞান বা দর্শনতত্ত্ব মানলে ধর্ম মানা যাবে না। অথচ বিজ্ঞানের জগতে যখন তোলপাড় জাগতে শুরু করেছে, মুসলিমরাই তখন অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে। জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় ছিল মুসলিমদের আধিপত্য। এমনি একজন মুসলিম দার্শনিক, বিজ্ঞানী, চিকিৎসাবীদ, জ্যোতির্বিদ ইবনে রুশদ; যিনি ধর্ম আর দর্শনের মাঝে সেতু বন্ধন তৈরি করে গেছেন।

অষ্টম শতক পর্যন্ত আরবে গ্রীক দর্শনকে সন্দেহের চোখে দেখা হতো। দর্শন ধর্মের সাথে সংঘাতপূর্ণ বলেই ভাবা হতো। তবে মুতাজিলা (যারা দর্শনকে ধর্মের সাথে সংঘাতপূর্ণ ভাবতো না) ধর্মতত্ত্বের প্রবর্তনে গ্রীক দর্শন কিছুটা হলেও গ্রহণযোগ্যতা খুঁজে পায়। অষ্টম থেকে ১২শ শতাব্দী হলো অষ্টম প্রাথমিক ইসলামী দর্শনের ব্যাপ্তিকাল। এ সময়কে ইসলামী স্বর্ণযুগ বলা হয়।

দার্শনিক আল কিন্দি এর সূচনা করেছিলেন এবং ইবনে রুশদের হাতে এই প্রাথমিক সময়টির সমাপ্তি ঘটে।

কিন্তু এর মাঝে ইমাম আবু আল হাসান আল আশ’আরী প্রবর্তিত ‘আশ’আরী’ তত্ত্ব নতুন করে দর্শন বিরোধিতা শুরু করে এবং সবধরনের যুক্তি-তর্ক আর প্রশ্ন করার ব্যাপারটিকে তারা ‘অবিশ্বাস’ বলে আখ্যায়িত করতে থাকে। ইবনে রুশদ এমনই এক প্রতিকূল পরিবেশে নিজের দর্শন রচনা করে গেছেন। তিনি অবশ্যই কুরআনকে সত্য গ্রন্থ হিসেবে স্বীকার করেছেন। তবে তিনি বলেছেন যে কুরআনের অনেক কিছুই গভীর অর্থবহ, যা বুঝতে হলে দর্শনের প্রয়োজন। তিনি যে রাজবংশের হয়ে রাজনীতি করেছেন, সে বংশের উদার পৃষ্ঠপোষকতাই তাকে তার দর্শন নিয়ে এগোতে সহায়তা করেছে।

মুসলিমদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক ও পন্ডিত হিসেবে ইবনে রুশদের নাম ইতিহাসের পাতায় জ্বলজ্বল করছে। রেনেসাঁর যুগে ইউরোপে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল আকাশছোঁয়া।  তবে এই দর্শনের জন্যই তাঁর জীবনে নেমে এসেছিল কালো মেঘের ঘনঘটা।

ক্রমশ বাড়তে থাকা তার উদারবাদী দর্শন বিরোধী আন্দোলনের মুখে তাকে নির্বাসিত হতে হয়েছিল। ভাগ্যক্রমে নির্বাসনের পূর্বেই রুশদ তার শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ‘ডিসিসিভ ট্রিটিজ’ রচনা করে ফেলেছিলেন।

জন্মঃ

তিনি কর্ডোবায় এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে১৪ এপ্রিল ১১২৬ (৫২০ হিজরী) সালে জন্মগ্রহণ করেন। 

তাঁর পরিবার শহরের লোকপ্রসাশন সংক্রান্ত কাজ, বিশেষত বিচার ও ধর্মীয় বিষয়ে জড়িত থাকার কারণে সুপরিচিত ছিলো। তাঁর পিতামহ আবুল ওয়ালিদ মুহম্মদ (মৃত্যুঃ১১২৬)আল মোরাভি কর্ডোবার প্রধান বিচারপতি(কাজি) ও কর্ডোবার কেন্দ্রীয় মসজিদের ইমাম ছিলেন।তাঁর পিতা আবুল কাসিমও পরবর্তীতে কর্ডোবার প্রধান বিচারপতি ছিলেন,১১৪৬ সালে আল-মোহাদ রাজবংশ আল-মোরাভিদের স্থলাভিষিক্ত হলে তাকে পদচ্যুত করা হয়।

তার পুরো নামঃ

আবুল ওয়ালিদ মুহাম্মাদ ইবন আহমাদ ইবন রুশদ (আরবি: أبو الوليد محمد ابن احمد ابن رشد‎, ১৪ এপ্রিল ১১২৬- ১১ ডিসেম্বর, ১১৯৮) বা সংক্ষেপে ইবনে রুশদ । তিনি পাশ্চাত্যে সমধিক পরিচিত Aveross নামে।

শিক্ষালাভঃ

তার জীবনীকারদের মতে ইবন রুশদের শিক্ষাজীবন ছিলো অসাধারণ। হাদিসশাস্ত্র হতে শুরু করে, ফিকহ, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়েছিলেন।

তিনি মালিকি ফিকহ শিখেছিলেন আল-হাফিজ আবু মুহম্মদ ইবন রিযক এর কাছে, হাদিসশাস্ত্রের পাঠ নিয়েছেন তাঁর পিতামহের এক শিষ্যের কাছে। তাঁর পিতামহও তাকে ফিকহ এর জ্ঞান দিয়েছিলেন, বিশেষ করে ইমাম মালিকের সর্বশ্রেষ্ঠ কর্ম মুয়াত্তার পাঠ দিয়েছিলেন। তিনি আবু-জা'ফর জারিম আল-তাজাইল এর নিকট চিকিৎসার জ্ঞান লাভ করেন, যিনি সম্ভবত তাঁকে দর্শন এর দীক্ষাও দিয়েছেন।

তিনি দার্শনিক ইবন বাজা এর লেখনীর সম্পর্কেও অবগত ছিলেন, খুব সম্ভবত তার সাথে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত ছিলেন অথবা তাঁর ছাত্রত্বেও থেকে থাকতে পারেন। তিনি নিয়মিতই সেভিল এ অনুষ্ঠিত দার্শনিক, চিকিৎসাবিদ ও কবিদের সভায় উপস্থিত থাকতেন, এ সভা সেসময়কার বিখ্যাত দার্শনিক ইবন তুফায়েল ও চিকিৎসাবিদ ইবন যুহর অংশগ্রহণ করতেন। তিনি আশ'আরী মতের কালাম ধর্মতত্ত্ব পড়েছিলেন, যার সমালোচক হিসেবে পরবর্তী জীবনে তিনি অবতীর্ণ হন।

এছাড়াও তিনি লেখাপড়া করার সুযোগ পেয়েছেন দুই বিখ্যাত শিক্ষকের কাছে। এরা হচ্ছেন : আবু জাফর হারুন এবং ইবনে রাজা। তিনি সুযোগ পান কর্ডোভা পাঠাগারে পড়াশোনার। এই পাঠাগারে ছিল ৫ লাখ বইয়ের সমাহার। এই বিপুল সংগ্রহের অনেক মৌলিক বই তিনি সেখানে পাঠ করেন। এই লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন আল হাকাম। তিনি ছিলেন স্পেনের উমাইয়া বংশীয় বিখ্যাত খলীফা। তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ হলে তাকে ডেকে নেয়া হয় মরক্কোতে। আর ইয়াকুব সেখানে তাকে তাঁর চিকিৎসক পদে নিয়োগ দেন। তিনি ইবনে তোফায়েলের স্থলাভিষিক্ত হন।

গৌরবময় কর্মজীবনঃ

১১৫৩ সাল নাগাদ ইবন রুশদ আল-মোহাদ খেলাফতের রাজধানী মারাক্কেশ এ অবস্থান করছিলেন।সম্ভবত মারাক্কেশে অবস্থানকালীন সময়ে তিনি বিখ্যাত দার্শনিক ও হায়্যি ইবন ইয়াকযান এর রচয়িতা ইবন তুফায়েল এর সাথে দেখা হয়েছিলো। ইবন তুফায়েলও তখন মারাক্কেশে রাজসভার চিকিৎসক ছিলেন। তাঁদের দুজনার মতভিন্নতা থাকলেও তাঁরা একে অপরকে বন্ধুত্বে বরণ করেছিলেন। ১১৬৯ সালে ইবন তুফায়েল ইবন রুশদকে আল-মোহাদ খলিফা আবু ইয়াকুব ইউসুফের সাথে পরিচয় করান।

শিক্ষানুরাগী খলিফা ইবন রুশদের প্রতিভায় রীতিমতো মুগ্ধ হন। তিনি ইবন রুশদের বিভিন্ন গবেষণা কর্মে সাহায্য করেন।

ইবনে রুশদ ১১৬৯ খ্রীস্টাব্দে সেভিলের এবং ১১৭১ খ্রীস্টাব্দে কর্ডোভার কাজীর পদ লাভ করেন। তিনি স্পেনের আন্দালুসিয়ার কাযী-উল-কুযতের পদে নিযুক্ত হন ১১৮২ খ্রীস্টাব্দে।

১১৮৪ সালে আবু ইউসুফের মৃত্যুর পরও তিনি বহাল থাকেন আপন পদে।খলিফার পদে অভিষেক ঘটে আবু ইউসুফ ইয়াকুব আল-মানসুরের। ১১ বছর রুশদকে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিলো সুলতান মনসুর।রুশদ আইনে সুপণ্ডিত হলেও তার নাম ছড়িয়েছিল চিকিৎসা ও দর্শনশাস্ত্রে।

নির্বাসনঃ

পরিণত হয়ে ওঠলে ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন বিষয়ে তিনি তাঁর মতামত প্রকাশ করতে শুরু করেন। তার মতামত প্ৰকাশ করতে গিয়ে তাঁর জীবনে নেমে আসে অভিশাপ। রাজনৈতিক জটিলতা তাকে রাজরোষের কবলে ফেলে ১১৯৫ সালে। তাকে নির্বাসনে পাঠানো হলো লুসিয়ানায়।

শুধু একান্ত বিজ্ঞান বিষয়ক বইগুলো ছাড়া তাঁর বাকি বইগুলো পুড়িয়ে দেয়া হল। তিনি নির্বাসনে কাটান চার বছর। এরই মধ্যে তাঁর ব্যাপারটি নিয়ে মধ্যস্থতায় নামলেন বেশ ক’জন শীর্ষস্থানীয় পণ্ডিতবর। তাদের ওকালতিতে ইবনে রুশদের ওপর থেকে নির্বাসন আদেশ প্রত্যাহার করে নেন মরক্কোর শাসক। ১১৯৮ খৃষ্টাব্দে তাকে ডেকে আনা হলো মরক্কোতে।

অ্যারিস্টটলের ব্যাখ্যাকর্ম ও  ইসলামি দার্শনিক চিন্তাঃ

ইবন রুশদ অ্যারিস্টললের মতাদর্শের এক উৎসাহী সমর্থক ছিলেন; তিনি অ্যারিস্টটলের মূল শিক্ষা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়াস করেছিলেন।আল গাজ্জালী যেখানে গ্রীক দর্শনের অশুভ প্রভাব থেকে ইসলামকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন সেখানে ইবনে রুশদ এ্যারিস্টটলের দর্শনের সাথে ইসলামী মতবাদের সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা করেছিলেন।

ইবনে রুশদের দার্শনিক চিন্তার বৈশিষ্ট্য এই যে, তিনি ইসলামের ধর্মীয়বোধের বিরোধিতা না করেও গ্রিসের দার্শনিক এ্যারিস্টটলের দর্শনের বস্তুবাদী দিক বিকশিত করার চেষ্টা করেন। তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, বস্তু এবং গতির কোনো স্রষ্টা নেই।

সে সময়ে তার নাগালে থাকা অ্যারিস্টটলের প্রায় সকল কাজের ব্যাখ্যা লিখেছিলেন। শুধুমাত্র অ্যারিস্টটলের রাষ্ট্রনীতি বাদে, যেটা সম্ভবত তাঁর নাগালের মাঝে ছিল না। তিনি তাই প্লেটোর রিপাবলিক এর উপর ব্যাখ্যা লিখেছিলেন।

তিনি তার ব্যাখ্যাগুলোকে কয়েকভাগে ভাগ করেছিলেন; যাকে আধুনিক পন্ডিতগণ দীর্ধ, মধ্যম ও সংক্ষিপ্ত তিন শ্রেণিতে ভাগ করেছেন। তার সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলোর বেশিরভাগই কর্মজীবনের সূচনায় লিখিত, যেগুলো অ্যারিস্টটলের নানা মতবাদের সারসংক্ষেপ বহন করে। তার মধ্যম বক্তৃতাগুলো অ্যারিষ্টটলের মূল বক্তব্যের উদ্ধৃতি বহন এবং এর বক্তব্যকে সরলীকরণের প্রয়াস করে।

এ মধ্যবর্তী কাজ গুলো সাধারণত তার পৃষ্ঠপোষক খলিফা আবু ইয়াকুব ইউসুফ কর্তৃক অনুযোগের কারণে লিখিত; যখন খলিফা বলেছিলেন তাঁর অ্যারিস্টটলের কাজ বুঝে উঠতে অসুবিধা হচ্ছিলো। তার দীর্ঘ ব্যাখ্যাতে প্রতি পংক্তির ব্যাখ্যা তিনি সংযোজন করেছেন, এবং এতে তার নিজস্ব চিন্তার প্রতিফলনও দেখা যায়; স্বভাবতই এগুলো সম্ভবত সাধারণ্যের জন্যে লিখিত ছিলো না। অ্যাারিষ্টটলের প্রধান পাঁচটি কাজেরই এধরণের তিন প্রকার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।

তাঁর মতে অ্যারিস্টটলের মূল বক্তব্য আল-ফারাবি, ইবন সিনার মতো মুসলিম দার্শনিকদের নিওপ্লাটোনিস্ট ভাবধারার কবলে পড়ে বিকৃতি লাভ করেছিলো।

তিনি দেখান যে প্লেটোর মতামত এবং অ্যারিস্টটলের মত সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি আল ফারাবির যুক্তিবিদ্যার কাজেরও সমালোচনা করেন মূল অ্যারিস্টটলীয় উৎসের অপব্যাখ্যা করার জন্য। ইবন সিনা, যিনি ছিলেন মধ্যযুগে ইসলামি নিওপ্লাটোনিজমের প্রধান প্রবক্তা, তাঁর সমালোচক হিসেবেও ইবন রুশদ অবতীর্ণ হন।

তিনি অ্যারিস্টটলের সঙ্গীত বিষয়ক বই De Anima’র সমালোচনা করে বই লিখেন। মিশেল দ্যা স্কট নামে জনৈক অনুবাদক। এটি লাতিন ভাষায় অনুবাদ করেন।

স্বতন্ত্র দার্শনিক কাজঃ

ইবন রুশদ স্বতন্ত্র দার্শনিক গবেষণাপত্র লিখেছেন; যার মধ্যে আছে বুদ্ধিবৃত্তির উপর, সময়ের উপর, মহাকাশীয় গোলকের উপর এবং গোলকের গতির সম্বন্ধীয়। তিনি কিছু সমালোচনামূলক গ্রন্থও লিখেছেনঃ আল-ফারাবির যুক্তিবিদ্যা পাঠের পদ্ধতির সাথে অ্যারিস্টটলের পদ্ধতির তুলনা, ইবন সিনার কিতাব-আশ শিফা অনুসারে অধিবিদ্যা, এবং ইবন সিনার অস্তিত্বশীল সত্তার শ্রেণিকরণের বিরোধিতা।

চিকিৎসাশাস্ত্রঃ

ইবন রুশদ আল-মোহাদ খিলাফতের সভায় রাজচিকিৎসক পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। সেই সুবাদে চিকিৎসাশাস্ত্রে উচ্চতর গবেষণা করেন।

ইবনে রুশদ মানব জাতিকে উপহার দিয়ে গেছেন তার বিখ্যাত গ্ৰন্থ : ‘কিতাব আল কুলিয়াত ফি আল তিব্বি’’। চিকিৎসা শাস্ত্রে এটি একটি মাস্টার ওয়ার্ক।  পাশ্চাত্যে ল্যাটিনকৃত নাম কলিজেট[The Colliget] নামে পরিচিত)।

এ বই ১১৬২ সাল নাগাদ লেখা হয়েছিলো, তাঁর রাজচিকিৎসক পদে অধিষ্ঠিত হবার কিছুকাল আগে। তাঁর বইয়ের শিরোনাম সমসাময়িক আন্দালুসীয় চিকিৎসক ইবন যুহরের আল-জুযি'ইয়্যাত ফিত-তিব ( "চিকিৎসার বিশেষায়িত নীতিমালা") এর বিপরীত; মূলত তার এ কাজ ইবন যুহরের বইয়ের সাথে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে রচিত হয়েছিলো।

এতে রয়েছে চিকিৎসা শাস্ত্রের তিনটি মৌল বিষয় : রোগ বিশ্লেষণ (ডায়োগনেসিস), নিরাময় (কিউরী) এবং প্রতিরোধ (প্রিভেনশন)। বইটিতে ইবনে সিনার ‘আল-কানুন’ সম্পর্কে সর্বশেষ উল্লেখ রয়েছে।

ল্যাটিনে অনুদিত হয়ে তাঁর এ বই ইউরোপে কয়েক শতাব্দীকাল ব্যাপী চিকিৎসাবিদ্যা শিক্ষার প্রমিত গ্রন্থরূপে ব্যবহৃত হয়েছিলো।ইবন রুশদ গ্রিক চিকিৎসাবিদ গ্যালেনের কর্মের সারবত্তা নিয়ে লিখেছেন এবং ইবন সিনার উরজুযাহ ফিত-তিব এর বিশ্লেষণ রচনা করেছেন।

দর্শনশাস্ত্র ও ইসলামঃ

দ্য ডিসিসিভ ট্রিটিজ বইয়ে তিনি ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে দর্শন ও ধর্মের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন। এই বইতে দর্শন কেন গুরুত্বপূর্ণ, সে আলোচনা শুরু করেছেন পবিত্র কোরআন থেকে নেয়া দুটি আয়াত দিয়ে।

ইবনে রুশদ ছিলেন উদারবাদী দার্শনিক এবং মনেপ্রাণে একজন আন্তরিক মুসলিম। তাই কোরআনকেই শ্রেষ্ঠ ধর্মগ্রন্থ বলে ঘোষণা দেন তিনি। তার মতে, প্রতিপাদক পদ্ধতিতে সত্য যাচাই করতে গেলে চূড়ান্ত গন্তব্যে কোরআনের কাছেই পৌঁছতে হবে। কারণ কোরআনে প্রকৃতির সত্য উদঘাটন করা হয়েছে।

ইবনে রুশদের মতে, ধর্মগ্রন্থকে তিনভাবে বিশ্লেষণ করে তা থেকে দর্শন খুঁজে পাওয়া সম্ভব। প্রতিপাদন, ন্যায়শাস্ত্রে যাচাই এবং অলংকারশাস্ত্র। আর এই তিন উপায়ে ধর্মশাস্ত্র ব্যাখ্যা করে মানবজাতি তিন শ্রেণীতে ভাগ হয়ে যায়। প্রথম শ্রেণী দার্শনিকদের। দ্বিতীয় শ্রেণীতে থাকে ধর্মতাত্ত্বিকরা। আর সবশেষে সাধারণ মানুষের অবস্থান।

তিনি আল গাযালির মতো আশ’আরি ধর্মতত্ত্ববিদগণের সমালোচনার বিরুদ্ধে গিয়ে দর্শনের চর্চার সমর্থন করেন। ইবন রুশদ বলেন যে, দর্শনের চর্চা ইসলামের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে অনুমোদিত এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক।

তবে তার মতে যদি কোনোকিছুর প্রতিপাদন কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তবে সেটা কেবলই সাময়িক একটি ব্যাপার। ভবিষ্যতে তার সমাধানও অনিবার্য। আবার কোনো ক্ষেত্রে যদি ধর্ম এবং ধর্মগ্রন্থ উভয়েই কোনো বিষয়ের অস্তিত্বে বিরোধ প্রকাশ করে, তবে সেক্ষেত্রে ধর্মগ্রন্থকে রূপকার্থে ব্যাখ্যা করতে হবে। আর রূপক শুধু দার্শনিকরা ব্যবহার করেন না, ধর্মতত্ত্ববিদরাও ব্যবহার করেন। তাই দর্শনকে ধর্মতত্ত্বের সাথে সাংঘর্ষিক ভাবাটা যুক্তিসঙ্গত নয়।

জ্যোতির্বিজ্ঞানেঃ

১১৫৩ সাল নাগাদ ইবন রুশদ আল-মোহাদ খেলাফতের রাজধানী মারাক্কেশ এ অবস্থান করছিলেন। কারণ নব্য প্রতিষ্ঠিত খেলাফতের নতুন কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ও মসজিদ নির্মাণ কাজে কিছু জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত হিসাব নিকাশে তাঁর কাজ করতে হচ্ছিলো। তিনি জ্যোতির্বিদ্যার সমসাময়িক গানিতিক নিয়মগুলো নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না, তাই নতুন কিছু ভৌত সূত্র এর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। তবে তাঁর এ প্রচেষ্টা তখন ব্যর্থ হয়।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানঃ

ইবন রুশদ প্লেটোর রিপাবলিক এর ব্যাখ্যাকর্মে তাঁর রাজনৈতিক তত্ত্ব সংক্রান্ত চিন্তা চিত্রিত করেন। তিনি প্লেটোর চিন্তাধারার সাথে ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার সমন্বয় করার প্রয়াস নেন; তিনি আদর্শ রাষ্ট্রের মডেল হিসেবে ইসলামি আইনভিত্তিক (শরিয়াহ) শাসন ব্যাবস্থায় শাসিত রাষ্ট্রের কথা বলেন। তিনি প্লেটোর দার্শনিক-রাজ এর সমান্তরাল হিসেবে আল-ফারাবিকে অনুসরণ করেন এবং বলেন একে ইমাম, খলিফা এবং আইনপ্রণেতা ফকিহ এর সাথে তুলনা করেন।

স্রষ্টার অস্তিত্বঃ

ইবন রুশদ তাঁর বই কাশফ'আন মানাহিজ আল-আদিলাহ গ্রন্থে স্রষ্টার অস্তিত্ব ও প্রকৃতি সম্বন্ধে নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করেন। তিনি ইসলামের বিভিন্ন ধারার মতবাদের পরীক্ষণ এবং সমালোচনা করেন: আশ'আরী, মু'তাজিলা, সুফিবাদী প্রভৃতি ধারার।

অন্যদিকে তিনি তিনি প্রত্যেকের স্রষ্ট্রার অস্তিত্ব সংক্রান্ত যুক্তি নিরীক্ষণ এবং সমালোচনা করেন। ইবন রুশদ মত ব্যক্ত করেন যে দু' ধরণের প্রমাণ আছে স্রষ্টার অস্তিত্ব সংক্রান্ত যেটা তিনি মনে করেন যৌক্তিকভাবে সংগতিপূর্ণ এবং কুরআন কর্তৃক সমর্থিত। প্রথমোক্তটি হচ্ছে বিশ্বের অতিমাত্রায় সুষমামন্ডিত হবার থেকে, যা জীবনকে সম্ভবপর করে তুলেছে। ইবন রুশদ সূর্য, চাঁদ নদ-নদী, সমুদ্র এবং ভূপৃষ্ঠে মানবপ্রজাতির অবস্থানের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তাঁর মতে এটি একজন স্রষ্টার দিকে ইঙ্গিত করে যিনি মানবজাতির কল্যাণের জন্য এসবের অবতারণা করেছেন। এ সংক্রান্ত তার অন্য মত টি হল 'উদ্ভাবন প্রসঙ্গে'; পৃথিবীর উপর জীব্জন্তু ও গাছপালা গুলো যেন মানুষের জন্যই কেউ উদ্ভাবন করেছে। ইবন রুশদের এ আর্গুমেন্ট গুলো টেলিওলোজিকাল ধরণের, অ্যারিস্টটল বা তাঁর সমসাময়িক মুসলিম কালামশাস্ত্রীদের মতো মহাজাগতিক তথা কসমোলজিকাল ধরণের নয়।

আল্লাহর গুণাবলী নিয়ে মুসলিম দর্শনের গোড়া থেকে ‘মুতাজিলা’ ও ‘আশারিয়া’ সম্প্রদায়ের মধ্যে বিতর্ক চলে আসছিল। মুতাজিলা সম্প্রদায় আল্লাহর একত্ব নষ্ট হবে বলে আল্লাহর যে ৯৯ টি গুণাবলী আছে বলে ধারণা করা হয় তা তারা অস্বীকার করেছিলেন বা তারা আল্লাহর গুণাবলীকে একটিতে নামিয়ে এনেছিলেন। পক্ষান্তরে আশারিয়া সম্প্রদায় কোরআনে ঐশী গুণের উল্লেখ আছে বলে তা অস্বীকার করতে পারেন নি। গাজ্জালী আশারিয়াদের সমর্থন করে বক্তব্য রাখেন এবং পরবর্তিকালে ‘ইবনে সিনা’ মুতাজিলাদের সমর্থণ করে বক্তব্য রাখেন। ঐশী গুণাবলী সম্পর্কে ইবনে রুশদের মতামতের সাথে ইবনে সিনার মতের অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

তার রচনা সমগ্রঃ

তিনি নির্বাসনে যাওয়ার পূর্বে তার মূল্যবান গ্রন্থসমুহ রচনা করেন। তার গ্রন্থের বর্ণনা নিম্নরূপ—

আরবি ভাষায় দর্শনশাস্ত্রে ২৮টি, চিকিৎসা শাস্ত্রে ২০টি, ফিকাশাস্ত্রে ৬টি, জ্যোতির্বিজ্ঞানে ৮টি ও আরবি-ব্যাকরণে ২টি বই লেখা শেষ করে ফেলেন।

এছাড়াও প্রাচ্যবিদ আর্নেস্ট রেনান এর মতে ইবন রুশদের অন্তত ৬৭ টি স্বতন্ত্র রচনা বিদ্যমান; তন্মধ্যে ২৮ টি দর্শন, ২০ টি চিকিৎসাবিদ্যা, ৮ টি আইনবিদ্যা, ৫ টি ধর্মতত্ত্ব ও ৪ টি ব্যাকরণ নিয়ে, এর সাথে আছে অ্যারিস্টটলের সিংহভাগ কাজের উপর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং প্লেটোর রিপাবলিক এর উপর বক্তৃতা।

ইবন রুশদের অনেক কাজের মূল আরবি পান্ডুলিপি পাওয়া যায় নি, বেশিরভাগই শুধুমাত্র হিব্রু এবং ল্যাটিন অনুবাদের পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ অ্যারিস্টটলের উপর তার দীর্ঘ ব্যাখ্যাগুলোর খুব কম অংশের মূল আরবি পান্ডুলিপি উদ্ধার সম্ভব হয়েছে।

স্বরণেঃ

ইবন রুশদের উল্লেখ পাশ্চাত্যে এবং মুসলিম বিশ্বে উভয় স্থানের সাংস্কৃতিক কর্মে দেখা যায়। ইতালীয় লেখক দান্তের ১৩২০ সালে লিখিত কবিতা দ্য ডিভাইন কমেডি তে অন্যান্য অ-খ্রিষ্টান গ্রিক এবং মুসলিম চিন্তক যেমন লিম্বো এবং সালাহউদ্দিন মধ্যে ইবন রুশদকে চিত্রিত করা হয়েছে "মহান ব্যাখ্যাকারী" অভিধায়। দ্য ক্যান্টারবেরি টেলস(১৩৮৭) এর সূচনায় ইংরেজ কবি জেফ্রি চসার ইবন রুশদকে তৎকালীন ইউরোপের অন্যান্য মেডিকেল অথরিটির সাথে উল্লেখ করেছেন।

রাফায়েল এর ১৫০১ সালের ভ্যাটিকানের অ্যাপোস্টলিক প্রাসাদের গায়ে চিত্রিত ফ্রেস্কো দ্য স্কুল অব এথেন্স  ; যাতে দর্শনের মহারথীদের প্রদর্শন করে, তাতে ইবন রুশদ চিত্রিত হয়েছেন। এই চিত্রকর্মে এক সবুজ আলখেল্লা পরিহিত এবং মাথায় পাগড়ি ওয়ালা ইবন রুশদ পিথাগোরাসের কাঁধ বরাবর উঁকি দিচ্ছেন, যেখানে পিথাগোরাসকে এক বই লেখার ভঙ্গিতে দেখানো হয়েছে।

উদ্ভিদের একটি গণ এভেরোয়া(Averrhoa) তার নামে নামকরণ করা হয়েছে, চাঁদের অভিঘাত খাদ ইবন-রুশদ এর নামকরণ তাঁর স্মরণে করা হয়েছে।

মৃত্যুঃ

নির্বাসনে কেটে যায় রুশদের প্রায় চারটি বছর। ১১৯৮ খ্রিষ্টাব্দ। অনুতপ্ত সুলতান রুশদকে ডেকে পাঠালেন, মরক্কো ফিরে যেতে অনুরোধ করলেন। সেই সাথে কথা দিলেন রুশদের কোনো বই আর পুড়ানো হবে না।

ইবনে রুশদ সসম্মানে ফিরে গেলেন মরক্কো যেন হারানো সম্মান তার আপন ঠিকানা খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু নির্বাসনের এই মানসিক যন্ত্রণা তিনি সামলে উঠতে পারেননি। ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যের অবনতি হতে থাকে এবং ১১৯৮ সালের ১০ ডিসেম্বর এই ক্ষণজন্মা মেধাবী, ধর্ম ও দর্শনের সেতুবন্ধনকারী   দার্শনিক ইবনে রুশদ পরলোকগমন করেন।


তথ্য সূত্র—
১. দৈনিক নয়া দিগন্ত ২৯শে জুন ২০২১
২. দর্শনকোষ। সরদার ফজলুল করিম
৩. দেশ রুপান্তর ২৯শে মার্চ ২০১৯
৪. উইকিপিডিয়া


লিখেছেন— Raqib Hussain

মঙ্গলবার, ১২ জুলাই, ২০২২

বীজগণিতের জনক— আল-খাওয়ারিজমি


প্রারম্ভিকাঃ সংখ্যার জগতে ‘শূণ্য’ একটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন। গণিতের প্রাথমিক ১-৯ সংখ্যাসমূহের সাথে “০” (শূণ্য) ব্যবহৃত হয়ে সহজেই বিভিন্ন আকৃতির সংখ্যা গঠিত হতে পারে। গণিতক্ষেত্রে শূণ্যের এই বহুল ব্যবহারের পিছনে যার ভূমিকা অনস্বীকার্য, তিনি হলেন পারসিক মুসলিম বিজ্ঞানী ও গণিতবিদ মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খাওয়ারিজমী। তিনিই প্রথম শূণ্যকে গণিতের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেন। তার অনুসরণেই বর্তমান আধুনিক সংখ্যাবিন্যাস গঠিত।

জন্মঃ
৭৮০ ঈসায়ীর দিকে তিনি তৎকালীন আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের খাওয়ারেজম প্রদেশের আরব সাগরে পতিত আমু দরিয়া নদীর একটি দ্বীপের নিকটে অবস্থিত খিভা শহরে জন্ম গ্রহণ করেন, যেটি  বর্তমানে আধুনিক উজবেকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত। তার জন্মস্থানের নামানুসারে তাকে ‘আল-খাওয়ারিজমী’ নামে ডাকা হত।  খোয়ারিজম নামক শহরে। এই শহরটি প্রাচীন সভ্যতার অন্যতম কেন্দ্র ছিল যার তৎকালীন নাম ছিল উরগেঞ্চ।

তার পুরো নামঃ
আবু আব্দুল্লাহ্ মুহাম্মাদ ইবনে মুসা আল-খাওয়ারিজমি।

ইউরোপে আল-খাওয়ারিজমী ‘আলগোরিজমি’ হিসেবে পরিচিত, যা থেকে পরবর্তীতে ‘আলগরিদম’ শব্দটির উদ্ভব। আলগরিদম কম্পিউটার সফটওয়ারের পরিচালনায় মুখ্য ভূমিকা পালন করে। আলগরিদমের সাহায্যেই কম্পিউটারের বাইনারী গণনা সম্পন্ন্ হয়।

আল-খাওয়ারিজমীর গণিতের মৌলিক গবেষণার উপর ভিত্তি করেই আধুনিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার গবেষণা পরিচালিত হয়েছে।
আবার তার নামের খারিজমি (খোয়ারিজমি) অংশটি থেকেই স্প্যানিশ ‘গুয়ারিজমো’ শব্দটির প্রচলন যার অর্থ ‘ডিজিট’ বা সংখ্যা।

কর্মজীবনঃ
তার শিক্ষাজীবন সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া যায় না। এমনকি তিনি কোথায় জন্মগ্রহণ করেছেন তা ও নির্দিষ্ট করে জানা যায়নি। তার নাম থেকে অনুমান করা হয় যে তিনি সম্ভবত আব্বাসীয় শাসনামলে খোরাসান প্রদেশের খোয়ারিজমী (খিভা) হতে আগমন করেন। (বর্তমানে উজবেকিস্থান এর জরাজম প্রদেশ)।

তবে কর্মজীবনের শুরুতে আল খোয়ারিজমী খলিফা আল মামুনের বায়াতুল হিকমাহ সংলগ্ন গ্রন্থাগারে গ্রন্থাগারিকে চাকুরী করতেন। তিনি বাগদাদে খলিফা আল-মামুন এর গ্রন্থাগারে প্রধান গ্রন্থাগারিক হিসাবে কর্মরত ছিলেন, এবং সেখানে তিনি বিজ্ঞান ও গণিত চর্চা করতেন। এখানে বসেই তিনি গ্রিক ও সংস্কৃত ভাষায় রচিত অনেক বৈজ্ঞানিক রচনা অনুবাদ করেন।

বীজ গণিতে অবদানঃ
বীজগণিত হল ইসলামী সভ্যতায় তার সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান। বীজগণিতকে তিনিই প্রথম গণিতশাস্ত্রের মধ্যে বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন হিসেবে গড়ে তোলেন এবং এর প্রতি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। 
ভারতীয়রাই প্রথম বীজগণিত নিয়ে গবেষণা করে এবং গ্রিকদের মধ্যে কেবল ডায়োফ্যান্টাস ব্যতীত আর কাউকে বীজগণিত নিয়ে খুব একটা চিন্তাভাবনা করতে দেখা যায়নি। ভারতীয়দের গাণিতিক উৎকর্ষের সময়টা অনেক প্রাচীন ছিল। সুতরাং খাওয়ারিজমির সময় বীজগণিতের অবস্থা ছিল ম্রিয়মান। এ সময় তিনি বীজগণিতের ভিত্তি স্থাপন করে আধুনিক গণিতের পথকে অনেকটাই কুসুমাস্তীর্ণ করে তোলেন। এ কারণেই তাঁকে বীজগণিতের ‘জনক’ বলা হয়।

বীজগণিতে তার প্রধান সাফল্য ছিল বর্গের সাহায্যে দ্বিঘাত সমীকরণের সমধান, এর জন্য তিনি জ্যামিতিক প্রমাণ প্রদান করেন।
তাঁর রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ ‘হিসাব আল জাবর ওয়াল মুকাবালাহ’। গ্রন্থটির নামানুসারে ইউরোপীয়রা বীজগণিতের শাস্ত্রকে আল-জেবরা নামকরণ করে। আল খাওয়ারিজমি গ্রন্থটিতে আট শতাধিক উদাহরণ যুক্ত করেন। আবিষ্কার করেন সমীকরণের সমাধান করার ছয়টি নিয়ম। ‘কিতাবুল হিসাব আল আদাদ আল হিন্দি’ তাঁর পাটিগণিতবিষয়ক গ্রন্থ।

তাঁর গণিতশাস্ত্রের মাধ্যমে উমর খৈয়াম, লিওনার্দোসহ আরো অনেকেই প্রভাবিত হয়েছেন।

পাটিগণিতে অবদানঃ
খাওয়ারিজমি পাটিগণিতেও অসামান্য পারদর্শী ছিলেন। আরবরা আবিষ্কার করেন শূন্য (০) সংখ্যা বা অঙ্কটি ।এটা ছিল এক বিস্ময়কর আবিষ্কার।   এই ‘শূন্য ব্যবহারের নীতি নির্ধারণ করেন। তার শূন্য ব্যবহারের নীতি-ব্যাখ্যা শূন্য’ ব্যবহারকেই দ্রুত করে তােলে। এর ফলে গণিত এসে দাঁড়ালে তার পরিপূর্ণ প্রেক্ষিতে।তার মাধ্যমেই ইউরোপ শূণ্যের ব্যবহার শিক্ষা লাভ করে।

শূন্য বোঝাতে  তিনি গোল বৃত্ত ব্যবহার করলেন, যাকে আজ আমরা শূন্য (০) বলে চিনি। তারপর এর নাম দিলেন ‘সিফর’।

ভূগোলে অবদানঃ
তার রচিত সুরত-আল-আরদ (The image of the Earth) । পৃথিবীর বর্ণনা বইটি ৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে লেখেন মুসা আল খারিজমি। গ্রন্থটি বিশ্বের প্রথম মানচিত্র হিসেবে বিবেচিত।

‘জিওগ্রাফী’ নামে পরিচিত এই বইটি টলেমির ‘জিওগ্রাফী’র উপর ভিত্তি করে রচিত। বইটিতে অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশের ভিত্তিতে আবহাওয়া অঞ্চল ভাগ করা হয়েছে। টলেমির কাজের উপর ভিত্তি করে রচনা করলেও খারিজমি টলেমীর ভুলগুলো সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তিনি ভূমধ্যসাগর, আটলান্টিক এবং ভারত মহাসাগর সম্বন্ধীয় টলেমির ভুলগুলো সংশোধন করেন। সুরত আল আর্দের একটি কপি বর্তমানে ফ্রান্সের স্ট্র্যাসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে।

ত্রিকোনোমিতিতে অবদানঃ
আল খোয়ারিজমি রচিত জিজ আল সিন্দ-হিন্দে ত্রিকোণমিতি নিয়ে কম কাজ থাকলেও তা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এই বইয়ে ত্রিকোণমিতিক ফাংশন সাইন এবং কোসাইন-এর অনুপাত নির্ণয় করে এগুলোকে তার অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল টেবিলে সংযুক্ত করেন। গোলকীয় ত্রিকোণমিতি নিয়েও খোয়ারিজমির একটি বই রয়েছে।

আল খোয়ারিজমি রচিত জিজ আল সিন্দ-হিন্দে বা অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল টেবিলস অব সিন্দ অ্যান্ড হিন্দ’-এর স্প্যানিশ অনুবাদও করেন সেই দার্শনিক ভদ্রলোক, অ্যাডিলার্ড অব বাথ। এই অনুবাদের চারটি কপির দুটি ফ্রান্সে, একটি মাদ্রিদে এবং একটি অক্সফোর্ডে সংরক্ষিত আছে।

জ্যোতির্বিদ্যায় তার অবদানঃ
জ্যোতির্বিদ্যায় তার অবদান উল্লেখযোগ্য এবং দিয়ে গেছেন নতুন ধারণা ও প্রজ্ঞার জগতে।তার আরও কাজের মধ্যে ঘড়ি ও সূর্যঘড়ির ক্ষেত্রে তার অবদান অন্তভূক্ত। আল-খাওয়ারিজমী জ্যোতির্বিজ্ঞানের একখানা জিজ বা তালিকা প্রণয়ন করেন। তার এই জিজের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল, এতে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানের ঔপপত্তিক উপক্রমণিকা সংযোগ করেন। এ বিষয়ে এ উপক্রমণিকাই তার প্রগাঢ় পান্ডিত্যের স্বাক্ষর।

এ সম্পর্কিত তার দুই খানা গ্রন্থ রয়েছে। প্রথম গ্রন্থে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক যন্ত্রপাতির নির্মাণ কৌশল আলোচনা করেছেন।

দ্বিতীয় গ্রন্থে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে কিরুপে জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক পাঠ নিতে হয তা সম্পর্কে আলোচনা করেন।জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক লেখাগুলো অনুবাদ করা হয ইউরোপীয় ভাষায় ।পরবর্তীতে এগুলো চীনা ভাষায়ও অনুবাদ করা হয়।

জ্যামিতিতে তার অবদানঃ
তিনি প্রথম বীজগণিতের সমীকরণের জ্যামিতিক সমাধান নির্ণয় করেন। জ্যামিতির ক্ষেত্রে আয়ত,বর্গ,ত্রিভুজ প্রভৃতি জ্যামিতিক ক্ষেত্রগুলোর যে ধারণা দিয়েছিলেন তা হুবহু আজও একই রকম রয়েছে। তিনিই কনিক সেকশনের গাণিতিক ধরণের আধুনিকায়ন করেন।

ইহুদী বর্ষপঞ্জি সম্পাদনাঃ
হিব্রু বর্ষপঞ্জি নিয়ে খোয়ারিজমি 'রিসালা ফি ইসতিখরাজ তারিখ আল ইয়াহুদ (Extraction of the Jewish Era) শিরোনামের একটি বই রচনা করেন। সপ্তাহের কোন দিন মাসের প্রথম দিন হবে বা তিশ্রি’ নির্ণয়ের উপায় বর্ণনা করেনতা ।

এছাড়াও ইহুদি বর্ষ বা ‘অ্যানো মুন্ডি’ এবং ‘অ্যানো গ্রেকোরাম’ বা গ্রীক বর্ষের মধ্যকার বিরামকাল তিনি নির্ণয় করেন। হিব্রু পঞ্জিকা ব্যবহার করে সূর্য ও চাঁদের দ্রাঘিমাংশ নির্ণয় করা নিয়েও এতে আলোচনা আছে।

যেখানে শুধুমাত্র খাওয়ারিজমীঃ
খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে হিন্দু গণিতবিদগণ দশমিক পদ্ধতির উদ্ভাবন করেন। হিন্দুদের উদ্ভাবিত এই দশমিক পদ্ধতি খারিজমিই প্রথম ইসলামী জগতে নিয়ে আসেন। তার রচিত The Book of Addition and Subtraction According to the Hindu Calculation (যোগ-বিয়োগের ভারতীয় পদ্ধতি) তারই উদাহরণ।

আরবি ভাষায় তার রচিত গ্রন্থই সর্বপ্রথম ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়। পাশ্চাত্য সভ্যতায় ল্যাটিন ভাষার মাধ্যমেই তার গবেষণার বিকাশ ঘটে। অ্যালগরিদম উৎপত্তিই এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

তার রচিত পুস্তক কিতাব আল জাবর ওয়াল মুকাবলা হতে বীজগণিতের ইংরাজী নাম আলজেবরা উত্পত্তি লাভ করে।
Algorithm শব্দটি Alkhwarizmi নামের ল্যাটিন অপভ্রংশ algorismi হতে উত্পত্তি লাভ করেছে।

আরও কিছু গ্রন্থাবলীঃ
কিতাব আল-জাম ওয়াল তাফরিক-বিল-হিসাব আল হিন্দ: এই বইটি ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। কিন্ত এই বইটি আরবীতে আর পাওয়া যায় না। কিতাব আল-রুখমাত: এটি সুর্যঘড়ির উপর লিখিত একটি বই। এটি থেকেও আমরা বঞ্চিত।

আল খারিজমির যে সকল কাজের পাণ্ডুলিপি আজ অবধি সংরক্ষিত আছে সেগুলো বাদেও তার আরো বেশ কিছু কাজ রয়েছে বলে ধারণা করেন ঐতিহাসিকগণ। তার মধ্যে ‘কিতাব আল তারিখ’ বা ‘বর্ষপঞ্জির বই’ অন্যতম। দার্শনিক ইবনে আল নাদিমের ‘কিতাব আল ফিরিস্ত’-এর মধ্যে মুসা আল খারিজমির একটি বইয়ের তালিকা দেয়া আছে যাতে ‘কিতাব আল তারিখ’ এর কথা উল্লেখ আছে। অতএব এই পুস্তিকাটি যে খারিজমি লিখেছিলেন সে সম্পর্কে অধিকাংশ ইতিহাসবিদগণই একমত প্রকাশ করেন। তাছাড়াও আরো কিছু বইয়ের কথা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ইতিহাসবিদগণ লিখে গেছেন যেগুলো আল খারিজমির কিনা তা নিয়ে বিতর্ক আছে।

মৃত্যুঃ
খলিফা আল মামুনের মৃত্যুর ১৪ বছর পর (আনুমানিক ৮৫০ খ্রীষ্টাব্দে) আল খোয়ারিজমির মৃত্যু হয়।

তথ্য সূত্র—
১. বাংলাদেশ প্রতিদিন ১৫ই আগস্ট ২০২১
২. বাংলাদেশ প্রতিদিন ১ সেপ্টেম্বর ২০২১
৩. মুসলিম ব্যক্তিত্ব ব্লগপোস্ট
৪. Batoppers blog
৫. উইকিপিডিয়া

লিখেছেন— Raqib Hussain