রবিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২২

হিশাম বিন আব্দুর রহমান আদ দাখিল | Hisam-Bin-Abdur-Rahman-ad-dakil


Hisam-Bin-Abdur-Rahman-ad-dakil

ইতিহাস একটি জাতির কেবল উন্নতি ও উত্তরণের সোপান-ই নয়: ইতিহাস জাতিগত অবখয় হতে নিষ্কৃতির হাতিয়ার ও বটে। কিন্তু আজ আমরা ইতিহাস বিমুখী। জানিনা আমাদের পূর্বপুরুষদের কীর্তিগাঁথা গৌরবময় ইতিহাস। আমরা পড়ি সূর্যসেনের বীরত্বের ইতিহাস ; জানিনা কে তিতুমীর? আমরা মন্ত্রমুগ্ধ চে গুয়েভারা-য়; কিন্তু নাম শুনিনি আবু বকর বিন ওমর লামতুনির। আছে আরো কত শত উদাহরণ।

তাই এবার আলোচনা করবো একজন মহান ব্যক্তির জীবনী নিয়ে। যিনি আজকের দিনে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।

.

চলুন শুরু করা যাক....

.

হিশাম বিন আব্দুর রহমান আদ দাখিল রহ.। ১৩৮ হিজরী (৭৫৫ খৃস্টাব্দ) তে পিতা আব্দুর রহমান আদ দাখিল রহ. এর হাতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া 'স্বাধীন উমাইয়া প্রশাসন'র দ্বিতীয় আমীর। অবশ্য ১৩৮-৩১৬ হি. (৭৫৫-৯২৮খৃস্টাব্দ) ব্যাপ্তিকাল দীর্ঘ শাসনব্যবস্থার শেষ দিক অর্থাৎ ৩০০-৩১৬হি.(৯১৩-৯২৮খৃ.) পর্যন্ত সময়কালকে স্বাধীন উমাইয়া খেলাফতের যুগ বলা হয়। ১৭২ হিজরীর জুমাদাল উলা (৭৮৮ খৃস্টাব্দর অক্টোবরে) কর্ডোভায় পিতার মৃত্যুর সময় তিনি মেরিডায় অবস্থান করছিলেন। বড় ছেলে সুলাইমানের পরিবর্তে স্থালাভিষিক্তের উপযুক্ততায় যোগ্য বিবেচিত ছোট ছেলে হিশাম  পূর্ব ঘোষিত যুবরাজ হিসেবে পিতার মৃত্যুর ছয় দিন পর কর্ডোভায় এসে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আব্দুর রহমান আদ দাখিল রহ. এর এই নির্বাচন যে সঠিক ও দূরদর্শী ছিল তার প্রমাণ হলো: জনগণ হিশামকে ইলম,আমল ও তাক্বওয়ার ক্ষেত্রে মহান খলীফা উমর বিন আব্দুল আযীয রহ. এর সাথে তুলনা করতো।

.

হিশামের দায়িত্ব গ্রহণের সংবাদ প্রাপ্তির পর টলেডোয় অবস্থানরত বড় ভাই সুলাইমান অত্যন্ত ক্রুব্ধ হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসেন। বাধ্য হয়ে হিশাম সসৈন্যে যুদ্ধের জন্য বেরিয়ে যান এবং জাইয়ান নামক স্থানে তুমুল যুদ্ধের পর পরাজিত হয়ে সুলাইমান টলেডোয় ফিরে যায়।

.

হিশামের আরেক ভাই ছিল আব্দুল্লাহ। ভাই হিশাম  থেকে যথেষ্ট সদাচরণ পাওয়ার পরও অকৃতজ্ঞ আব্দুল্লাহ পালিয়ে সুলাইমানের কাছে চলে যায়। এটা জানতে পেরে হিশাম আব্দুল্লাহ কে ফিরিয়ে আনতে দূত পাঠালে দূত তার সাথে সাক্ষাত করতে ব্যর্থ হন। রাস্ট্রের ভবিষ্যত নিরাপত্তার বিবেচনায় বাধ্য হয়ে হিশাম টলেডো আক্রমণ করতে রওনা দেন। সুযোগ বুঝে কোপ মারতে চেয়েছিলেন ভাই সুলাইমান। হিশামের অনুপস্থিতিতে কর্ডোভা দখল করতে চাইলে জনগণ তাকে কঠোর হস্তে দমন করে। কর্ডোভা দখল করতে ব্যর্থ সুলাইমান এবার নিকটবর্তী শহর মেরিডা দখল করতে চাইল। কিন্তু সেখানে ও মেরিডা গভর্নর কর্তৃক বাধার সম্মুখীন হয়। মেরিডা দখল করতে ব্যর্থ হয়ে সে মুরসিয়া যায়। সংবাদ পেয়ে হিশাম তাকে মুরসিয়া থেকে ভ্যালিন্সিয়া পর্যন্ত তাড়া করে। পরিশেষে কোন উপায় না দেখে ব্যর্থ সুলাইমান হিশামের কাছে নিরাপত্তা প্রার্থনা করলে হিশাম তাকে ও পূর্বে নিরাপত্তা দেওয়া আব্দুল্লাহকে উত্তর আফ্রিকায় চলে যাওয়ার সুযোগ দেন।

.

হিশাম বহুবার পার্শ্ববর্তী খ্রিষ্টান রাষ্ট্র গুলোতে অভিযান পরিচালনা করেন। হিশাম বিন আব্দুর রহমান রহ. অত্যন্ত জ্ঞানানুরাগী মানুষ ছিলেন। আলেম সমাজ ও তাদের সাহচর্যকে পছন্দ করতেন। আরবি ভাষার প্রতি গুরুত্ব ও প্রচার প্রসারে তার অনন্য ভূমিকার ফলাফল হলো: তার সময়ে আরবি ভাষার শ্রেষ্ঠত্বের কারণে ইহুদি   খ্রিস্টানদের শিক্ষালয়েও আরবি ভাষা পাঠদান দেওয়া হত।

.

তাঁর সময়ে মৌলিক পরিবর্তন গুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল মালেকী মাযহাবের প্রচলন। এর আগে আন্দালুসে ইমাম আওযায়ী রহ. এর মাযহাবের প্রচলন ছিল। 

তাঁর আমলের বিখ্যাত আলেম দের একজন হলেন সা'সাআ বিন সালামা আশ শামী রহ.। যিনি তাঁর পিতার যুগে এবং তার যুগের প্রথম দিকে আন্দালুসের প্রধান মুফতি ও কর্ডোভা মসজিদের ইমাম ছিলেন। তাঁর যুগে অন্য আরেকজন বিখ্যাত মুহাদ্দিস ছিলেন আব্দুর রহমান বিন মূসা রহ। উভয়েই হিশামের যুগে ইন্তেকাল করেন।

.

হিশাম বিন আব্দুর রহমান আদ দাখিল রহ. এর ৭ বছর ৯ মাস স্থায়ী সফল শাসন ব্যবস্থার পরিসমাপ্তি ঘটে ১৮০ হিজরীর সফর মাসে। (৭৯৬ খৃস্টাব্দ) মৃত্যু কালে তার বয়স ছিল ৩৯ বছর ৪ মাস ৪ দিন। পুত্র হাকাম তার জানাযার নামাযে ইমামতি করেন। রাজপ্রাসাদেই তাঁকে দাফন করা হয়।

.

তথ্য সংগ্রহ: আন্দালুসের ইতিহাস (ডঃ রাগিব সারজানি)

সংক্ষিপ্ত করণ: ইবনে রফিক

সোমবার, ১৮ জুলাই, ২০২২

সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি


তিনি ছিলেন মুসলিম ইতিহাসের বরেণ্য বীরশ্রেষ্ঠদের একজন, যার দৃঢ়তা ছাড়িয়ে যেত গগনচুম্বী পর্বতকেও, সুউচ্চ সমুদ্রের অপ্রতিরোধ্য ঢেউ যার বীরত্বে এসে থমকে যেত, উন্মুক্ত ক্রুসেডে ক্রুসেডারদের আতঙ্ক, রণক্ষেত্রে অদম্য এক সমরনায়ক, তাঁর আগ্নেয়গিরির মত উত্তাপ ছড়ানো তরবারির ঝলকানিতে কেঁপে উঠতো কাফেরদের অন্তরাত্মা।

তার মৃত্যুতে সেদিন সমগ্র মুসলিম বিশ্বের উপর নেমে এসেছিল শোকের মাতম, আকাশ বাতাস সব ভারী হয়ে উঠেছিল।

ঐতিহাসিক আমীর আলী বলেনঃ 

"তাঁর মৃত্যু ইসলাম ও মুসলিম জাহানের জন্য এমন একটি বিপর্যয় যা প্রথম চার খলিফার পর আমরা ভোগ করিনি। প্রাসাদ, সাম্রাজ্য এবং সারা দুনিয়া দুঃখে মুহ্যমান হয়ে যায়; সমগ্র নগরী শোকে নিমজ্জিত হয় এবং ক্রন্দন ও বিলাপ করতে করতে তাঁর লাশের অনুগমন করে।"

ঐতিহাসিক গিবন বলেনঃ

''স্বল্প অথচ যুগসন্ধিক্ষণে মহানুভবতা ও চারিত্রিক  কাঠিন্যের দ্বারা তিনি ইসলামকে রাজনৈতিক  অধঃপতনের হাত থেকে রক্ষা করেন।''

১১৯৩ সালের ৪ মার্চ  ইন্তেকাল  করেন ইসলামের ইতিহাসের মহাবীর, ক্রুসেডারদের কবল থেকে জেরুজালেম পুনরুদ্ধারকারী সুলতান গাজী সালাহউদ্দীন আল আইয়ুবী রাহিমাহুল্লাহ্।

সালাহউদ্দিন আইয়ুবী শুধু বীর যোদ্ধাই ছিলেন না, তিনি দেশপ্রেমিক, ধার্মিক এবং ন্যায়পরায়ণ সুলতান  হিসাবে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। এমনকি  খ্রিস্টান শত্রুরাও তার মহানুভবতার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে। ইংরেজদের লেখায় এর প্রমাণ পাওয়া  যায়। তার মহানুভবতার জন্য পশ্চিমা বিশ্ব তাকে সম্বোধন করে সালাদিন দ্যা গ্রেট তথা মহান সালাদিন নামে।

.....

একসময়কার জৌলুস হারিয়ে নাম আর খলিফা পদবী নিয়ে তখনো নির্জীব প্রাণীর মত বিদ্যমান ছিলো আব্বাসীয় খিলাফত। সকল পরাক্রম হারিয়ে, অভ্যন্তরীণ নানান সংঘাত ষড়যন্ত্রে আক্রান্ত, সিংহাসন নিয়ে চলা গৃহযুদ্ধে বিশৃঙ্খল হয়ে এককালের পরাক্রমশালী সেলজুক সাম্রাজ্য তখন বিভক্ত হয়ে পতনের দ্বারপ্রান্তে।

সময়টা ১০৯৫ সাল, পোপ আরবানের আহ্বানে খ্রিস্টান শক্তি প্রায় ১০ লক্ষ সৈন্যের এক বিশাল ক্রুসেডার বাহিনী প্রস্তুত করে জেরুজালেম অভিমুখে যাত্রা করে। পথিমধ্যে অনেক যুদ্ধ, জয় পরাজয়ের পর অবশিষ্ট বাহিনী অবশেষে ১০৯৯ সালে নামধারী কিছু মুসলিম শাসকের সহায়তায় ক্রুসেডাররা সমগ্র সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের দখল নিয়ে নেয়।

৭ই জুন তারা জেরুজালেমে বাইতুল মোকাদ্দাস অবরোধ করে এবং ১৫ই জুলাই তারা সফলভাবে জেরুজালেমে প্রবেশ করে। পবিত্র ভূমি আল কুদসে ৪৬২ বছরের মুসলিম শাসনের সমাপ্তি ঘটে।

সেদিন(১৫ই জুলাই) ক্রুসেড যোদ্ধারা জেরুজালেমে রক্তের বন্যা বইয়ে দেয়। শহরে কী নারী, কী পুরুষ, কী শিশু, কী বৃদ্ধ -যাকেই পাওয়া গেছে তাকেই হত্যা করা হয়েছে। বহমান রক্তে নাকি সেদিন ঘোড়ার খুর পিছলে যাচ্ছিল। সেদিন প্রায় ৭৫ হাজার মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করা হয় যাদের অধিকাংশই ছিলো মুসলিম। ইউরোপীয়রা প্রতিষ্ঠা করে কিংডম অব জেরুজালেম। সকল মসজিদ বন্ধ করে দেয়া হয়, মুসলিম ও ইহু*দিদের ওপর চলতে থাকে অকথ্য নির্যাতন। যুগের পর যুগ কেটে যায়, কোনো মুসলিম শাসকের জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের সামর্থ্য হয়নি।

ঘটনার সূত্রপাত ১১৮৭ সালের জানুয়ারিতে, জেরুজালেমের ভারপ্রাপ্ত রাজা রেনল্ড পূর্বে সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর সাথে হওয়া শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করে একটি হজ্জ কাফেলা আক্রমণ করে বসে এবং ব্যাপক লুটতরাজ ও নির্যাতন চালিয়ে কাফেলার সবাইকে বন্দী করে জেলে প্রেরণ করে। রেনল্ডের উদ্দেশ্য ছিলো সালাহউদ্দীনকে যুদ্ধে নামানো। 

অবশেষে ১১৮৭ সালে হাত্তিনের যুদ্ধে উভয় বাহিনী পরস্পরের মুখোমুখি হয়। সুলতান সালাহউদ্দীনের মুজাহিদ বাহিনী ক্রুসেডারদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন।

বন্দী দুই সেনাপতিকে সুলতান সালাহউদ্দীনের সামনে আনা হলে তিনি তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করেন এবং বরফ কুচি পান করতে দিয়ে অতঃপর ইসলামের দাওয়াত দেন। কিন্তু রাজা রেনল্ড ঔদ্ধত্য দেখিয়ে রাসূল সাঃ কে গালি দেয়। এতে সালাহউদ্দীন ক্ষুদ্ধ হয়ে সাথে সাথে তার গর্দান উড়িয়ে দেন। এই দৃশ্য দেখে পাশের সেনাপতি ভয় পেয়ে যায় যে তার সাথেও এটা করা হতে পারে। সালাহউদ্দীন তাকে অভয় দিয়ে বলেন, যুদ্ধে বন্দী কোনো সেনাপতিকে হত্যার নিয়ম নেই; কিন্তু সে তার সকল সীমা অতিক্রম করে ফেলেছিল। এরপর সালাহউদ্দীনের বাহিনী জেরুজালেমের দিকে যাত্রা করে।

২০শে সেপ্টেম্বর মুসলিম বাহিনী জেরুজালেম অবরোধ করে এবং শহরের প্রতিরোধ শক্তি ভেঙে দিয়ে ২রা অক্টোবর মুসলিম মুজাহিদ বাহিনী মহা আনন্দে প্রবেশ করে পবিত্র ভূমি আল কুদসে, প্রবেশ করে দীর্ঘ প্রায় ৯০ বছর পর। এই ৯০ বছরে এখানে একটিবারের জন্য আল্লাহু আকবার' ধ্বনি উচ্চারিত হতে দেয়া হয়নি। অর্থাৎ দীর্ঘ ৯০ বছর পর জেরুজালেম আবার পুনরুদ্ধার করেন মুসলিম সেনাপতি, অকুতোভয় সেনানায়ক, সুলতান গাজী সালাউদ্দীন আল আইয়ুবী। ঝড়গতি সম্পন্ন, আপোষহীন, অকুতোভয় সালাহউদ্দীন আইয়ুবী যখন ইসলামের তরবারি হাতে আবির্ভূত হন তখন ক্রুসেডের সাজানো কৌশল বারেবারে কেপে উঠে। চক্রান্তের সকল জাল ছিঁড়ে জেরুজালেম ছিনিয়ে এনে শত বছর পর আবার মুসলমানদের হৃদয়ে প্রশান্তি নিয়ে আসেন গাজী সালাউদ্দীন আইয়ুবী।

বিজয়ের পর মুসলিম বাহিনী শহরে প্রবেশ করে ক্রুসেডারদের মত কোনো হত্যাযজ্ঞ চালায়নি, কেবল যারা যুদ্ধাপরাধ করেছে তাদের বিচার করা হয়। তখনকার অনেক খ্রিস্টান অধিবাসীরা আতঙ্কিত হয়ে উঠে এটা ভেবে যে, তারা যে নৃশংসতা মুসলিমদের ওপর চালিয়েছে মুসলিমরাও হয়ত এমনটা করবে; এটা ভেবে অনেকেই আত্মহত্যা করে, অনেক খ্রিস্টান নারীরা নিজেরাই তাদের চুল কেটে ফেলে।

কিন্তু হযরত ইউসূফ আঃ এর তার ভাইদের প্রতি ক্ষমাসুন্দর সেই উক্তি, মক্কা বিজয়ের পর রাসূল সাঃ এর ক্ষমাসুলভ সেই ঐতিহাসিক ভাষণের প্রতি অনুপ্রাণিত হয়ে, অনুসরণ করে বিজয়ীর বেশে জেরুজালেমে প্রবেশের পর সেখানকার অধিবাসীদের উদ্দেশ্য করে হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাঃ যে উক্তি করেছিলেন, সুলতান সালাহউদ্দীন আল আইয়ুবী যেন তারই পুনরাবৃত্তি করলেন। তিনি শহরের সকল অধিবাসীদের জানমালের নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করলেন, বন্দী খ্রিস্টান নারী ও শিশুদের বিনা মুক্তিপণে মুক্তি দিলেন, বন্দী খ্রিস্টান সৈন্যদের নামমাত্র মুক্তিপণে মুক্তি দিলেন। তিনি কোন খ্রিস্টান বন্দিকে হত্যা করেননি; বরং তাদের মুক্তি দিয়ে ক্ষমার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন যা ইতিহাসে বিরল। এজন্য আজও খ্রিস্টান ঐতিহাসিকরা তাকে সালাদিন দ্যা গ্রেট নামে অভিহিত করে। 

ক্রুসেডাররা কখনো ভাবতেও পারেনি সালাহউদ্দীনের উত্থান ঘটেছে পৃথিবীর ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার জন্য। 

সালাহউদ্দীন আল আইয়ুবীর এই মহাবিজয়ের সংবাদ ছড়িয়ে পৃথিবীর প্রতিটি ইঞ্চিতে, মুসলিম বিশ্বে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। এতে ক্ষুদ্ধ হয়ে পড়ে ইউরোপের সকল খ্রিস্টানরা। 

পোপ ২য় আরবান হার্ট অ্যাটাক করে মারা যায়। এরপর পরবর্তী পোপ আরবানুসের আহ্বানে সকল খ্রিস্টান শক্তি ঐক্যবদ্ধ হয় মুসলিমদের বিরুদ্ধে। 

ইংল্যান্ডের রাজা রিচার্ড, জার্মান সম্রাট ফ্রেডেরিখ ও ফ্রান্সের সম্রাট ফিলিপ অগাস্টাসের নেতৃত্বে ৮ লাখ সৈন্যের(মতান্তরে ৬ লাখ) বিশাল বাহিনী খ্রিস্টানদের পবিত্র স্থান আক্রে'তে মুসলিমদের অবরোধ করে।

১১৮৯ খ্রিস্টাব্দের ১৩ই আগস্ট থেকে ১১৯২ খ্রিস্টাব্দের ৩রা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় তিন বছর মেয়াদী ৮ লাখ সৈন্যের এই বিশাল অবরোধ সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবী মাত্র ২০ হাজার(মতান্তরে ৩০ হাজার) সৈন্য দিয়ে প্রতিরোধ করেন। অবশেষে খ্রিস্টান বাহিনী ১১৯২ খ্রিস্টাব্দের ৯ই অক্টোবর অবরোধ তুলে নিয়ে নিজ নিজ দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। এরপর থেকে শতশত বছর কোন খ্রিস্টান সম্রাট শত চেষ্টা করেও বাইতুল মুকাদ্দাস আর দখল করতে পারেনি।

এই মহাবিজয়ের পর ১১৯৩ সালের ৪ঠা মার্চ সুলতান সালাহউদ্দীন আল আইয়ুবী দামেস্কে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

মহান এই সুলতানের সম্পদের প্রতি কোনো লোভ ছিলো না। জীবদ্দশায় তার ব্যক্তিগত সম্পদের মধ্যে ছিলো ২০ টুকরো স্বর্ণ ও ৪০ টুকরা রৌপ্য যা তিনি গরীব দুস্থূদের মাঝে দান করে যান। পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে তিনি পবিত্র হজ্জ'ও পালন করতে পারেননি। মৃত্যুর পর তার কাছে ১টি দিনার ও ৪৭ দিনার ছাড়া কিছুই পাওয়া যায়নি।

পর্যটক আব্দুল লতিফ বলেনঃ ''সুলতান জ্ঞানীদের সাথে আলোচনায় লিপ্ত থাকতেন প্রায় সময়ই। সৈন্যদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলয়ে কাজ করতেন। জেরুজালেমের চারদিকে পরিখা খননের সময় তিনি নিজের কাঁধে পাথর বয়ে নিয়ে যান।''

বর্তমান ইরাকের টাইগ্রিস বা দজলা ও ইউফ্রেটিস বা ফোরাত নদী দুটির মধ্যবর্তী অঞ্চলে গড়ে উঠা ইরাকের(মেসোপটেমিয়া) তিকরিত শহরে ১১৩৭ সালে জন্ম গ্রহন করেন সালাহউদ্দীন ইউসুফ ইবনে আইয়ুবী। তার ব্যক্তিগত নাম ইউসুফ, সালাহউদ্দিন হল লকব যার অর্থ “বিশ্বাসের ন্যায়পরায়ণ”। তিনি ছিলেন মিশর ও সিরিয়ার প্রথম সুলতান এবং আইয়ুবীয় রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে তার সালতানাতে মিশর, সিরিয়া, মেসোপটেমিয়া(ইরাক), হেজাজ, ইয়েমেন এবং উত্তর আফ্রিকার অন্যান্য অংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল।


ক্রুসেডের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। হাজার বছর ধরে চলছে এ ক্রুসেড। গাজী সালাউদ্দিন আইয়ুবী ক্রুসেডের বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন তা বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েছিল। কেবল সশস্ত্র সংঘাত নয়, কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভাবেও সে যুদ্ধ ছিল সর্বপ্লাবী। ইসলামকে পৃথিবীর বুক থেকে মুছে ফেলার চক্রান্তে মেতে উঠেছিল খ্রিষ্টানরা। একে একে লোমহর্ষক অসংখ্য সংঘাত ও সংঘর্ষে পরাজিত হয়ে বেছে নিয়েছিল ষড়যন্তের পথ। মুসলিম দেশগুলোতে ছড়িয়ে দিয়েছিল গুপ্তচর বাহিনী। ছড়িয়ে দিয়েছিল মদ ও নেশার দ্রব্য। বেহায়াপনা আর চরিত্র হননের স্রোত বইয়ে দিয়েছিল মুসলিম দেশগুলোর সর্বত্র। একদিকে সশস্ত্র লড়াই, অন্যদিকে কুটিল সাংস্কৃতিক হামলা- এ দু’য়ের মোকাবেলায় রুখে দাঁড়াল মুসলিম বীর শ্রেষ্ঠরা। তারা মোকাবেলা করল এমন সব অবিশ্বাস্য শ্বাসরুদ্ধকর ঘটনার, মানুষের কল্পনাকে যা হার মানায়।

সুলতান আইয়ুবী কর্তৃক বাইতুল মুকাদ্দাস নিয়ন্ত্রণে নেয়ার প্রায় ৮০০ বছর পর এবং ইসলামী খিলাফত(উসমানীয় খিলাফত) ধ্বংসের ৪৩ বছর পর মুসলমানরা প্রত্যক্ষ করল এক বেদনাদায়ক ও দুঃখজনক ঘটনা। মুসলিম বিশ্বের পারস্পরিক অনৈক্য ও দুর্বলতার ফলে পবিত্র বাইতুল মুকাদ্দাস আর মসজিদুল আকসা আবার চলে গেল বিধর্মীদের হতে। খ্রিস্টানদের মদদে সেখানে কর্তৃত্ব নিল অভিশপ্ত ইহু*দী জাতি। ৯০০ বছর আগের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটল সেই পবিত্র ভূমিতে। মুসলমানদের রক্তে নতুন করে ভিজতে শুরু করল ফিলিস্তিনের মাটি। যা এখনো বিরাজমান। আজ শুধু সিরিয়া, ফিলিস্তিন নয় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মুসলিম অন্তরাত্মা প্রতিনিয়ত ক্রন্দন করছে একজন সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর জন্য ... 


বই: সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবী

লেখক: ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি

বৃহস্পতিবার, ১৪ জুলাই, ২০২২

সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির পরিচয় ও তাঁর অবদান


সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি ১২৬৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম শিহাবুদ্দিন খিলজি। শিহাবুদ্দিন খিলজি সম্পর্কের দিক দিয়ে জালালুদ্দিন খিলজির বড় ভাই। এদিক দিয়ে সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি সুলতান জালালুদ্দিন খিলজির ভ্রাতুষ্পুত্র। আবার সুলতান জালালুদ্দিন খিলজি তাঁর সাথে নিজ মেয়ের বিয়েও দেন। অর্থাৎ এই দিক বিবেচনায় হিসাব করলে, সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি ছিলেন একই সাথে সুলতান জালালুদ্দিন এর ভ্রাতুষ্পুত্র এবং জামাতা। ১২৯০ সালে সুলতান জালালুদ্দিন খিলজি তাকে আমীর-ই-তুযুক পদে নিয়োগ দেন। এর এক বছর পরই অর্থাৎ ১২৯১ সালে তিনি সুলতান গিয়াসুদ্দিন বলবনের এক ভ্রাতুষ্পুত্রের বিদ্রোহ দমন করে সফলতা লাভ করলে জালালুদ্দিন খিলজি তাকে “আলা-উদ-দ্বীন” উপাধি দান করেন। এরপরই তিনি কারার গভর্নরের দায়িত্ব পান।

বিজেতা হিসেবে আলাউদ্দিন খিলজিঃ

আলাউদ্দিন খিলজি ছোটবেলা থেকেই একজন দুর্ধর্ষ যোদ্ধা ছিলেন। তরবারি ও অশ্ব, দুটো চালানোর ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সমান দক্ষ। একাধারে তিনি ছিলেন একজন দক্ষ প্রশাসক, চৌকস জেনারেল আর দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। মৌর্য সম্রাট অশোকের পর তাকেই একমাত্র সম্রাট হিসেবে বিবেচিত করা হয়, যিনি গোটা হিন্দুস্তানকে এক সুতোয় গাঁথতে পেরেছিলেন। তিনি এত বেশি পরিমাণ শহর আর নগর জয় করেছিলেন যে, তাকে সিকান্দার সানি বা দ্বিতীয় আলেক্সান্ডার উপাধিও দেয়া হয়েছিলো।

হিন্দুস্তানের ইতিহাসে বিজেতাদের তালিকা করতে গেলে নিঃসন্দেহে তাঁর নাম উপরের দিকেই থাকবে। একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী বিজেতা হিসেবে তিনি ১২৯৬ সালে ইলখানী রাজ্যের শিয়া শাসক গাজান মাহমুদকে পরাজিত করে সিন্ধ দখল করেন। ১২৯৯ সালে চাগতাই খান দুয়া খানকে পরাজিত করে পাঞ্জাব নিজের দখলে নেন। ১৩০১ সালে রণথম্বোর, ১৩০৩ সালে চিতোর, ১৩০৫ সালে মান্দু সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির পদানত হয়। রাজা রায় রামচন্দ্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মালিক কাফুর। তবে পরবর্তীতে রাজা রায়চন্দ্রকে “রায় রায়হান” খেতাব দিয়ে পুনরায় তাকে রাজ্য চালনার অনুমতি দেয়া হয়েছিলো। একই সাথে গুজরাটও তাকে দেয়া হয়েছিলো। ১৩০৯ সালে রাজা রায় রামচন্দ্রের সহায়তায় মালিক কাফুরের নেতৃত্বে বারাঙ্গল জয় করা হয়।

সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি সচরাচর যুদ্ধাভিযানে রাজধানী থেকে খুব বেশি দূরে যেতেন না। তবে মেবার আর রণথম্বোর অভিযানে তিনি নিজে বাহিনীর সাথে ছিলেন। রণথম্বোর অভিযান তাঁর কাছে আলাদা গুরুত্ব পায়, কারণ পূর্ববর্তী সুলতান জালালউদ্দিন খিলজির সময় রণথম্বোরের বিরুদ্ধে দুইটি অভিযান ব্যর্থ হয়। ১২৯৮ সালে তিনি নুসরাত খানের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী পাঠালে যুদ্ধে নুসরাত খান নিহত হন। এর ফলে সুলতান নিজেই এগিয়ে যান। ১২৯৯ সালে অবরোধের পর ১৩০১ সালে রণথম্বোর বিজিত হয়। ১২৯৯ সালে উলুগ খানের নেতৃত্বে মেবারে অভিযান প্রেরণ করলে রাণা সমর সিংহ বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পণ করে সন্ধি করেন। কিন্তু সমর সিংহের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র রতন সিংহ বিদ্রোহ করলে দিল্লি থেকে একটি অভিযান পাঠান হয়। কিন্তু অভিযানটি ব্যর্থ হলে সুলতান ১৩০২ সালে আবারো রাজধানী থেকে বের হয়ে আসেন। প্রায় ৮ মাসের অবরোধের পর চিতোরের পতন ঘটে।

বর্বর মোঙ্গলদের হাত থেকে হিন্দুস্থানকে রক্ষাঃ

হিন্দুস্তানের সামরিক ইতিহাসের বর্ণনা করতে গেলে অবধারিতভাবেই বর্বর মঙ্গোলদের কথা চলে আসে। বিভিন্ন সময়ে তাঁরা লুটপাটের উদ্দেশ্যে হিন্দুস্তানে অভিযান চালায়। শুধুমাত্র ১২৯৬-১৩০৮ সালের মাঝেই এই বর্বর মঙ্গোলরা মোট ১৬ বার হিন্দুস্তানে অভিযান পরিচালনা করে। কিন্তু প্রতিবারই তারা হিন্দুস্তানের সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির হাতে পরাজিত হয়ে ফেরত যায়। হিন্দুস্তানের প্রতি আলাউদ্দিন খিলজির অন্যতম একটি অবদান হচ্ছে তিনি মঙ্গোল আক্রমণের হুমকি থেকে হিন্দুস্তানকে চিরতরে রক্ষা করেছিলেন।

১২৯৭ সালে জলন্ধরে সুলতানের বাহিনীর মুখোমুখি হয় একটি মঙ্গোল বাহিনী। সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির সেনাপতি জাফর খান তাদের শোচনীয় ভাবে পরাজিত করেন। মঙ্গোলরা এই পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে পুনরায় হামলা চালিয়ে দিল্লির শিরি দূর্গটি দখল করে নেয়। জাফর খান তাদের পরাজিত করে শিরি দূর্গ পুনরুদ্ধার করেন। সেই সাথে ২ হাজার মঙ্গোল যোদ্ধাকে বন্দী করে নিয়ে আসা হয়।

১২৯৯ সালে মঙ্গোলরা পুনরায় দুয়া খানের পুত্র কুতলুগ খাজার নেতৃত্বে প্রায় ২ লাখ সৈন্য নিয়ে হিন্দুস্তানে অভিযান চালায়। তারা আবারো শিরি দূর্গটি দখল করে নেয়। শিরি দূর্গের দখল নিয়ে তারা দিল্লির দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। মঙ্গোলদের আক্রমণের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা আক্রমণের সময় লুটপাট করতে করতে আসে। কিন্তু আলাউদ্দিন খিলজি লক্ষ্য করলেন এবার আর তারা লুটপাট না করে সরাসরি দিল্লির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তাঁর মানে এবার চূড়ান্ত একটি লড়াই হতে যাচ্ছে। কারণ আক্রমণের লক্ষ্য এবার খোদ দিল্লিই। জাফর খানকে প্রধান সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ দিয়ে আলাউদ্দিন খিলজি মঙ্গোলদের বাঁধা দিতে এগিয়ে আসেন। দুর্ধর্ষ জাফর খানের হাতে মঙ্গোলরা আরো একবার পরাজয়ের স্বাদ গ্রহণ করে পিছু হটতে থাকে। তবে এই যুদ্ধে সেনাপতি জাফর খান নিহত হন।

সুলতান যখন চিতোর দূর্গ অবরোধে ব্যস্ত ছিলেন, মঙ্গোলরা আরেকবার হিন্দুস্তানে আক্রমণ চালায়। তবে এবার মঙ্গোল সেনাবাহিনীর আকার তুলনামূলকভাবে অনেক ছোট ছিলো। তবে এ আক্রমণের ফলে সুলতান বেশ বিপর্যয়ে পড়ে গিয়েছিলেন। তাই এরপর তিনি সীমান্তবর্তী অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য আরো বেশ কয়েকটি দূর্গ নির্মাণ করেন। উন্নত অস্ত্র সরবরাহ করে সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন করেন। তবে এরপরও আলী বেগ ও তারতাক খানের নেতৃত্বে আবারো মঙ্গোলরা আক্রমণ চালিয়ে পাঞ্জাব দখলে নিয়ে নেয়। অনেকটা প্রথানুযায়ীই তাদের আবারো পরাজিত করে দিল্লির সেনাবাহিনী পাঞ্জাবের দখল নিয়ে নেয়। অন্যদিকে ১৩০৬ সালে কাবাক খান আর ১৩০৮ সালে ইকবালের নেতৃত্বে মঙ্গোলরা পুনরায় আক্রমণ চালালে মঙ্গোলদের পুরো সেনাবাহিনীই ধ্বংস করে দেয়া হয়।

১৩০৬ সাল থেকে দিল্লি সেনাবাহিনী একটি বিশেষ কৌশল অবলম্বন করতে থাকে। এসময় থেকে চেষ্টা করা হতো যুদ্ধক্ষেত্র থেকে একজন মঙ্গোল সেনাও যেন জীবন নিয়ে পালিয়ে যেতে না পারে। কারণ এই পলাতক যোদ্ধারাই আবার পরবর্তী অভিযানগুলোতে অংশগ্রহণ করতো। আর যুদ্ধে যারা বন্দী হতো, তাদের সোজা হাতির পায়ের নিচে ফেলে পিষ্ট করা হতো। সুলতান মঙ্গোলদের এত কঠোরভাবে দমন করেন যে, এ ১৬টি যুদ্ধে প্রায় ৩ লাখ মঙ্গোল সেনা তাঁর হাতে নিহত হয়। ১৩০৮ সালের পর মঙ্গোলরা ভুলেও আর হিন্দুস্তানের দিকে তাদের বিষাক্ত দৃষ্টিতে তাকাতে সাহস করে নি। তাঁরা হিন্দুস্তানের সুলতান আলাউদ্দিন খিলজিকে এতটাই ভয় পেত যে, তারিক-ই-ফিরোজশাহীর বর্ণনানুযায়ী, সুলতানের সেনাপতি মালিক গাজী প্রতি শীতকালে মঙ্গোল সীমান্তে গিয়ে তাদের যুদ্ধের জন্য আহবান করতেন। কিন্তু মঙ্গোলরা কখনোই আর হিন্দুস্তান অভিমুখে এগিয়ে আসার ধৃষ্টতা দেখায় নি।

সামরিক সক্ষমতায় অনন্যঃ

হিন্দুস্তানের ইতিহাসে সুলতান অন্য আরেকটি দিক দিয়েও অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। আর তা হলো সুলতানের ব্যাপক সামরিক সক্ষমতা। তারিক-ই-ফিরোজ শাহীর তথ্যনুযায়ী, সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির অধীনে ৭০ হাজার রিজার্ভ অশ্বসহ প্রায় সাড়ে ৫ লাখ অশ্বারোহী, ৯ লাখ পদাতিক সৈন্য, ৭০ হাজার রণহস্তীর বিশাল এক সেনাবাহিনী ছিলো, যা হিন্দুস্তানের ইতিহাসে অন্য আর যে কোনো শাসকের চেয়ে অনেক বেশিই। তবে তাঁর বিজয়ের পেছনে সেনাবাহিনীর এই বিশাল আকার মুখ্য ছিল না, বরং দক্ষতাই তাঁর বিজয়ের কারণ ছিলো। জিয়াউদ্দিন বারানীর তথ্যসূত্র থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি মাত্র ৬০০০ সৈন্য নিয়ে মালব, যাদব, গন্ডয়ানা আর বেরার জয় করে ফেলেন। অথচ যাদব রাজ্য ছিলো বিশাল এক ভূখন্ড জুড়ে বিস্তৃত।

সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির অবদানঃ

১) গোটা সাম্রাজ্যে সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি মদপান নিষিদ্ধ করেন। এমনকি মদ উৎপাদনেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। তাঁর সময়ে হিন্দুস্তানে ব্যভিচার আর বিকৃত যৌনাচার সমকামিতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

২) হিন্দুস্তানের ইতিহাসে সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির পূর্বে সেনাবাহিনীর সদস্যরা নির্দিষ্ট কোন বেতন পেতেন না। বরং তাদের জমির জায়গীর দান করা হতো। তিনি এই জায়গীর ব্যবস্থার পরিবর্তন করে সেনাবাহিনীর সদস্যদের নির্দিষ্ট বেতন দেয়ার রীতি শুরু করেন। তাঁর সময়ে একজন অশ্বারোহী সৈন্যের বেতন ছিলো প্রায় ২৩৮ তঙ্কা।

৩) সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির সময়ে সাম্রাজ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ছিল দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা। এ ব্যবস্থায় নিত্য ব্যবহার্য প্রতিটি পণ্যের মূল্যই রাষ্ট্র থেকে নির্ধারণ করে দেয়া হতো। শুধু নির্ধারণ করে দিয়েই তিনি তাঁর দায়িত্ব থেকে হাত গুটিয়ে নিলেন না। বরং তাঁর নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে মানা হচ্ছে কিনা, তা পর্যবেক্ষণ করে গুপ্তচররা নিয়মিত সুলতানকে রিপোর্ট করতো। তাছাড়াও প্রশাসনের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে যে ঘুষের রীতি প্রচলিত ছিল, তা সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি কঠোর হস্তে নির্মূল করেন।

৪) আমির-ওমরাহ ও বিত্তবানদের মধ্যে প্রচলিত দূর্নীতির তিনি মূলোৎপাটন করেছিলেন। সুদৃঢ় ও কঠোর ব্যবস্থা দ্বারা তিনি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে এনেছিলেন। তার শাসনব্যবস্থা জনকল্যাণমূলক ছিল।

৫) ভূমি জরিপ ব্যবস্থা ভারতবর্ষে মুসলিম শাসক হিসেবে তিনিই সর্বপ্রথম প্রবর্তন করেন। রাষ্ট্রের কাজের জন্য অশ্বকে চিহ্নিত করার প্রথা প্রবর্তন করে তিনি সামরিক বাহিনীতে প্রচলিত দুর্নীতি দমন করেন।

সুলতানের প্রতি মিথ্যা অপবাদঃ

সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির বিরুদ্ধে কাফির মুশরিকরা দুটি গুরুতর মিথ্যা অভিযোগ তৈরি করেছে। তাঁর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় যে অভিযোগ তৈরি করা হয়েছে তা হচ্ছে তিনি নাকি একজন সমকামী ছিলেন, নাউজুবিল্লাহ। এ অভিযোগের কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। তাছাড়া সমগ্র হিন্দুস্তানে যিনি সমকামীতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন, তিনি নিজে কীভাবে সমকামী হন? প্রকৃতপক্ষে ইউরোপিয়ান সূত্রগুলো তাকে সমকামী হিসেবে উল্লেখ করে। তার কারণও আছে। সুলতানের জীবনে তাঁর সেনাপতি মালিক কাফুরের বেশ ভালো প্রভাব ছিল। এ থেকে ইউরোপিয়ান সূত্রগুলো ধারণা করে যে, সুলতান সমকামী ছিলেন। কারণ ইউরোপের অনেক সম্রাটই সমকামী ছিল, আর যারা তাদের সম্রাটদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বজায় রাখতো তাদের ভেতর কেউ না কেউ উক্ত সম্রাটের সঙ্গী হতো। এ থেকে ইউরোপীয় ঐতিহাসিকগণ তাকে সমকামী হিসেবে চিহ্নিত করে, যা আসলে একটি জঘন্য মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়।

দ্বিতীয় অভিযোগ হলো, সুলতান আলাউদ্দিনের সাথে চিতোরের রাণী পদ্মাবতীকে সম্পৃক্ত করে যে গল্পটি প্রচলিত আছে সেটি। এর ঐতিহাসিক সত্যতা নির্ণয় করা যায় নি। মূলত ১৫৪০ সালে মালিক মুহাম্মাদ জায়সী নামের এক কবির লেখা কবিতা “পদুমাবৎ” এ উক্ত গল্পটির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। এরও এক শতাব্দী পর আরাকান রাজ-দরবারের সভাসদ কবি আলাওল এই পদুমাবৎ এর অনুবাদ করেন। সুতরাং আলাউদ্দীন খিলজি আর রাণী পদ্মাবতীর সম্পর্কটি নিছক একটি কাল্পনিক গল্প ছাড়া আর কিছুই নয়।

সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি হিন্দুস্তানের উত্তর আর দক্ষিণ ভূখন্ড মিলিয়ে বিস্তৃত এক সাম্রাজ্যের অধিপতি ছিলেন। হিন্দুস্তান শাসনে তাঁর সফলতা এতই বেশি যে, যদি তাকে দিল্লি সালতানাতের শ্রেষ্ঠ শাসক হিসেবে অভিহিত করা হয়, তবে তা মোটেই বেশি বলা হবে না। প্রায় ২০ বছর হিন্দুস্তান শাসনের পর ১৩১৬ সালের ৪ জানুয়ারী তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথে হিন্দুস্তান যেন তার আরেকটি নক্ষত্র হারালো।

তথ্যসূত্র—
১. তারিখ-ই-ফিরোজশাহী (জিয়াউদ্দিন বারানী)
২. তারিখ-ই-আলাই (আমির খসরূ)
৩. A Comprehensive History of India: The Delhi Sultanat (A.D. 1206–1526), ed. by Mohammad Habib and Khaliq Ahmad Nizami
৪. ইতিহাসের ইতিহাসঃ গোলাম আহমেদ মোর্তজা
৫. মোগল সাম্রাজ্যের সোনালী অধ্যায়ঃ সাহাদত হোসেন খান
৬. ভারতবর্ষের ইতিহাসঃ কোকা আন্তোনোভা, গ্রিগোরি বোনগার্দ-লেভিন, গ্রিগোরি কতোভস্কি
৭. বিশ্ব সভ্যতাঃ এ. কে. এম. শাহনাওয়াজ

লিখেছেন— ওমর বিন খাত্তাব

বুধবার, ১৩ জুলাই, ২০২২

মুসা বিন নুসাইর আফ্রিকার গর্ভনয় ও স্পেন বিজয়ের বিশ্বখ্যাত মুসলিম বীর সেনাপতি।


মুসা বিন নুসাইর ৬৪০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা নুসাইর আমীর মুয়াবিয়ার প্রহরীদলের প্রধান ছিলেন। প্রশাসন হিসেবে মুসার মেধা ও সাহসিকতার কারণে তিনি সুপরিচিত ছিলেন। খলিফা আবদুল মালিক তাকে বসরার রাজস্ব আদায়কারী নিয়ােগ করেন। পরবর্তীতে তাকে আফ্রিকার গভর্নর হিসেবে নিয়ােগ করা হয়। তার শাসনাধীনে মিশর থেকে আটলান্টিকের তীর পর্যন্ত বিশাল ভূখণ্ড ছিল। কঠোর হস্তে তিনি তার এলাকা শাসন করতেন এবং অনেক সংস্কার কর্মসূচি চালু করেছিলেন। বার্বার উপজাতি নতুন গভর্নরের প্রশাসনিক দক্ষতা ও সামরিক যােগ্যতায় সন্তুষ্ট হয়ে তাকে গ্রহণ করল আপনজন হিসেবে। এরপর মুসা বিন নুসাইর সফল নেতা হিসেবে অভিযান পরিচালনা করতে শুরু করেন। তার নেতৃত্বেই আফ্রিকায় আরব শক্তি সংহত হয় এবং আরবরা উত্তর আফ্রিকা ও স্পেন অধিকার করতে সক্ষম হয়।


মুসা বিন নুসাইর ও তার পুত্ররা একের পর এক সাহসী অভিযান চালিয়ে আফ্রিকার দুর্ধর্ষ উপজাতিগুলাের প্রতিরােধ ভেঙ্গে ফেলেন; গ্রীক ষড়যন্ত্রকারীদের আফ্রিকা হতে বিতাড়িত করেন এবং সমগ্র এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। তার বিজ্ঞ প্রশাসন ও আপােসের মনােভাব বেপরােয়া বার্বারদেরকেও আপন করে তােলেন এবং তিনি তাদের আস্থাভাজন হন। মুসা বিন নুসাইর সরাসরি খলিফার অধীনে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন। বিজিত জাতিগােষ্ঠীর প্রতি শাসকের সহনশীল আচরণ, সাম্য, ন্যায়বিচার, ভ্রাতৃত্ব প্রদর্শনের মাধ্যমে মুসা বিন নুসাইর তাদের হৃদয় জয় করেন। অল্প সময়ের মধ্যে গােটা বার্বার জাতি ইসলাম গ্রহণ করে। পরবর্তী বছরগুলােতে তারা। ইসলামের দুর্ধর্ষ শক্তিতে পরিণত হয় এবং ইসলামের পতাকাকে ফ্রান্সের কেন্দ্র পর্যন্ত বহন করে নিয়ে যায়।

উত্তর আফ্রিকার দেশগুলাে ভূমধ্যসাগরে অবস্থানরত বাইজান্টাইন নৌবাহিনী কর্তৃক নানাভাবে উৎপীড়িত হত। মুসা বিন নুসাইর এই ঝামেলা হতে নিজের শাসনাধীন এলাকাকে নিরাপদ রাখার উদ্দেশ্যে একটি অভিযান পরিচালনা করে কৌশলগত ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপ মাজেরকা, মিনােরকা ও ইন্ডিকা দখল করেন। ইসলামী শাসনাধীনে আসার পর দ্বীপগুলােতে দ্রুত সমৃদ্ধি সাধিত হতে থাকে। উপমহাদেশের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ সৈয়দ আমীর আলীর মতে, “ব্যাপকতার দিক থেকে মুসা বিন নুসাইর এর শাসনের আওতা হাজ্জাজ বিন ইউসুফের প্রায় সমান। কিন্তু প্রশাসনিক যােগ্যতা ও সামরিক নেতৃত্বের দিক থেকে তার গুরুত্ব আরাে অধিক।

মুসা বিন নুসাইর আফ্রিকা থেকে রােমানদের চিরদিনের জন্য বিদায় করেছিলেন এবং মুসলিম বিজয়কে আটলান্টিকের তীর পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলেন। এভাবে মুসলমানদের ইউরােপ অভিযানের পটভূমি তৈরি করেছিলেন তিনি। ৭১০ সালে তিনি স্পেন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য তার সুযােগ্য সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করে পরবর্তী বছরই মাত্র সাত হাজার সৈন্যসহ তারিককে স্পেন অভিযানে পাঠানাে হয়। রাজা রডারিকের বিশাল বাহিনী ও তারিকের ক্ষুদ্র বাহিনীর মধ্যে বারবেট নদীর মােহনায় চূড়ান্ত সংঘর্ষ ঘটে। রডারিকের নেতৃত্বে খ্রিস্টান বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল লক্ষাধিক। তারিকের বাহিনী খ্রিস্টান বাহিনীর বিপুল ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে। এই যুদ্ধের পর বিজয় সম্পর্কে সুনিশ্চিত হয়ে তারিক স্পেনের অন্যান্য এলাকা দখল করার জন্য অভিযানে নেমে পড়েন। এজন্য তাকে খুব সামান্য প্রতিরােধের সম্মুখীন হতে হয়। কারণ খ্রিস্টান বাহিনীর মনােবল ভেঙ্গে পড়েছিল।

এক বছর পর মুসা বিন নুসাইর স্বয়ং স্পেনে উপস্থিত হন। তার সাথে ছিল ১০ হাজার অমিতবিক্ৰম সৈন্য। তিনি ভিন্ন পথে ঝড়ের গতিতে অভিযান চালিয়ে মেরিডা, সিডােনিয়া ও সেভিল দখল করেন। টলেডােতে মুসা বিন নুসাইর তার সুযােগ্য সেনাপতি তারিকের সাথে মিলিত হন এবং দুই বিজেতার সম্মিলিত আক্রমণের মুখে খ্রিস্টান বাহিনী পশ্চাদপসরণ করতে করতে পিরেনিজ পর্বতের দিকে চলে যায়। দুই বছরের কম সময়ের মধ্যে সমগ্র স্পেন মুসলিম শাসনাধীনে চলে আসে। কয়েক বছর পর মুসলিম বাহিনী পর্তুগাল দখল করে এবং পর্তুগালের নামকরণ করা হয় আল গারব (পশ্চিম)।

তারিকের বাহিনীকে স্পেনে রেখে মুসা বিন নুসাইর ফ্রান্সের দিকে অগ্রসর হন এবং দক্ষিণ ফ্রান্সের একটি অঞ্চল করায়ত্ত করেন। পিরেনিজ পর্বতে দাড়িয়ে মুসা বিন নুসাইর সমগ্র ইউরােপ বিজয়ের কথা ভেবেছিলেন। ইতিহাসবিদ সৈয়দ আমীর আলীর মতে, “তাকে যদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অনুমতি দেয়া হতো তাহলে তিনি অবশ্যই সফল হতেন। পাশ্চাত্য সম্পূর্ণরূপে তার পদানত হত। কিন্তু দামেস্কের দরবারে সতর্কতামূলক ও দ্বিধান্বিত নীতি গ্রহণের ফলে মুসলমানদের এই সুবর্ণ সুযােগ হারিয়ে যায়।

মুসা বিন নুসাইর যখন পিরেনিজ পর্বতে মুসলমানদের উপর চোরাগােপ্তা আক্রমণকারী কিছু খ্রিস্টান দল কর্তৃক বিঘ্ন সৃষ্টির আশঙ্কা চিরতরে নির্মূল করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন, তখন খলিফা তাকে ও তারিককে দামেস্কে তলব করলেন। মুসা বিন নুসাইর খলিফার আদেশ অগ্রাহ্য না করে বিজয়ীর বেশে আফ্রিকায় ফিরে আসেন। কিন্তু নতুন উমাইয়া খলিফা সােলাইমান তাকে যথাযথ মর্যাদা সহকারে গ্রহণ করেন নি। মুসা বিন নুসাইর অবসর জীবন কাটিয়ে ৭১৬ অথবা ৭১৭ সালে সিরিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন। " স্পেন ত্যাগের পূর্বে মুসা বিন নুসাইর দেশটির শাসন পরিচালনার জন্য প্রয়ােজনীয় ব্যবস্থাদি সম্পন্ন করেছিলেন। সেভিলে মুসলিম শাসনের কেন্দ্র স্থাপন করে তার এক পুত্রকে স্পেনের গভর্নর নিয়ােগ করেন। আরেক পুত্র আবদুল্লাহকে আফ্রিকা শাসনের দায়িত্বে ন্যস্ত করেছিলেন। উভয় পুত্র বিরাট যােদ্ধা ও প্রশাসক ছিলেন।

মুসলিম বিজেতারা যে শৃঙ্খলা প্রদর্শন করে গেছেন তা বিশ্বের সামরিক বিজয়ের ক্ষেত্রে নজীরবিহীন।

যখন সমগ্র ইউরােপ মুসা বিন নুসাইরের পদতলে এবং তিনি বিজয়সূচক অভিযানের জন্য প্রস্তুত ঠিক সেই মুহূর্তে দামেস্ক হতে খলিফার নির্দেশ আসায় তিনি অভিযান ত্যাগ করে খলিফার নির্দেশকেই শিরােধার্য বিবেচনা করে দামেস্কে রওয়ানা হওয়ার মাধ্যমে এই শৃঙ্খলার নজীর স্থাপন করে গেছেন।

মুসা বিন নুসাইর ছিলেন একজন সেরা যােদ্ধা, যােগ্য সেনাপতি এবং বিজ্ঞ প্রশাসক; সর্বোপরি তিনি ছিলেন কঠোর নিয়মশৃঙ্খলার হাতে বন্দী। এ ধরনের সুযােগ্য ব্যক্তির মাধ্যমেই ইসলাম তার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে এবং অল্প সময়ের মধ্যে বিশ্বের সুবিস্তৃত ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

ভাকেইসর্ডোভাই হিল্লোকেন্দ্রে পাকও ছাড়িয়ে মুসা বিন নুসাইর এবং তারিক বিন জিয়াদ স্পেনে ইসলামী রাষ্ট্রের যে ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেখানে দিনে দিনে মুসলিম সভ্যতার চরম বিকাশ ঘটে। মুসলিম শাসনামলে কর্ডোভাকে ইসলামী ঐতিহ্যে এত সমৃদ্ধ করে গড়ে তােলা হয়েছিল যে, সমগ্র ইউরােপে স্পেনের রাজধানী কর্ডোভাই ছিল সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী ও জাকজমকপূর্ণ নগরী। কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয় ইউরােপের সেরা শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয় এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতি মিশরের আল আযহার ও বাগদাদের নিজামিয়াকেও ছাড়িয়ে যায়।

ইসলামের সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে স্পেনীয় ইতিহাসের ইসলামী যুগকে স্বর্ণযুগ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে এবং সেজন্য যদি কাউকে কৃতিত্ব দিতে হয় তাহলে তা অবশ্যই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন শাসক মুসা বিন নুসাইরের ।

জিব্রাল্টার প্রণালী এটি মুসা বিন নুসাইরের নামে নামকরণ করা হয়েছে।

সোমবার, ১১ জুলাই, ২০২২

হাজিব আল মানসুর— যে সেনাপতি পরাজিত হননি একটি যুদ্ধেও

একজন শাসক। একজন যোদ্ধা। একজন সেনাপতি। জীবনে তিনি ৫৪টি জিহাদে অংশগ্রহণ করেছেন কিন্তু কখনোই পরাজিত হননি। তাঁর পতাকা কখনো ভূলুণ্ঠিত হয়নি। জয়-পরাজয়ের পরিসংখ্যানে তিনি ইতিহাসের অনেক বিখ্যাত সেনাপতির চেয়ে এগিয়ে থাকবেন। যুদ্ধের ময়দানে তিনি সাথে রাখতেন নিজ হাতে লেখা কুরআনুল কারিম। যখনই সময় পেতেন কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত করতেন। তাঁর ভয়ে ইউরোপ ছিল তটস্থ। তাঁর মৃত্যুতে তারা ফিরে পেয়েছিল স্বস্তি। তাঁর মৃত্যুও হয়েছিল জিহাদের ময়দানে।


তিনি মুহাম্মদ ইবনু আবদিল্লাহ ইবনু আবি আমের। ইতিহাস তাঁকে চেনে হাজিব আল মানসুর নামে।

হাজিব আল মানসুরের জন্ম দক্ষিণ আন্দালুসের জাজিরাতুল খাদরায়। সময়টা ছিল ৩২৬ হিজরি। খ্রিষ্টীয় হিসেবে ৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দ। এই গ্রামটি ছিল কুরতুবার কাছেই। এই গ্রামের পথ ধরেই মুসলমানরা প্রবেশ করেছিলেন আন্দালুসে। এই পথ অতিক্রম করেছিলেন তারিক বিন যিয়াদ, মুসা বিন নুসাইর ও আবদুর রহমান আদ-দাখিলের মতো বরেণ্য সেনানায়করা। এখানেই বেড়ে ওঠেন হাজিব আল মানসুর।

বাল্যকালেই তাঁর শিক্ষাদীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। তিনি হাদিস শাস্ত্রে দক্ষ হয়ে ওঠেন। এ ছাড়া তাঁর আগ্রহ ছিল সাহিত্যচর্চায়। পরে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য কুরতুবায় গমন করেন। সেখানে পড়াশোনা সেরে কাজি মুহাম্মদ বিন ইসহাক বিন সালিমের সহকারীর পদে কাজ শুরু করেন। এখানে তিনি তাঁর মেধা ও যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে অনেকের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হন।

ইতিমধ্যে আন্দালুসের খলিফা হাকাম আল মুস্তানসিরের সন্তান আবদুর রহমানের জন্ম হয়। খলিফা তাঁর পুত্রের দেখাশোনা ও পড়াশোনার জন্য একজন উপযুক্ত লোক সন্ধান করছিলেন। এ দায়িত্বে নিযুক্ত করা হয় ইবনু আবি আমেরকে। সে সময় তাঁর বয়স মাত্র ৩০ বছর। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি খলীফার দরবারে অবস্থান মজবুত করে ফেলেন। এক পর্যায়ে তাঁকে টাকশালের পরিচালক নিয়োগ দেয়া হয়। এরপর সেভিলের কাজির পদ দেয়া হয়।

কিছুদিন তিনি উপকূলীয় অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বেও ছিলেন। পরে খলিফা তাঁকে উত্তর আফ্রিকার প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেন। তবে ইন্তেকালের কিছুদিন পূর্বে খলিফা তাঁকে আন্দালুসে নিজের কাছে নিয়ে আসেন। ৩৬৬ হিজরিতে খলিফা হাকাম আল মুস্তানসির ইন্তেকাল করেন। এরপর কিছু রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে ইবনু আবি আমের ক্ষমতার মসনদে আসীন হন। (১)

ইবনু আবি আমের তাঁর শাসনের শুরুতেই বড় ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হন। সে সময় আন্দালুসের উত্তর সীমান্তে খ্রিষ্টানরা একের পর এক হামলা চালাচ্ছিল। ৩৬৬ হিজরির রজব মাসে ইবনু আবি আমের তাঁর বাহিনীসহ উত্তরাঞ্চলে অভিযানে বের হন। ৫২ দিনের এই অভিযানে তিনি হামা ও রাবজা দুর্গ জয় করেন। প্রচুর যুদ্ধলব্দ সম্পদ ও যুদ্ধবন্দীসহ তিনি কুরতুবায় ফিরে আসেন। প্রথম অভিযানেই জয়ের মাধ্যমে ইবনু আবি আমের প্রজাদের আস্থা লাভ করেন।

একই বছর ঈদুল ফিতরের দিন তিনি আবারও অভিযানে বের হন। এবার তিনি ক্যাস্টোলার মুলা দুর্গ জয় করেন। এরপর নজর দেন প্রশাসনের দিকে। নতুন করে ঢেলে সাজান পুরো রাষ্ট্রের কাঠামো। দুর্বল, ভীরু ও অযোগ্যদের বাদ দিয়ে নতুন ও কর্মঠদের নিয়োগ দেয়া হয়। এভাবেই তিনি আমিরিয়া সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। আমিরিয়া সাম্রাজ্য ছিল মুসলিম আন্দালুসের প্রতাপের যুগ।

রাষ্ট্রের ভিত মজবুত করে ইবনু আবি আমের নজর দেন আন্দালুসের পাশে অবস্থিত খ্রিষ্টান রাষ্ট্রগুলোর দিকে। শুরু করেন এক দীর্ঘমেয়াদী অভিযানের, যা চালু ছিল পরবর্তী ২৭ বছর ধরে। এই সময়ে প্রতিটি যুদ্ধেই ইবনু আবি আমের জয়লাভ করেছেন। কখনো তাঁর বাহিনী পরাজিত হয়নি, কখনো তাঁর বাহিনীর পতাকা অবদমিত হয়নি। তিনি ঘোড়া দাপিয়েছেন উত্তরে বিস্কে উপসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূল পর্যন্ত। তাঁর বাহিনী অতিক্রম করেছিল এমনসব এলাকা, তাঁর আগে কোনো সেনাপতি বা শাসক যে পর্যন্ত যেতে পারেনি।

তিনি কখনো জয় করেছিলেন সাখরা অঞ্চল, আবার কখনো ছুটে গিয়েছেন সেন্ট ইয়াকুব নগরীতে। কখনো তাঁর বাহিনী ঝড়ের গতিতে আছড়ে পড়েছে সান স্টিফেন দুর্গে। তিনি অতিক্রম করেছিলেন পার্বত্য এলাকা, তাঁর সামনে বাধা হতে পারেনি দুর্গম বন্ধুর পথ।

প্রতিবছর দুবার তিনি সামরিক অভিযান পরিচালনা করতেন। একবার গ্রীষ্মকালে, আরেকবার শীতকালে। এর আগ পর্যন্ত আন্দালুসের মুসলমানদের মধ্যে শুধু গ্রীষ্মকালে অভিযানে যাওয়ার প্রচলন ছিল। প্রতিটি অভিযান থেকে ফিরে তিনি পরনের পোষাক ঝেরে ধুলোবালি সংগ্রহ করতেন। তারপর তা একটি বোতলে জমা করে রাখতেন। তিনি অসিয়ত করে গিয়েছিলেন, তাঁর কাফনের সাথে যেন এই ধুলোবালিও দিয়ে দেয়া হয়। (২)

মূলত তিনি একটি হাদিসে বর্ণিত সুসংবাদের প্রতি লক্ষ রেখেই এমনটা করেছিলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর পথের ধুলো ও জাহান্নামের আগুন একত্রিত হবে না। (৩)

৩৭১ হিজরিতে তিনি হাজিব আল মানসুর উপাধি ধারণ করেন। একবার তিনি সংবাদ পান নাফার রাষ্ট্রে তিনজন মুসলিম নারীকে বন্দী করে রাখা হয়েছে। দ্রুত তিনি বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করে ফেলেন। এই বাহিনী উপস্থিত হয় নাফার রাষ্ট্রের সীমান্তে। নাফার সম্রাট আতংকিত হয়ে জিজ্ঞেস করেন, আপনারা কেন এসেছেন। তাঁকে বলা হয়, আপনার রাজ্যের একটি গির্জায় তিনজন মুসলিম নারীকে বন্দী করে রাখা হয়েছে। নাফার সম্রাট জানান, এই বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। এবং দ্রুতই তিনি এর সমাধান করবেন। সম্রাট নিজের উদ্যোগে সেই তিন মুসলিম নারীকে মুক্ত করেন। এর সাথে যারা জড়িত ছিল তাদের সবাইকে শাস্তি দেন। এমনকি হাজিব আল মানসুরকে সন্তুষ্ট করার জন্য তিনি গির্জাটিও ভেঙে ফেলেন। (৪)

একরাতে হাজিব আল মানসুরের এক কর্মচারী তাঁকে বললেন, আমাদের মনিবের চেহারার ক্লান্তি বলে দিচ্ছে তাঁর এখন ঘুম দরকার। নিদ্রাহীনতা তাঁকে অসুস্থ করে দেবে। জবাবে হাজিব আল মানসুর বললেন, যখন প্রজারা ঘুমায় তখন শাসনকর্তা ঘুমাতে পারে না। যদি আমার ঘুম দীর্ঘ হয় তাহলে এই রাজ্যের সমৃদ্ধিও ঘুমিয়ে যাবে। (৫)

হাজিব আল মানসুর ইন্তেকাল করেন ৩৯৪ হিজরিতে। তাঁর কবরফলকে কেউ একজন লিখে দিলেন, তাঁর কৃতকর্মই তোমাকে তাঁর সম্পর্কে জানাবে, মনে হবে তুমি নিজ চোখেই তাঁকে দেখছো। তাঁর সময়কালের মতো সময় হয়তো আর আসবে না। উপকূলীয় শহর হয়তো আর কখনো উত্তপ্ত অগ্নিগর্ভ হবে না।

তারপর বহুদিন গত হলো। আন্দালুস হয়ে পড়লো বিভক্ত। উত্তরে শক্তি সঞ্চয় করলো খ্রিষ্টানরা। তারা দখল করে নিল একের পর এক রাজ্য। আলফান্সো দখল করে নিল হাজিব আল মানসুরের শহর মাদিনাতুস সালেম।

আলফান্সোর নির্দেশে হাজিব আল মানসুরের কবরের উপর তাবু গাড়া হলো। সেখানেই রাখা হলো আলফান্সোর শোয়ার খাট। আলফান্সো তার স্ত্রীসহ সেই খাটে বিশ্রাম নিচ্ছিল। হঠাৎ সে বলে উঠলো, বাহ, আমি মুসলমানদের রাজত্ব দখল করেছি এবং তাদের সম্রাটের কবরের উপর আমার খাট রেখেছি।

উপস্থিত একজন বলে উঠলো, যদি এই কবরে শুয়ে থাকা ব্যক্তি জীবিত থাকতেন তাহলে আপনি আজ এখানে থাকা দূরের কথা এই রাজ্যের দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহসও পেতেন না। তিনি আমাদের কাউকেই ছাড়তেন না। এই কথা শুনে আলফান্সো রেগে যায়। তখন তার স্ত্রী তাকে বলে, সে সত্যই বলেছে। তুমি কি নিজেকে তার (হাজিব আল মানসুর) মতো মনে করো? (৬)

তথ্যসূত্র—
১. বাসসাম আসালি, কদাতুল হুরুবিস সলিবিয়্যা, পৃ-৪১৮-৪৩০ (বৈরুত, দারুন নাফাইস, ১৪৩৩ হিজরি)
২. যাহাবী, শামসুদ্দিন মুহাম্মদ বিন আহমাদ বিন উসমান (মৃত্যু ৭৪৮ হিজরি), সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১৭/১৬, (বৈরুত, মুআসসাসাতুর রিসালাহ, ১৪১৭ হিজরি)
৩. জামে তিরমিজি, ১৬৩৩
৪. মাক্কারি, আহমাদ বিন মুহাম্মদ (মৃত্যু ১০৪১ হিজরি), নাফহুত তিব মিন গুসনিল আন্দালুসির রাতিব, ১/৪০৪ (দার সাদের, বৈরুত)
৫. প্রাগুক্ত, পৃ-৪১৬
৬. বাসসাম আসালি, কদাতুল হুরুবিস সলিবিয়্যা, পৃ-৪১৮ (বৈরুত, দারুন নাফাইস, ১৪৩৩ হিজরি)


লিখেছেন— ইমরান রাইহান

বাঙ্গালাহ সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ

বাঙ্গালাহ সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহকে নিয়ে সমালোচনার জবাব-

চিত্রে ১৩৯৪-১৩৯৯ সালে সর্বোচ্চ বিস্তৃতিতে বাংলা সালতানাত। জ্বি, এটাই  আমাদের বাংলা, আমাদের সাম্রাজ্য- দারুল ইসলাম শাহী বাঙ্গালাহ, আয়তন- ১৪ লক্ষ ৮ হাজার ৭০৬ বর্গকিলোমিটার।

কে ছিলেন সুলতান ইলিয়াস শাহ্? সুলতান শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ্ বাঙ্গালাহ্ ছিলেন সার্বভৌম বাঙ্গালাহ্ সালতানাতের  প্রতিষ্ঠাতা, যিনি উপেক্ষিত বাংলা কে পরিণত করেছিলেন  শাহী  বাংলায়। গঙ্গা একদিন পলিফেলে সৃজন করেছিলো বিশ্বের উর্বরতম ব-দ্বীপ।
একজন সিস্তানি ব্যক্তি যিনি সুদূর সিস্তান থেকে বাংলায় এসে উপেক্ষিত, শোষিত, মজলুম বাঙালির রাষ্ট্রশক্তির উত্থান ঘটিয়ে হয়ে উঠেছিলেন অখন্ড বাংলার প্রথম সম্রাট।

সুলতান আলাউদ্দিন খলজির নেতৃত্বে মঙ্গোল আক্রমণ প্রতিহত করে করে হিন্দুস্থান (দিল্লি সালতানাত) পরিণত হয়  মহাবিশ্বশক্তিতে, যার বিস্তৃতি ঘটে বাংলা ব্যতীত প্রায় সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশব্যাপী [বাংলায় তখন বলবানী বংশের স্বাধীন সুলতানদের রাজত্ব ছিলো]
সেই বিশাল দিল্লি সালতানাতের  মহাপ্রতিপত্তির কার্যত পতন ঘটে  সুলতান শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহের আক্রমণে  এবং এরপর দিল্লির প্রতিপত্তির  চূড়ান্ত পতন ঘটে ১৩৯৮ সালে আমির তাইমুরের আক্রমণের ফলে। এরপর মুঘল যুগের পূর্বাবধি দিল্লি আর কখনোই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি।

শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহের আক্রমণ এবং সামরিক অভিযান এতো তীব্র ছিলো যে, দিল্লির প্রায় এক-তৃতীয়াংশই তিনি জয় করে নিয়েছিলেন।   ইলিয়াসের আক্রমণের সুযোগেই দক্ষিণ ভারতে বাহমনী,  বিজয়নগর (সঙ্গম বংশীয়) এবং সিন্ধু-মূলতান বিদ্রোহ করে স্বাধীন হয়ে যায়, যাদের সম্মিলিত আয়তন ছিলো শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের বাঙ্গালাহ সাম্রাজ্যের সমান। ইলিয়াস শাহ্ ১৩৪৭ সালে হিন্দুস্থানের করদ রাজপুত রাজ্য গোরখপুর, ১৩৪৮ সালে  তৎকালীন বিশ্বের বৃহত্তম হিন্দু রাজ্য উড়িষ্যা বিজয় করেন  এবং  ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দে  ইলিয়াস শাহ্ সমগ্র নেপাল দখল করে নেন। তিনি ১৩৪৫ সালে হিন্দুস্থানের অন্তর্গত বৃহত্তম প্রদেশ কারাহ-প্রায়াগ পর্যন্ত বিজয় করে নেন। অত:পর  ১৩৫২ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইখতিয়ার উদ্দিন গাযী শাহ কে পরাজিত বঙ্গ বিজয় করে পুরো বাংলাকে একত্রিত করেন। সুলতান ইলিয়াস শাহের বিজিত ভূখণ্ডের আয়তন হয়েছিলো ১৩ লক্ষ এবং  ১৪ লক্ষ ৮ হাজার ৭০৬ বর্গকিলোমিটার।  এতোটাই সুবিশাল ছিলো সালতানাত-ই বাঙ্গালাহর সর্বোচ্চ বিস্তৃতি। অন্যদিকে বিশাল হিন্দুস্থান তখন হয়ে পড়ে মাত্র ৮ লক্ষ এবং ৯ লক্ষ বর্গকিলোমিটারের মাঝামাঝি। ভাবতে পারেন আমাদের শাহী বাঙ্গালার সর্বোচ্চ বিস্তৃতি কতটুকু হয়েছিলো? আমরা আজ কী আছি আর এককালে কী ছিলাম?

রিচার্ড ইটন ম্যাক্সওয়েল লিখেছেন- "ইলিয়াসের শাহের এতো বড় বড় গুরুত্বপূর্ণ নগর বিজয় ভারতীয় উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে ছিলো বিশ্ববিজয়ের সমতুল্য। একারণে তাঁকেও আলাউদ্দিন খলজির মতো 'দ্বিতীয় আলেকজান্ডার' খেতাবে ভূষিত করা যায়।"

ইলিয়াস শাহ্ উপেক্ষিত বাংলাকে পরিণত করেছিলেন উপমহাদেশের পরাশক্তিতে। তাঁর স্বাধীন সার্বভৌম সালতানাত প্রতিষ্ঠা নিতান্তই কোনো সাধারণ ক্ষমতার দখলের লড়াই ছিলো না এবং সুলতান ইলিয়াস গভর্নর থাকাকালীন বিদ্রোহ করে স্বাধীন হওয়া অপরাপর শাসকদের মতো ছিলেন না।
তিনি প্রথম জীবনে ছিলেন মালিক ফিরোজ (ফিতোজ শাহ তুঘলক) এক প্রহরী। ১৩২৫ সালে অজ্ঞাত অপরাধের কারণে দিল্লি থেকে বিতাড়িত হয়ে তিনি বঙ্গের বলবানি সুলতান গিয়াস উদ্দিন বাহাদুর শাহের আনুগত্য স্বীকার করে তাঁর বাহিনীতে যোগদান করেন ও সোনারগাঁয়ে আসেন।  তিনি ধীরে ধীরে বাহাদুর শাহের প্রধান সহচর হয়ে ওঠেন।  ১৩২৭ সালের শেষদিকে স্বাধীনচেতা বাহাদুর শাহ্ দিল্লির সুলতান মুহাম্মাদ বিন তুঘলকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। মুহাম্মাদ বিন তুঘলকের বাহিনী বাহাদুর শাহ কে পরাজিত ও হত্যা করে তাঁর মাথা কেটে চামড়া ছাড়িয়ে দিল্লিতে পাঠায় এবং দিল্লির বিজয় গম্বুজে টানিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেন মুহাম্মাদ ইবনে তুঘলক।
মনিবের প্রতি এহেন নিষ্ঠুর আচরণ হিন্দুস্থানের বিরুদ্ধে হাজি ইলিয়াস কে ক্রুব্ধ করে তোলে। রণক্ষেত্র থেকে পালিয়ে হাজি ইলিয়াস বিহারের প্রাদেশিক বাহিনীতে যোগদেন ও পূর্বে সামরিক অভিজ্ঞতা থাকায় দ্রুত মালিক পদে উন্নীত হন। ১৩৩৭ সালে বিহারের গভর্নর মৃত্যুবরণ করলে হাজি ইলিয়াস প্রাদেশিক গভর্নর হন। তিনি তখন স্বাধীনতা ঘোষণা করেন নি। ১৩৩৮ সালে রাঢ়ের গভর্নর ইজাজউদ্দিন ইয়াহিয়া মৃত্যুবরণ করলে ইলিয়াস দ্রুত সাতগাঁওয়ে এসে ক্ষমতা দখল করেন ও রাঢ় ও বিহার একত্র করে নিজেকে রাঢ়ের সুলতান ঘোষণা করেন।
সুতরাং, ইলিয়াস শাহ্ কোনো বিদ্রোহী 'গভর্নর' ছিলেন না। তিনি ক্ষমতার দখল নিয়েছিলেন।

দ্বিতীয় আলেকজান্ডার ইলিয়াস শাহের বীরত্বের কাছে শোচনীয় পরাজয় ঘটে গোরক্ষপুর, বঙ্গ, উড়িষ্যা, কামরূপের শাসকদের, হিন্দুস্থানের প্রতিপত্তি ধ্বংস করে দিয়েছিলেন ইলিয়াস। এমন নাস্তানাবুদ তিনি করেছিলেন দিল্লিকে যে দিল্লির আমির ও ঐতিহাসিকেরা স্বীয় পরাজয়ের গ্লানি ঢাকতে ইলিয়াস শাহ কে যতভাবে ছোট করা যায় ততভাবে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করেই গেছে। শোচনীয় পরাজয়ের বেদনা ভুলতে পারেনি বলেই ইলিয়াস শাহের অবমাননা, তাঁকে যতভাবে সম্ভব খারাপ বানানোর উদ্দেশ্যপ্রণদিত চেষ্টা  হিন্দুস্থান করেই গেছে। বাংলার কাছে খাওয়া মার কী আর এতো সহজে ভোলা যায়!

যেমন-  সুলতান ইলিয়াস শাহ সোনারগাঁও বিজয়ের পর পুরো বাংলাকে একক ভূখণ্ডে পরিণত করে সালতানাতের নাম "বাঙ্গালাহ" এবং নিজেকে শাহ-ই বাঙ্গালাহ্ ঘোষণাই শুধু করেন নি, তিনি নিজের নামের সাথেই "বাঙ্গালাহ্" কথাটি জুড়ে দিয়ে নিজের রাজকীয় নামকরণই করেছিলেন-"শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ বাঙ্গালাহ"।বাঙ্গালাহ কেবল তাঁর সাম্রাজ্যেরই নাম নয়, "বাঙ্গালাহ" ছিলো তাঁর নামের একটি উপাধি। এভাবে নিজের নামের সাথে বাংলাকে যুক্ত করে অন্য কোনো শাসক কখনোই সিংহাসনে বসেন নি। আর এভাবেই ইলিয়াস শাহ নিজেকে বাঙ্গালির রাজা (শাহ-ই বাঙ্গালিয়ান) এবং নিজের নামের সাথে বাঙ্গালাহ যুক্ত করে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলার ও বাঙালির একটি  স্বতন্ত্র পরিচয়  সৃষ্টি করলেন। এর পূর্বে বাংলাভূখণ্ডের অধিবাসীদের কোনো একক পরিচয় ছিলোনা। ইলিয়াসই  সর্বপ্রথম এই ভূখণ্ডের  অধিবাসীদের বাঙালি পরিচয়ে  পরিচিত করেন।

দিল্লির ঐতিহাসিকেরা ইলিয়াস শাহের "বাঙ্গালাহ" নামটি বিকৃতিভরে "ভাঙ্গাড়া" /"ভাঙ্কারা" হিসেবে উচ্চারণ করতো এবং শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ কে ভাঙসেবী বা ভাঙখোর হিসেবে দিল্লির আমিরেরা বহুবার উল্লেখ করেছেন।

এর কারণ হলো- ইলিয়াস শাহ এতো দ্রুত এতো দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারতেন যে দিল্লির বদ্ধমূল ধারণা হয়ে গিয়েছিলো যে, ভাঙ সেবন না করলে এতো কম সময়ে এত ভয়ংকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব ছিলো না। একদালার প্রথম মহাযুদ্ধের সময় কৌশলগত ত্রুটির কারণে ইলিয়াস শাহের ২ লক্ষ ১২ হাজার সৈন্যের বাহিনীর ২ লক্ষ ১১ হাজার ৯৯৩ জন সৈনিক [প্রধান সেনাপতি সহদেব সহ]
হিন্দুস্থানের বাহিনীর ব্যাপক ক্যাভালরি চার্জের সম্মুখীন হয়ে নিহত হয়েছিলো। সুলতান এবং শাহজাদা সহ মাত্র ৭ জন সৈন্য যখন জীবিত এবং দুর্গের বাইরে যখন ৭ লক্ষ সৈন্যের হিন্দুস্থানি ফৌজ [১০ লক্ষ সৈন্যের ৩ লক্ষ নিহত হয়েছিলো]  অপেক্ষা করছে, তখন সুলতান সেই ৭ জন সৈনিক নিয়েই যুদ্ধ চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন।   বঙ্গের গভর্নর মালিক মুয়াজ্জিমকে সৈন্য প্রেরণের নির্দেশ দিয়েছিলেন আগেই। বঙ্গের গভর্নর মুয়াজ্জিম খান বাংলার সাধারণ জনগণ কে রাজশক্তির পতাকাতলে সমবেত হওয়ার আহ্বান জানালেন। "সুলতান ডাকছেন"- একথা শুনেই ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যুবকেরা যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার্থে -এতোটাই ছিল সুলতান ইলিয়াসের জনপ্রিয়তা। ১০ লক্ষ সৈন্যের বিশাল বহর নিয়ে একডালা অভিমুখে যাত্রা করলেন মালিক মুয়াজ্জিম খান।  হঠাৎ পূর্বদিক থেকে বিশাল সৈন্যবহর আসতে দেখে হতবাক হয়ে গেলেন ফিরোজ শাহ তুঘলক। এই বিশাল সৈন্যবহর দেখেই প্রচণ্ড ঘাবড়ে গিয়ে হিন্দুস্থানি ফৌজ ছুটে পালাতে থাকলো। ১০ লক্ষ বাঙ্গালি সৈন্য ৭ লক্ষ হিন্দুস্থানি সৈন্যকে তাড়া করে ইলিয়াস শাহী বাঙ্গালাহ থেকে বিতাড়িত করলো। ২ লক্ষ ১১হাজার ৯৯৩  সৈন্যের প্রাণের বিনিময়ে রক্ষিত হলো বাংলার স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য। পরাজিত ফিরোজ শাহ দিল্লি ফিরে ঘোষণা দিলেন- "আর কেউ কারো রাজ্য আক্রমণ করবেনা"।

এই পরাজয় কী ভোলা যায়? আর তাই দিল্লির ঐতিহাসিকরা মহামতি ইলিয়াস শাহ কে ছোট করতে তাঁকে ভাঙসেবী হিসেবে ও বাঙ্গালা কে ব্যাঙ্গভরে 'ভাঙ্গাড়া' হিসেবে উল্লেখ করে গেছে।

 ফ্রান্সিস বুকানন হ্যামিল্টন লিখেছেন- [ হাজি ইলিয়াস নাকি ফিরোজ বিন রজবের এক উপপত্নীকে ধর্ষণ  করায় দিল্লি থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন। - এই তথ্যটি সম্পূর্ণভাবে ভ্রান্ত। কারণ-  হেরেম পাহারা দিতো সশস্ত্র খোজারা এবং কোনো সাধারণ  প্রহরী তো  দূরের কথা , যার হেরেম তিনি ব্যতীত অন্য কোনো রাজপুরুষের পর্যন্ত হেরেমে প্রবেশাধিকার ছিলো  না। সবসময় কড়া পাহারা থাকতো।  তাহলে ইলিয়াসের মত একজন প্রাসাদরক্ষীর পক্ষে কোনভাবেই হেরেমে প্রবেশ করা সম্ভব না, মালিক ফিরোজের কোনো দাসীকে বলাৎকার করার তো প্রশ্নই আসে না।

তাই এই তথ্য ইলিয়াস শাহ কে কলঙ্কিত করার অপপ্রয়াস মাত্র ]

 ইলিয়াস শাহ ক্ষমতার জন্য নিজের দুধ ভাইকে হত্যা করেছেন।

হ্যাঁ কথা সত্য। মুহাম্মাদ বিন তুঘলক বাংলাকে ভাগ করেছিলেন তিনটি প্রদেশে। যথা:-
(১) গৌড়- রাজধানী লখনৌতি
(২)বঙ্গ -সোনারগাঁও
(৩) রাঢ় - রাজধানী সাতগাঁও

১৩৩৮ সালে এই তিনটি প্রদেশই স্বাধীন হয়ে পড়ে।  গৌড়ের গভর্নর কদর খান  বঙ্গের সুলতান ফখরুদ্দিন মোবারক শাহের বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে নিহত হলে তাঁরই সামরিক সচিব আলি মুবারাক লখনৌতির ক্ষমতা দখল করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। আলী মুবারাক আলাউদ্দিন আলি শাহ নামধারণ করেন। ইনি ছিলেন ইলিয়াস শাহের দুধভাই। ইলিয়াস শাহ তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য ১৩৪২ সালে গৌড়ের সুলতান আলাউদ্দিন আলি শাহ উরফে আলি মুবারকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন ও আলাউদ্দিন আলি শাহ নিহত হন। ইলিয়াস শাহ লখনৌতি বিজয় করেন এবং ১৩৪৩ সালে তাঁর রাজধানী ফিরোজাবাদে (পান্ডুয়া) স্থানান্তরিত করেন।

রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে কেউ কারোর আপন না। ভাই কর্তৃক ভাইয়ের, সন্তান কর্তৃক পিতার,  ভাতিজা কর্তৃক  চাচার হত্যা স্বাভাবিক একটি বিষয় হিসেবে পরিগণিত হত। তাই ইলিয়াস শাহের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য-রাজ্য  বিস্তারে এটা স্বাভাবিক বিষয়। আর যদি ইলিয়াস শাহকে দোষ দিতেই হয় তাহলে বলব-

(১) সুলতান মুহাম্মাদ বিন তুঘলক নিজে তাঁর বাবা গিয়াস উদদিন তুঘলক কে হীন চক্রান্তমূলকভাবে হাতির খেলা দেখাতে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে সিংহাসনে বসেছিলেন।

(২) হিন্দুস্থানের শ্রেষ্ঠ সুলতান আলাউদ্দিন খলজি নিজ চাচা জালাল-উদ্দিন খিলজি কে হত্যা করে সিংহাসনে বসেছিলেন ।

(৩) উসমানিয় খিলাফতের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান প্রথম সেলিম তাঁর বাবা সুলতান দ্বিতীয় বেয়াজিদকে ক্ষমতাচ্যুত করে নির্বাসনে পাঠিয়েছিলেন। নির্বাসনে যাবার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।
মাত্রাকচি নাসুহ তাঁর 'সুলাইমাননামা' তে লিখেছেন- সুলতান বেয়াজিদ খানের মৃত্যুতে সুলতান সেলিম জড়িত ছিলেন।

(৪) বিখ্যাত মৌর্য সম্রাট অশোক তাঁর ৯৯ জন সৎ ভাইকেই হত্যা করেছিলেন। কেবলমাত্র বিতাশোক নামে একমাত্র আপন ভাইকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। সৎ ভাই সুসীমকে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করে খুন করেছিলেন 'বৌদ্ধধর্মের কনস্ট্যানটাইন' খ্যাত এই সম্রাট।

(৫) উসমানীয় সুলতান তৃতীয় মুহাম্মাদ তাঁর ২২ জন সৎ ভাইকে হত্যা করেছিলো, যাদের অনেকেই ছিলেন বধির, প্রতিবন্ধী তথা সিংহাসন গ্রহণের অনুপযোগী। তারপরও তাঁরা রেহাই পান নি নিষ্ঠুরতা থেকে । তিনি তাঁর পিতার সাত গর্ভবতী উপপত্নীকেও হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন ।

সুতরাং ইলিয়াস শাহকে দোষ দেয়ার পূর্বে উপরের ব্যক্তিদের কথা স্মরণে রাখা উচিত।

ইলিয়াস শাহের বীরত্ব হিন্দুস্থানের ভীত নাড়িয়ে দিয়েছিলো বলেই ইলিয়াস কে তারা সবসময় ছোট করার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। ইলিয়াস শাহের সাম্রাজ্য উত্তর ভারতের অযোধ্যা, বাহরাইচ, নেপাল হয়ে উড়িষ্যা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ভারতের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ অনেক নগর ইলিয়াস শাহ জয় করেছিলেন।
তিনি বাঙালি জাতির  রাজনৈতিক ঐক্যের মাধ্যমে একটি জাতিকে সুসংবদ্ধ  ও শাসক জাতিতে পরিণত করেছিলেন, যার কৃতিত্ব অন্য কারোর নেই। পাল সাম্রাজ্য এবং নন্দ সাম্রাজ্য বাঙালির জন্য তাদের অবদান অনেক- তবে জাতি হিসেবে পৃথিবীতে বাঙ্গালির আলাদা পরিচয় সৃষ্টি এবং 
প্রতিষ্ঠা যুদ্ধের মাধ্যমে মজলুম উপেক্ষিত জাতির সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার ভিত্তিতে উপমহাদেশীয় পরাশক্তিতে পরিণত করার কৃতিত্ব কেবলমাত্র সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের। ভারতের প্রখ্যাত ইসলাম প্রচারক আখী মাখদুম সিরাজ (রহ.) ছিলেন সুলতানের প্রিয় বন্ধু। তিনি শাইখ আলাউল হক (রহ.) এর স্মরণে বেনিয়াপুকুর মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। মুসলিম হত্যার প্রতিশোধে তিনি নেপাল তছনছ করে দিয়েছিলেন।

মহান ইলিয়াস শাহ সর্বপ্রথম উপমহাদেশে বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে ঘণ্টা বাজিয়েছিলেন শূদ্র সহদেবকে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করে। প্রজাদেরকে তিনি দেখতেন তাঁর কর্মের ভিত্তিতে, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়। তিনি সর্বপ্রথম বাংলার বাহিনীতে হিন্দুদের নিয়োগদান শুরু করেন।

[১৪,০৮,৭০৬ বর্গকিলোমিটারের বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন বাঙ্গালার বিস্তৃতি সীমা কতদূর যেতে পারে। তবে ইলিয়াস শাহের এই সাম্রাজ্যের আয়তন পরবর্তিতে বিভিন্ন সময় ক্ষয়প্রাপ্ত হয়,অনেক ভূমি হাতছাড়া হয়ে যায়..আবার দখলে আসে সেসব ভূমির কিছু অংশ আবার কিছু অংশ কখনোই দখলে আসেনি বাংলার। সাইফুদ্দীন হামজা শাহের রাজত্বকালে নেপালে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে এবং ১৪১৩ সালে স্বাধীন হয়ে যায় শিহাবউদ্দিন বায়াজিদ শাহের আমলে। জৌনপুরের শার্কিরা আজমগড় দখল করে নেয় এবং বাংলার উপর আক্রমণ চালাতে থাকে। অনেকবার ত্রিপুরা এবং আসাম বিদ্রোহ করে, বিভিন্ন সময় বিদ্রোহ দমনে আসে। উড়িষ্যা স্বাধীন হয়েই ক্ষান্ত হয়নি, মূল বাংলার উপর আক্রমণও চালাতে থাকে। পরবর্তীতে উড়িষ্যা আবার বাংলার পদানত হয়।]

আর এজন্যই সুলতান ইলিয়াস শাহ বাঙ্গালার প্রতি দিল্লির এতো বিদ্বেষ।

লিখেছেন— রাজিত তাহমীদ জিত

বুধবার, ২৯ জুন, ২০২২

খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ) সংক্ষিপ্ত পরিচয়

যার তলোয়ারের উত্থানে উদিত হয়েছিল মুসলিম বাহিনীর বিজয়ের আদিত্য।

কুস্তি, তরাবারি চালনা, উঠের উপর থেকে ধু ধু মরুর প্রান্থে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ার ক্ষিপ্ত কৌশল রপ্ত করা নিয়ে প্রাথমিক জীবন শুরু হয়েছিল খালিদের। যুদ্ধ থেকে যুদ্ধ, যৌবনের দিনলিপি গুলো আক্রমণ আর পাল্টা আক্রমণে দারুণ ভাবে গুছানো ছিল। যার শৈশব কৈশোর কেটেছে ঝড় তুফানে তার বাঁধভাঙা যৌবন কী মহাপ্লাবন’কে উপেক্ষা করতে পারে? খালিদ বিন ওয়ালিদ ঠিক যেন এমনই, উহুদ থেকে মুতা'র যেখানেই যুদ্ধ অংশ নিতে ভূলে যাননি। সময়ের ব্যবধানে পক্ষ পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু কৌশল আজীবন অপরিবর্তিত ছিল। রণকৌশলের অনন্য সুনিপুণ সব যোগ্যতা তাকে সময়ের সেরা সমর নায়ক,যুদ্ধ বিজেতা আর ‘সাইফুল্লাহ’ বা আল্লাহর তরবারিতে পরিণত করেছিল।

শুরুর দিকে,
খালিদের জন্ম হয়েছিল আনুমানিক ৫৯০–৫৯৩ খ্রীঃ তৎকালীন মক্কার এক অভিজাত পরিবারে। পিতা ছিলেন বনি মখযুম গোত্রের প্রধান আল ওয়ালিদ। তদানীন্তন আরব অভিজাতদের চিরাচরিত রীতি অনুযায়ী জন্মের পর শিশু ওয়ালিদকে রেখে আসা হয় দুধ মাতার দায়িত্বে। যারা ছিল মরুবাসী বেদুইন। মক্কার রুক্ষ শুষ্ক আবহাওয়ায় ঠিকে থাকার লড়াইয়ের হাতেখড়ি হয়েছিল অল্পবয়সেই। ৪/৬ বয়সেই নিজ গোত্রে চলে আসেন খালিদ। পরিবার বিত্তশালী হওয়ার দরুন আয় রোজগার নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন পড়েনি ওয়ালিদ পুত্রের। হয়তো এই অদৃশ্য সুযোগ খালিদ বিন ওয়ালিদের একজন মহাবীর হওয়ার যাত্রাকে তরান্বিত করেছিল। যুদ্ধের দুর্দান্ত সব কলা-কৌশল অর্জনে নিজের ধ্যান,জ্ঞান সপে দিয়েছিলেন ওয়ালিদ। যার ফল পেতেও বেশি বেগ পেতে হয়নি। স্বল্প সময়ে মক্কার কুরাইশদের মধ্যে নিজের সুদৃঢ় অবস্থান পাকাপোক্ত করে ফেলেন খালিদ বিন ওয়ালিদ। নিজেকে পরিনত করেন মক্কার কুরাইশদের দুর্ধর্ষ যোদ্ধা আর বাবার সুযোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে।

❐ মহাবীর খালিদ বিন ওয়ালিদ(রাঃ) ইসলাম ধর্ম গ্রহণ পূর্ববর্তী মক্কা,মদিনা–
তৎকালীন আরবের সমসাময়িক অনেক ঘটনা খালিদ বিন ওয়ালিদের জীবনের গতিবিধির উপর নিখুঁত প্রভাব ফেলেছিল। উল্লেখ্য মদিনাবাসী আর মক্কার কুরাইশ দের মধ্যে সংঘাত ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। যার প্রেক্ষিতে কুরাইশদের জনমনে মদিনার প্রতি আক্রমনাত্নক মনোভাব সহজাত হয়ে উঠেছিল।

কিন্তু কেন?
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) কর্তৃক মক্কায় ইসলামের প্রচার এবং প্রসারকে কুরাইশরা কখনো মেনে নেয়নি আর সহজভাবে গ্রহণ ও করেনি। তবে, তার সুনির্দিষ্ট অনেক কারন ছিল প্রথমত, কুরাইশরা মোহাম্মদ (সাঃ)কে নিছক ধর্ম প্রচারক মনে করতো না বিশেষ করে কুরাইশ নেতারা। তারা মহানবী সাঃ এবং উনার অনুসারীদের বিপ্লবী হিসেবে ধারণা পোষন করত। কুরাইশরা মুসলিম দের উত্থানকে নিজেদের ক্ষমতার জন্য হুমকি মনে করেছিল যার দরুন তারা মুসলিম দের ব্যাপারে ভীত ছিল।
মোহাম্মদ (সাঃ) এবং উনার অনুসারীরা কুরাইশ দের তিব্র নির্যাতনের মুখে মক্কা’কে ইসলাম প্রচারের জন্য সুবিধাজনক করে তুলতে পারেন নি। ফলসরুপ ইয়াসরিব বাসীর আমন্ত্রনে এবং ইয়াসিরিবে ধর্ম প্রচারের সর্বাপেক্ষায় অনুকূলতা পেয়ে সেখানে মহানবী সাঃ হিজরত করেন। মহানবী (সাঃ) পদচারণে ততোদিনে ইয়াসরিব পরিনত হয় "মদিনাতুন্নবি" বা নবীর শহরে। একজন বিচক্ষণ নেতা হিসেবে মদিনার সনদের মাধ্যমে মোহাম্মদ সাঃ নিজেকে আসিন করেন মদিনার সর্বোচ্চ ক্ষমতায়। মদিনা রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে খুব স্বল্প সময়ে।

মুসলিমদের তুমুল জনপ্রিয়তা, ক্ষমতা, গ্রহণ যোগ্যতা আর অগ্রগতি পৌত্তলিক’তায় বিশ্বাসী মক্কার কুরাইশ নেতাদের ঈর্ষান্বিত করে তুলে এবং মদিনার মতো গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানের অধিপত্যে মুসলিমদের কখনো সহ্য করেনি কুরাইশ’রা । যার ফলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুসলিম বাহিনী বাধ্য হয় কুরাইশ দের সাথে বদর, উহুদ আর খন্দকের যুদ্ধে লড়তে। তখন'ও খালিদ বিন ওয়ালিদ মুসলিম দের বিপক্ষে ছিলেন অস্র ব্যবহার করেছেন মুসলিম দের বিরুদ্ধেই।

❐ উহুদের যুদ্ধে খালিদ।
উহুদের প্রান্তে সেদিন খালিদ বিন ওয়ালিদের আকস্মিক আক্রমণ কোনটাসা করে ফেলে মুসলিম বাহিনী’কে। হতবাক মুসলিম বাহিনী উহুদের ময়দানে স্বয়ং সাক্ষী হয় এক অকুতোভয় রণ-শৈলী’র। মাস খানিক আগে মুসলিম বাহিনীর মাত্র ৩১৩ জন সৈন্যের সাথে বদর যুদ্ধে পরাজয়ের স্বাধ পায় কুরাইশ'রা। বদরে নিহত হন কুরাইশ নেতা আবু জেহেল। পরাজয়ের গ্লানি আর মদিনার উঠতি প্রভাব দিনের পর দিন শংকিত করে তুলে মক্কার কুরাইশ দের। যার অনিবার্য পরিণতি গড়ায় উহুদের যুদ্ধে।

আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে থাকা ৩০০০ কুরাইশ সৈন্যের বিপরীতে মোহাম্মদ (সাঃ) ১০০ জন বর্মধারী ৫০ জন তীরন্দাজ সহ মোট ১০০০ সৈন্য নিয়ে উহুদ উপত্যকার উদ্দেশ্য যাত্রা শুরু করেন।
পথিমধ্যে মহানবী (সাঃ) সাথে থাকা বিশ্বাস ঘাতক আব্দুল্লাহ বিন উবাই তার ৩০০ জন সৈন্য নিয়ে মুসলিম বাহিনী’কে প্রত্যাখ্যান করে। শেষমেশ মুসলিম বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা দাঁড়াল ৭০০ জনে।
উল্লেখ্য আব্দুল্লাহ বিন উবাই কখনো মদিনার ক্ষমতায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) এবং উনার অনুসারীদের সহ্য করে নি।
মাত্র ৭০০ জন সৈন্য নিয়ে কুরাইশ দের ৩০০০ বাহিনীর মোকাবিলার জন্য অগ্রসর হন মোহাম্মদ (সাঃ) অবশেষে মুসলিম বাহিনীর পাশের গিরিপথ পাহারা দেয়ার জন্য মোহাম্মদ (সাঃ) আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়েরের নেতৃত্বে ৫০ জন তীরন্দাজ নিযুক্ত করেন এবং আদেশ জারি করেন পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত গিরিপথ ত্যাগ না করার।
যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকে মুসলিম বাহিনী ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন করে এবং কুরাইশ বাহিনী যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে পলায়ন শুরু করে। অপরদিকে যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর জয় প্রায় নিশ্চিতের আশংকায় গিরিপথরক্ষীরা জয়ের আনন্দে কুরাইশদের পরিত্যক্ত ধনসম্পদ সংগ্রহের জন্য রাসুল(সাঃ) নির্দেশনার পরোয়া না করেই গিরিপথ ত্যাগ করে।
কিন্তু তখনও কুরাইশ বাহিনীর হয়ে ময়দানে ছিলেন খালিদ বিন ওয়ালিদ। অরক্ষিত গিরিপথ দিয়ে মুসলিম বাহিনীর উপর পিছনের দিক থেকে আচমকা ঝাপিয়ে পড়েন খালিদ। আতর্কিত হামলায় মুসলিম বাহিনী বিপর্যস্থ হয়ে পরে । মহানবী (সাঃ) আহত হয়ে জ্ঞান হারান এবং পতাকাবাহী মুজাহিদ মুসাব,হামজা (রাঃ) সহ অসংখ্য সাহাবী শাহাদাত বরন করেন। হঠাৎ যুদ্ধের ময়দানে গুজব উঠে মোহাম্মদ (সাঃ) নিহত হয়েছেন । এই অনিশ্চিত আনন্দে আপ্লূত হয়ে খালিদ বিন ওয়ালিদের কুরাইশ বাহিনী যুদ্ধের ময়দান থেকে মদিনা দখল না করেই মক্কা ফিরে যায়। সেদিনকার ফলাফল অমিমাংসিত থাকলেও খালিদ বিন ওয়ালিদের যুদ্ধের সাথে কৌশলের মিমাংসা ঠিকই হয়েছিল।

❐ ইসলাম ধর্মে খালিদ বিন ওয়ালিদ।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) আরব উপদ্বীপে ইসলামের যে বটবৃক্ষ রোপন করেছিলেন তার সু-শীতল ছায়াতলে ঠাই হয়েছে এমন দিগ্বিজয়ী বীরদের হয়তো গুনে শেষ করা যাবে না। তবে অসংখ্য অগনিতের মধ্যে খালিদ ছিলেন একের ভিতর অনেক।
যেই পাল আরব থেকে যাত্রা শুরু করেছিল উমর, আলীর ন্যায় সেই পালে হাওয়া দিতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেন’নি খালিদ বিন ওয়ালিদ। হুদায়বিয়ার পর মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর চিন্তা চেতনাকে গভীর ভাবে অনুদাবন করতে পেরেছিলেন তিনি । আসলে খালিদ বিন ওয়ালিদ কুরাইশদের পৌত্তলিক’তাকে অতটা হৃদয়ে ধারণ করতেন না। অনেক রাজনৈতিক সমীকরণ উপেক্ষা করে খালিদ বিন ওয়ালিদ ও চলে আসেন ইসলামের পতাকা’তলে। আর ইসলাম তাকে আমুল পাল্টে দেয়। পরবর্তী কালে খালিদ পরিণত হয়েছিলেন ইসলামের শক্তিশালী হাতিয়ারে। আপাতদৃষ্টিতে খালিদের ইসলাম গ্রহণ অতি শীঘ্র মনে হলেও এটা ছিল খালিদ বিন ওয়ালিদের ইসলামের উপর দীর্ঘ দিনের অনুসরণের ফল।

❐ মুতা’হ যুদ্ধের বীর সেনানী খালিদ বিন ওয়ালিদ।
খালিদ বিন ওয়ালিদ ততোদিনে মুসলিম বাহিনীর একজন সুযোগ্য সৈনিক। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) প্রায়ই আশেপাশের বিভিন্ন অঞ্চলে মদিনা থেকে বিভিন্ন গোত্র প্রধানদের কাছে দূতের মাধ্যমে ইসলামের বাণী লিখে চিঠি পাঠাতেন। একদিন চিঠি পাঠানো হল বুসরার গাসসান গোত্র প্রধানের কাছে। কিন্তু চিঠি যথাস্থানে পৌছে নি! খবর এলো বার্তাবাহক’কে পথিমধ্যে আক্রান্ত করা হয়েছে। রোমান সম্রাটের শুরাহবিল বিন আমর নামের এক প্রতিনিধি সেই বার্তাবাহক’কে ধরে নিয়ে যায় এবং শারীরিক নির্যাতন সহ তাকে হত্যা করে। সেই সময় দূত হত্যাকে চরম অপমানজনক এবং অসৌজন্যমূলক আচরণ বলে ভাবা হতো সাথে যুদ্ধ আহ্বানের সাংকেতিক চিহ্ন হিসেবে বিবেচনা করা হতো। যা পরবর্তীতে মুসলিম বাহিনী’কে মুতা’হ যুদ্ধে উষ্কে দেয়। অসাধারণ সব গুনাবলি থাকা স্বত্তেও খালিদ খুব সাধারণ সৈন্যের ন্যায় মুতা'হ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ইতিপূর্বে মহানবী (সাঃ) একেকজনের মৃত্যুর পর সেনাপ্রধান হিসেবে নির্বাচিত করে দেন যায়েদ বিন হারিস (রাঃ), জাফর এবং আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রাঃ)কে। রোমান দের লক্ষাধিক সৈন্যের বিপরীতে মুসলিম বাহিনীতে সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র তিন হাজার। মাআন নামক এলাকায় দুই রাত অতিবাহিত করার পর মুসলিম বাহিনী বালকার দিকে অগ্রসর হয়। অন্যদিকে রোমান বাহিনী হিরাক্লিয়াসের নেতৃত্বে বিশাল সেনা বহর নিয়ে এগিয়ে আসলে মুসলিম বাহিনী মুতা নামক জায়গায় সমবেত হয়। হাজার খানিক মুসলিম সৈন্য লক্ষাধিক রোমানদের বিরুদ্ধে জড়িয়ে পরে এক অকল্পনীয় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে। যুদ্ধে এগিয়ে যান যায়েদ বিন হারিস। বীরত্বের কোনও ঘাটতি রাখেন নি। পুরোদমে যুদ্ধ করে শাহাদাত বরন করেন। পরবর্তী দায়িত্ব এসে বার্তায় জাফর (রাঃ) কাছে। খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ) সহ অন্যান্যরা ব্যাস্ত ছিলেন রোমানদের উপর আক্রমণ চালিয়ে যেতে। পালাক্রমে জাফর (রাঃ) ও শাহাদাত বরন করেন। জানা যায় জাফর (রাঃ) যুদ্ধের ময়দানে ডান হাত কেটে যায়, বাঁ হাতেই লড়াই চালিয়ে গিয়েছিলেন। শাহাদাতের পর জাফর (রাঃ) শরীরে ৯০ টির মতো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল। ধর্মের জন্য ত্যাগের এমন নিদর্শন পৃথবীর ইতিহাসে বিরল। এরপর আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রাঃ) ও বীর বিক্রমে যুদ্ধ করে শহীদ হন। মুসলিম বাহিনী নেতৃত্ব শূন্য হয়ে পড়ে! তবে উপায় কী? আছেন, খালিদ বিন ওয়ালিদ আছেন। সাহাবারা পরামর্শ করে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব আরোপ করেন খালিদ বিন ওয়ালিদের উপর। ওয়ালিদের দায়িত্ব গ্রহনের পরেই শুরু হয় রোমান বাহিনীর উপর তিব্র আক্রমণ। অবশ্য একজন দক্ষ সমরবিদ হিসেবে খালিদ পূর্বের তিন জনের চেয়ে আলাদা যুদ্ধ কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি আক্রমণে পরিবর্তন আনেন ফলে পর্যদুস্ত হতে বাধ্য হয় রোমান বাহিনী। খালিদ মুসলিম বাহিনীর দুই পার্শ্বের, পিছনের এবং সামনের সৈন্যদের অবস্থান পাল্টে তিনি মধ্যভাগ থেকে আক্রমণ করেন। খালিদ বিন ওয়ালিদের প্রবল আক্রমণের মুখে রোমান বাহিনী পিছু হাটতে বাধ্য হয়। তিনি এতটাই পরাক্রম দেখান যে, “মুতা’হ যুদ্ধের দিনে আমার হাতে নয়টি তলোয়ার ভেংগেছে। এরপর আমার হাতে একটি ইয়েমেনী ছোট তলোয়ার অবশিষ্ট ছিল”।
[ স্বয়ং খালিদ বিন ওয়ালিদ রাঃ থেকে বর্নিত। ]
আবার পাল্টা আক্রমণের শিকার হয় মুসলিম বাহিনী তখন বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে বেশি সময় নেন’নি ওয়ালিদ। তিনি যুদ্ধ করতে করতে রোমান বাহিনী’কে ধিরে ধিরে মরুভূমির দিকে নিয়ে আসেন যেখানে যাওয়া মানে রোমানদের জন্য নিশ্চিত মরণ ফাঁদ হয়তো রোমানদের কবর রচিত হতো সেখানে। খালিদ বিন ওয়ালিদের এই কৌশল সম্পর্কে টের পেয়ে যায় রোমান বাহিনী আবার পিছু হাটে। এভাবেই দুই বাহিনীর নিরাপদ দূরত্ব সৃষ্টির পর মুতা'হ যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে।

❐ মহাবীর খালিদ বিন ওয়ালিদের পুরো জীবন নিয়ে বিচার বিশ্লেষণের প্রয়োজন নেই শুধুমাত্র মুতা’হ যুদ্ধের প্রেক্ষাপটই তাকে সময়ের সেরা সমর নায়কের খেতাব এনে দেয়ার জন্য যথেষ্ট।

❐জীবনের শেষ দিনগুলো,
শাহাদতবরণের তীব্র ইচ্ছে যার প্রতিটি স্পন্দনে ছিল সেই খালিদ বিন ওয়ালিদের সাভাবিক মৃত্যু যেন অনেকটাই অগ্রহণযোগ্য! এরকম সাভাবিক মৃত্যুর জন্য শেষ অব্দি যথেষ্ট আফসোস ভরা হৃদয় ছিল খালিদ বিন ওয়ালিদের। "কেনও আমার জন্য শাহাদাত নয়? শরীরের প্রতিটি ক্ষত’ই তো আঘাতের" উত্তরে ছিল আপনি আল্লাহর তরবারি আর আল্লাহর তরবারি কী যুদ্ধ ক্ষেত্রে ভাঙতে পারে! মহানায়ক খালিদের প্রস্থানে সে’দিন আরব উপদ্বীপ এক বিশ্ব বরণ্য সমরবিদ’কে হারিয়ে ছিল।

মানব সভ্যতার ইতিহাসে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ) একবার’ই এসেছিলেন আর আসবেন না তবে সৃষ্টি করে গেছেন এক অমর ইতিহাস যার জীবনের উদাহরণ যুগের পরে যুগ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কালের সাক্ষী হয়ে থাকবে আর একটি জাতি বলবে আমাদের খালিদ বিন ওয়ালিদ ছিলেন। গুটিকয়েক যুদ্ধে খালিদ বিন ওয়ালিদের সম্পৃক্ততা এবং কারণ তুলে ধরা হয়েছে বস্তুত তিনি বিশ্বখ্যাত আরও অসংখ্য যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন

লিখেছেন— Nur Ahmed