শুক্রবার, ২২ জুলাই, ২০২২

আলী ইবনে আবী তালিবের (রা.) সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

আলী ইবনে আবি তালিবের সমাধি

আলী ইবনে আবী তালিব (আরবি: علي ابن أبي طالب‎, প্রতিবর্ণী. Ali ibn Abi Talib‎ ; আনু. ১৩ সেপ্টেম্বর ৬০১ – আনু. ২৯ জানুয়ারি ৬৬১)[৫][৬] ছিলেন ইসলামের নবী মুহম্মদের চাচাতো ভাই, জামাতা ও সাহাবি যিনি ৬৫৬ থেকে ৬৬১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত খলিফা হিসেবে মুসলিম বিশ্ব শাসন করেন। সুন্নি ইসলাম অনুসারে তিনি চতুর্থ রাশিদুন খলিফা। তিনি ছিলেন আবু তালিব ইবনে আবদুল মুত্তালিব ও ফাতিমা বিনতে আসাদের পুত্র, ফাতিমার স্বামী এবং হাসান ও হোসাইনের পিতা।

পরিচিতির কারণ- জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বীরত্ব, সাহসিকতা, নেতৃত্ব, আধ্যাত্মিকতা, দার্শনিকতা, বাগ্মিতা, ন্যায়বিচার

জন্ম ও বংশপরিচয়ঃ
আলী মক্কায় কুরাইশ বংশে আনুমানিক ৬০১ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। এই বংশের দ্বায়িত্ব ছিল পবিত্র কাবার রক্ষণাবেক্ষণ করা। এই বংশের একটি শাখা হচ্ছে হাশেমি। আলীর মাতা ও পিতা উভয়েই হাশেমি বংশের ছিলেন। আলীর পিতা আবু তালিব কাবা'র প্রহরী এবং শক্তিশালী কুরাইশ গোত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা বানু হাশিমের শেখ ছিলেন৷ আলীর দাদা বনি হাশিম বংশের কিছু সদস্যসহ হানিফ ছিলেন বা উত্থানের পূর্বে একেশ্বরবাদী বিশ্বাস পদ্ধতির অনুসারী ছিলেন।তাঁর পিতা ছিলেন আবু তালিব ইবনে আবদুল মুত্তালিব এবং মাতা ফাতিমা বিনতে আসাদ।ইসলামের ইতিহাসে তিনি সর্বপ্রথম নবুয়ত ডাকে সাড়া দিয়ে মাত্র ১০ বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনিই প্রথম পুরুষ মানুষ যিনি ইসলাম ধর্মগ্রহণ করেছিলেন ও তিনি পুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম যিনি মুহাম্মাদের সাথে নামাজ আদায় করেন। বদর যুদ্ধ বিশেষ বীরত্বের জন্য মুহাম্মদ তাঁকে জুলফিকার নামক তরবারি উপহার দেন।

কুফায় গুপ্তহত্যাঃ
৪০ হিজরীর ১৯শে রমজান বা ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দের ২৭শে জানুয়ারি মসজিদে কুফায় নামাজ পড়ার সময় তিনি, খারেজী আব্দুর রহমান ইবনে মুলজাম কর্তৃক হামলার শিকার হন। তিনি নামাজে সেজদা দেওয়ার সময় ইবনে মুলজামের বিষ-মাখানো তরবারী দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হন।[৩০] আলী তার পুত্রকে নির্দেশ দেন কেউ যেন খারেজীদের আক্রমণ না করে, তার বদলে তিনি নির্দেশ দেন যে, যদি তিনি বেঁচে যান, তবে যেন ইবনে মুলজামকে ক্ষমা করে দেয়া হয়; আর যদি তিনি মারা যান, তবে ইবনে মুলজামকে যেন নিজ আঘাতের সমতুল্য একটি আঘাত করা হয় (তাতে ইবনে মুলজামের মৃত্যু হোক বা না হোক।)।[৩১] আলী হামলার দুদিন পর ২৯শে জানুয়ারি ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দে (২১শে রমজান ৪০ হিজরী) মৃত্যুবরণ করেন।

মুহম্মদের ﷺ নেতৃত্বাধীন যুদ্ধসমূহঃ

বদরের যুদ্ধঃ বদরের যুদ্ধ ২ হিজরির ১৭ রমজান মদিনার মুসলিম ও মক্কার কুরাইশদের মধ্যে সংঘটিত হয়। ইসলামের ইতিহাসে এটি প্রথম প্রধান যুদ্ধ। এতে জয়ের ফলে মুসলিমদের ক্ষমতা পূর্বের তুলনায় বৃদ্ধি পায়।

উহুদের যুদ্ধঃ উহুদের যুদ্ধ ৩ হিজরির ৭ শাওয়াল উহুদ পর্বতের সংলগ্ন স্থানে সংঘটিত হয়। মদিনার মুসলিম ও মক্কার কুরাইশদের মধ্যে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। এই দুই পক্ষের নেতৃত্বে ছিলেন যথাক্রমে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ও আবু সুফিয়ান। ইসলামের ইতিহাসে সংঘটিত প্রধান যুদ্ধসমূহের মধ্যে এটি দ্বিতীয়। এর পূর্বে ৬২৪ সালে এই দুইপক্ষের মধ্যে বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।

খন্দকের যুদ্ধঃ খন্দকের যুদ্ধ বা আহযাবের যুদ্ধ ৫ হিজরিতে সংঘটিত হয়। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। জোট বাহিনীর সেনাসংখ্যা ছিল প্রায় ১০,০০০ এবং সেসাথে তাদের ৬০০ ঘোড়া ও কিছু উট ছিল। অন্যদিকে মদিনার বাহিনীতে সেনাসংখ্যা ছিল ৩,০০০।

ফাদাক বিজয়ঃ ফাদাক বিজয় ৬২৮ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে এবং হিজরী ৭ম সনের দ্বিতীয় মাসে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

খায়বারের যুদ্ধঃ খায়বারের যুদ্ধ ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন আরবের মদিনা নগরী থেকে ১৫০ কিলোমিটার (৯৩ মা) দুরে অবস্থিত খায়বার নামক মরুভূমিতে বসবাসরত ইহুদিগণের সাথে মুসলিমগণের সঙ্ঘটিত একটি যুদ্ধ। মুসলিমদের ইতিহাস অনুসারে, মুসলিমগণ সেখানে দুর্গে আশ্রয় নেয়া ইহুদিদেরকে আক্রমণ করেছিল ।

মুতার যুদ্ধঃ মুতার যুদ্ধ (আরবি: معركة مؤتة, غزوة مؤتة‎‎) হলো মুতার প্রান্তে মুসলমান ও রোমানদের মাঝের একটি যুদ্ধ।

আল-ফুলস অভিযানঃ বনু তাই গোত্রের বিরুদ্ধে আলী ইবনে আবি তালিবের অভিযান, আগস্ট ৬৩০ খ্রিস্টাব্দ, ৯হিঃ, ইসলামী ক্যালেন্ডারের দ্বিতীয় মাসে সংঘটিত হয়। পৌত্তলিক দেবতা আল-ফুলস (আল-কুল্লুস) এর মূর্তি (মূর্তি) ধ্বংস করা।

মক্কা বিজয়ঃ ইসলামের নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) খ্রিস্টীয় ৬৩০ অব্দে রক্তপাতহীনভাবে মক্কা নগরী জয় করেন। ইতিহাসে এই ঘটনা মক্কা বিজয় নামে খ্যাত। ঐতিহাসিকদের মতে মক্কা বিজয় ইসলামের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ বিজয়। এই বিজয়ের ফলে মুসলমানদের পক্ষে আরবের অন্যান্য এলাকা বিজয় করা সহজসাধ্য হয়ে পড়ে।

হুনাইনের যুদ্ধঃ গাজওয়া এ হুনাইন নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) ও তার অনুসারীগণ কর্তৃক বেদুঈন গোত্র হাওয়াজিন ও তার উপশাখা সাকিফ এর বিরুদ্ধে মক্কা থেকে তাইফের পথে একটি রাস্তায় ৬৩০ সালে লড়াইকৃত একটি যুদ্ধ। মুসলিমদের বিজয়ের মাধ্যমে যুদ্ধটি সমাপ্ত হয়, তারা অসংখ্য গনিমতের মাল দখল করে নেয়। সূরা তওবাতে এই যুদ্ধের উল্লেখ আছে, যা কুরআনে উল্লেখিত স্বল্পসংখ্যক যুদ্ধের মধ্যে অন্যতম।

হামদান অভিযানঃ আলী ইবনে আবি তালিবের অভিযান, ইয়েমেনের জনগণকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করার জন্য ১০ হিজরি বা ৬৩১ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত হয়েছিল।

উটের যুদ্ধঃ ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দের শেষের দিকে ইরাকের বসরায় সংঘটিত হয়। এটি ইসলামের ইতিহাসের প্রথম গৃহযুদ্ধ যা উটের যুদ্ধ বা উষ্ট্রের যুদ্ধ বা (Arabic জামালের যুদ্ধ) বা (English: Battle of the Camel) নামে পরিচিত। এই যুদ্ধ ছিল ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রাঃ) এর বিরুদ্ধে তালহা-হযরতজুবায়ের (রাঃ) ও আয়েশা সম্মলিত যুদ্ধ।

সিফফিনের যুদ্ধঃ সিফিনের যুদ্ধ ছিল উটের যুদ্ধের পরে প্রথম ফিতনার দ্বিতীয় যুদ্ধ। রাশিদুন খলিফাদের চতুর্থ আলী ইবনে আবি তালিব এবং প্রথম মুয়াবিয়া এর মধ্যে লড়াই হয় বর্তমান সিরিয়ার শহর রাক্কার আশেপাশে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে সিফফিন নামক স্থানে। যুদ্ধের দুই মাসেরও বেশি সময় আগে সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে শিবির করে এবং অবশেষে ২৬ জুলাই আলীর সেনাবাহিনীতে হামলা চালানো হয় এবং যুদ্ধ ২৮ জুলাই পর্যন্ত চলে । যুদ্ধ শেষ হয় যখন সিরিয়ার সেনাবাহিনীকে উৎখাত করা হয় কিন্তু হঠাৎ করে উভয় পক্ষ সালিশির বা আলোচনার মাধ্যমে তাদের দ্বন্দ্ব নিষ্পত্তি করতে সম্মত হয়।
 
নাহরাওয়ানের যুদ্ধঃ ইসলামের প্রথম গৃহযুদ্ধের অন্যতম নাহরাওয়ানের যুদ্ধ ৬৫৮ সালের জুলাই মাসে খলিফা হযরত আলী ইবনে আবি তালিব রা: এবং মুহাক্কামা নামক বিদ্রোহী দলের মধ্যে সংঘটিত হয়। নাহরাওয়ান বাগদাদ ও হেলওয়ানের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত একটি জায়গা। এই যুদ্ধটি ছিল মাওলা আলী রা: ও আমিরে শাম মুয়াবিয়া রা: এর মাঝে সংঘটিত সিফফিনের যুদ্ধের ফল, যে যুদ্ধটি বর্শার উপর কুরআন রেখে উত্তোলন করে মধ্যস্থতা চুক্তির মাধ্যমে শেষ হয়েছিল, যা ইশারা করে আল্লাহর কিতাব দিয়ে সালিশের প্রয়োজনীয়তাকে। সে সময় একটি দল সালিশ প্রত্যাখ্যান করে, তাদের সংখ্যা ছিল বারো হাজার, নেতৃত্বে ছিল আব্দুল্লাহ বিন ওয়াহব আল-রাসেবি, তারা সে সময় তাদের বিখ্যাত স্লোগান তুলেছিল: লা হুকমা ইল্লা লিল্লাহ। তাদের উপর আলী বিন আবি তালিবের সেনাবাহিনীর বিজয়ের মাধ্যমে এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। মুহাক্কামীদের মাত্র চল্লিশ জন বেঁচে যান। মুহাক্কামীরা হল খারেজীয়তের মূল এবং এই মিল্লাতের উৎপত্তিস্থল।

বৃহস্পতিবার, ২১ জুলাই, ২০২২

রাফি ইবনে উমাইর আততাঈ রাদিআল্লাহু আনহু (মরুর দস্যু)


রাফি ইবনে উমাইর রা. মরুর বালুকণা সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞ, আর মরুর পথঘাট বিষয়েও সবচেয়ে বেশি পরিচিত।

রাফি ইবনে উমাইর রা.-কে চিনেন? জাহেলী যুগে (ইসলামের গ্রহনের পূর্বে) তিনি ছিলেন আরবের দস্যু। তার  ছিল না কোনো বাহিনী অথবা তাকে সাহায্য করার জন্য কোনো দল। নিজেকেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন নিজের সেনাবাহিনী রূপে। আরবের বিভিন্ন পরিবারের ওপর লুটপাট চালাতেন একদম একা!… দামি দামি সম্পদ ছিনতাই করে নিরাপদে ফিরে আসতেন।[১]

এ তো ছিল রাফি ইবনে উমাইর রা.-এর জাহেলী যুগের কথা…

এবার তাহলে ইসলাম গ্রহনের পরের ঘটনা শুনুন……

খলিফতুল মুসলিমিন আবু বকর রা. সেনাদল পাঠিয়েছিলেন শাম দেশে রোমান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে।[২]

মুসলিম বাহিনীকে রোমান বাহিনী প্রথমে গণনাতেই ধরেনি। কিন্তু যখন দেখল, ওই সেনাদল একের পর এক তাদের বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করে যাচ্ছে… তখন তাদের টনক নড়ল। তারা সকল শহর থেকে সেনা সাহায্য তলব করল। এভাবে আড়াই লক্ষের একটি ফৌজ  গঠন করে ফেলল!…

মুসলিম বাহিনীর সেনা সাহায্যের প্রয়োজন দেখা দিল এবং খলিফার কাছে সেনা সাহায্য চেয়ে দূত পাঠাল।[৩]

ঠিক সেদিন মদিনা থেকে খালিদ ইবনু ওয়ালিদ রা.-কে বার্তা পাঠানো হলো দ্রুত অর্ধেক সিপাহি নিয়ে শাম রণাঙ্গনে রওয়ানা হতে, তখন তিনি ছিলেন ইরাক অভিযানে পারস্য অগ্নিপূজারিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে।

খালিদ রা. পত্রপাঠ মাত্র নয় হাজার মুজাহিদকে সঙ্গে নিয়ে রওয়ানা হওয়ার প্রস্তুতি শুরু করলেন।[৪]

শামে পৌঁছানোর জন্য খালিদ রা.-এর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল রোমান বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে মুসলিম বাহিনীর সাথে মিলিত হওয়া। তিনি এই কাজের জন্য তার বাহিনীকে তলব করলে রাফি ইবনে উমাইর রা. নিজেকে করেন।[৫]

এরপর রাফি রা. তার প্রস্তুতি শুরু করে দিলেন। তিনি খালিদ রা.-এর কাছে বড়, মোটা ও বয়স্ক বিশটা উটনীর ব্যাবস্থা করতে বললেন। তাকে বিশটা উষ্ট্রী দেওয়া হলে তিনি সেগুলোকে তৃষ্ণার্ত বানালেন। খুব তৃষ্ণায় কাতর হয়ে যাওয়ার পর সেগুলোকে নিয়ে পেটভরে পানি পান করালেন। এরপর সকল উটনীর ঠোঁট কেটে দিলেন এবং রশি দিয়ে মুখ বেঁধে দিলেন, যেন যাবর কাটতে না পারে।[৬] এরপর সব উটনীর পিঠে যতটা সম্ভব পানির বোঝা চাপিয়ে দিলেন।

❝এবার সেনাদল যাত্রা শুরু করল। দ্রুতগতিতে অবিরাম চলতে থাকল। যখনই যাত্রা বিরতি করতেন, রাফি ইবনে উমাইর রা. চারটি উটনী জবাই করতেন। সেই চার উটনীর পাকস্থলী থেকে পানি নিয়ে দুধ মিশিয়ে সব ঘোড়াকে পান করান। আর সৈনিকদের খাওয়ান সেই জবাইকৃত চার উটনীর পিঠের পানি।❞

সেনাদল যখন সফরের পাঁচ দিন অতিক্রম করলেন এবং সকল পানি শেষ হয়ে গেল। সকল সেনা পিপাসায় কাতর হয়ে প্রাণ যায় যায় অবস্থা। সেই সময়ই আল্লাহর ইচ্ছায় রাফি রা. এর চোখে মারাত্মক প্রদাহ দেখা দেয়, তিনি কিছুই দেখতে পাচ্ছিলেন না।

নিরুপায় হয়ে খালিদ রা. রাফি ইবনে উমাইর রা.-কে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত করেন। রাফি রা. বললেন, ❝চারদিকে তাকিয়ে দেখুন, দুই স্তনের মতো আকৃতির দু'টি পাহাড় দেখতে পাওয়া যায় কি না?❞

খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা. চতর্দিকে তাকিয়ে দেখে বললেন— “হ্যা, রাফি… ওইতো আছে, ওইখানে দেখা যাচ্ছে।”[৭]

রাফি রা. বললেন— “ওই দুই পাহাড়ের মাঝে একটি ‘আওসাজ’ গাছ আছে। বেগুন গাছের মতো কাঁটাযুক্ত। সেই গাছ খুঁজে বের করুন।”[৮]

সবাই মিলে খুঁজলেন কিন্তু কেউ আওসাজ গাছটি খুঁজে বের করতে পারলেন না।

রাফি রা. বললেন, “বোকার দল, গাছটি এখানেই আছে। যেভাবেই হোক খুঁজে বের করতেই হবে। যদি বের করতে না পারো, তাহলে তোমরাও মরবে আমাকেও মারবে।”

এরপর পুরো বাহিনী আরও গভীরভাবে দেখতে লাগলেন। কিছুক্ষনপর মধ্যেই পেয়ে গেলেন আওসাজ গাছের সন্ধান। সকলে সমস্বরে চিৎকার করে আল্লাহু আকবার বলে উঠলেন। রাফি ইবনে উমাইর রা. বললেন, ‘ওই গাছের গোড়ায় মাটি খনন করো।’

সবাই মিলে খনন করল.… তার নিচ থেকে স্বচ্ছ-নির্মল, সুমিষ্ট পানির ঝরনাধারা বেরিয়ে এল। সকলেই খুশিতে তাকবির-তাহলীল ধ্বনি দিতে থাকল। [৯]

খালিদ রা. অবাক হয়ে গেলেন যে, রাফি রা. এখানে পানি থাকার সম্ভবনা কী করে অনুমান করলেন! তার প্রশ্নের উত্তরে রাফি রা. জানালেন যে, ‘আমি শৈশবে একবারই আমার বাবা-মায়ের সঙ্গে এ পথ দিয়ে গিয়েছি। তখন এই গাছের নিচে একটি ঝরনা প্রবাহিত ছিল।’[১০]

সবাই তৃপ্তি সহকারে পানি পান করে সামনে অগ্রসর হলেন। পঞ্চম দিন সহিহ সালামতে এই মৃত্যুর বিভীষিকাময় প্রান্তর পাড়ি দিয়ে এমন নিঃশব্দে শাম সীমান্ত অতিক্রম করলেন যে, শত্রুপক্ষের কানে টুঁ শব্দও পৌছুল না।[১১]

খালিদ ইবনু ওয়ালিদ রা. শাম পৌঁছেই রোমানদের কয়েকটি শহর জয় করেন।[১২] অবশেষে রোমানদের সাথে ১ম ইয়ারমুকের যুদ্ধে বিজয় মুসলিমদের পদচুম্বন করে। যা ছিল রোমানদের সাথে মুসলিমদের ঐতিহাসিক যুদ্ধ। এই যুদ্ধে রোমান বাহিনীর সৈন্য ছিল দুই লক্ষ চল্লিশ হাজার (২ লক্ষ ৪০ হাজার)।

যুদ্ধটি ছিল উমার ফারুক রা.-এর শাসনামলে সংঘটিত প্রথম যুদ্ধ এবং আবু বকর সিদ্দিক রা.-এর ইনতিকালের ৬ দিন পর।[১৩]

তথ্যসূত্রঃ

[১] সাহাবায়ে কেরামের ঈমানদীপ্ত জীবন রা., ড. আবদুর রহমান রাফাত পাশা, খ.২ পৃ.৪৫৩-৪৫৪;

[২] মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস বিশ্বকোষ, খ.২, পৃ.২১৬, ২১৯, ৪৩৯; https://www.ihistory.pro/search-event.php?search-event-id=22

[৩] প্রাগুক্ত, পৃ.২২০;

সাহাবায়ে কেরামের ঈমানদীপ্ত জীবন রা., ড. আবদুর রহমান রাফাত পাশা, খ.২ পৃ.৪৫৮-৪৫৯;

[৪] প্রাগুক্ত, পৃ.২২০, ৪৩৯;

https://www.ihistory.pro/search-event.php?search-event-id=24

সাহাবায়ে কেরামের ঈমানদীপ্ত জীবন গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী সৈন্য সংখ্যা ছিল দশ হাজার।

[সাহাবায়ে কেরামের ঈমানদীপ্ত জীবন রা., ড. আবদুর রহমান রাফাত পাশা, খ.২ পৃ.৪৫৯]

[৫] সাহাবায়ে কেরামের ঈমানদীপ্ত জীবন রা., ড. আবদুর রহমান রাফাত পাশা, খ.২ পৃ.৪৬০;

মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস বিশ্বকোষ গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী খালিদ রা. নিজেই তাকে রাহবার নিযুক্ত করেছিলেন।

[মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস বিশ্বকোষ, খ.২, পৃ.২২০]

[৬] এখানে কেউ যেন মনে না করে উটগুলোর উপর জুলুম করা হয়েছে। কেননা রোমানদের বিরুদ্ধে লড়াইরত মুসলিম বাহিনী ছিল সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় এবং তাদের সাহায্যের জন্য রোমান বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে যাওয়ার জন্য মরুভূমির পথ ধরা ছিল অনিবার্য। আর সেখানে বাঁচতে হলে কৌশল অবলম্বনের বিকল্প নেই। আর যদি সত্যিকার অর্থে জুলুম করাই হতো তাহলে মুসলিম বাহিনীতে থাকা বিশিষ্ট সাহাবায়ে কেরাম তার বিরোধীতা করত।

[৭] সাহাবায়ে কেরামের ঈমানদীপ্ত জীবন রা., ড. আবদুর রহমান রাফাত পাশা, খ.২ পৃ.৪৬৩;

মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস বিশ্বকোষ গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী রাফি রা. নিজেই কাফেলাকে একথা বলছিলেন এবং সেখানে পাহাড়ের কথা উল্লেখ করা হয়নি। শুধু গাছের কথা এসেছে।

[মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস বিশ্বকোষ, খ.২, পৃ.২২১]

[৮] প্রাগুক্ত, পৃ.৪৬৩;

মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস বিশ্বকোষ গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী রাফি রা. গাছটির নাম উল্লেখ না করে বলেছেন, 'গাছটি দেখতে দূর থেকে মানুষ বসে আছে বলে মনে হবে।'

[মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস বিশ্বকোষ, খ.২, পৃ.২২১]

[৯] প্রাগুক্ত, পৃ.৪৬২-৪৬৪;

[১০] মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস বিশ্বকোষ, খ.২, পৃ.২২১;

সাহাবায়ে কেরামের ঈমানদীপ্ত জীবন রা. গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী রাফি রা. নিজেই একথা বলেছেন।

[সাহাবায়ে কেরামের ঈমানদীপ্ত জীবন রা., ড. আবদুর রহমান রাফাত পাশা, খ.২ পৃ.৪৬৪]

[১১] আল-কমিল ফিত তারিখ, ইবনু আসির রহ., ১৩ হিজরি শিরোনামের অধীনে।

[সূত্রে মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস বিশ্বকোষ, খ.২, পৃ.২২১ টী.২]

[১২] মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস বিশ্বকোষ, খ.২, পৃ.২২২;

https://www.ihistory.pro/search-event.php?search-event-id=26

[১৩] প্রাগুক্ত, পৃ.২৩৮-২৪৩;

https://www.ihistory.pro/search-event.php?search-event-id=29

লিখেছেন—   রিদওয়ান নাবিল

বুধবার, ২৯ জুন, ২০২২

খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ) সংক্ষিপ্ত পরিচয়

যার তলোয়ারের উত্থানে উদিত হয়েছিল মুসলিম বাহিনীর বিজয়ের আদিত্য।

কুস্তি, তরাবারি চালনা, উঠের উপর থেকে ধু ধু মরুর প্রান্থে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ার ক্ষিপ্ত কৌশল রপ্ত করা নিয়ে প্রাথমিক জীবন শুরু হয়েছিল খালিদের। যুদ্ধ থেকে যুদ্ধ, যৌবনের দিনলিপি গুলো আক্রমণ আর পাল্টা আক্রমণে দারুণ ভাবে গুছানো ছিল। যার শৈশব কৈশোর কেটেছে ঝড় তুফানে তার বাঁধভাঙা যৌবন কী মহাপ্লাবন’কে উপেক্ষা করতে পারে? খালিদ বিন ওয়ালিদ ঠিক যেন এমনই, উহুদ থেকে মুতা'র যেখানেই যুদ্ধ অংশ নিতে ভূলে যাননি। সময়ের ব্যবধানে পক্ষ পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু কৌশল আজীবন অপরিবর্তিত ছিল। রণকৌশলের অনন্য সুনিপুণ সব যোগ্যতা তাকে সময়ের সেরা সমর নায়ক,যুদ্ধ বিজেতা আর ‘সাইফুল্লাহ’ বা আল্লাহর তরবারিতে পরিণত করেছিল।

শুরুর দিকে,
খালিদের জন্ম হয়েছিল আনুমানিক ৫৯০–৫৯৩ খ্রীঃ তৎকালীন মক্কার এক অভিজাত পরিবারে। পিতা ছিলেন বনি মখযুম গোত্রের প্রধান আল ওয়ালিদ। তদানীন্তন আরব অভিজাতদের চিরাচরিত রীতি অনুযায়ী জন্মের পর শিশু ওয়ালিদকে রেখে আসা হয় দুধ মাতার দায়িত্বে। যারা ছিল মরুবাসী বেদুইন। মক্কার রুক্ষ শুষ্ক আবহাওয়ায় ঠিকে থাকার লড়াইয়ের হাতেখড়ি হয়েছিল অল্পবয়সেই। ৪/৬ বয়সেই নিজ গোত্রে চলে আসেন খালিদ। পরিবার বিত্তশালী হওয়ার দরুন আয় রোজগার নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন পড়েনি ওয়ালিদ পুত্রের। হয়তো এই অদৃশ্য সুযোগ খালিদ বিন ওয়ালিদের একজন মহাবীর হওয়ার যাত্রাকে তরান্বিত করেছিল। যুদ্ধের দুর্দান্ত সব কলা-কৌশল অর্জনে নিজের ধ্যান,জ্ঞান সপে দিয়েছিলেন ওয়ালিদ। যার ফল পেতেও বেশি বেগ পেতে হয়নি। স্বল্প সময়ে মক্কার কুরাইশদের মধ্যে নিজের সুদৃঢ় অবস্থান পাকাপোক্ত করে ফেলেন খালিদ বিন ওয়ালিদ। নিজেকে পরিনত করেন মক্কার কুরাইশদের দুর্ধর্ষ যোদ্ধা আর বাবার সুযোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে।

❐ মহাবীর খালিদ বিন ওয়ালিদ(রাঃ) ইসলাম ধর্ম গ্রহণ পূর্ববর্তী মক্কা,মদিনা–
তৎকালীন আরবের সমসাময়িক অনেক ঘটনা খালিদ বিন ওয়ালিদের জীবনের গতিবিধির উপর নিখুঁত প্রভাব ফেলেছিল। উল্লেখ্য মদিনাবাসী আর মক্কার কুরাইশ দের মধ্যে সংঘাত ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। যার প্রেক্ষিতে কুরাইশদের জনমনে মদিনার প্রতি আক্রমনাত্নক মনোভাব সহজাত হয়ে উঠেছিল।

কিন্তু কেন?
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) কর্তৃক মক্কায় ইসলামের প্রচার এবং প্রসারকে কুরাইশরা কখনো মেনে নেয়নি আর সহজভাবে গ্রহণ ও করেনি। তবে, তার সুনির্দিষ্ট অনেক কারন ছিল প্রথমত, কুরাইশরা মোহাম্মদ (সাঃ)কে নিছক ধর্ম প্রচারক মনে করতো না বিশেষ করে কুরাইশ নেতারা। তারা মহানবী সাঃ এবং উনার অনুসারীদের বিপ্লবী হিসেবে ধারণা পোষন করত। কুরাইশরা মুসলিম দের উত্থানকে নিজেদের ক্ষমতার জন্য হুমকি মনে করেছিল যার দরুন তারা মুসলিম দের ব্যাপারে ভীত ছিল।
মোহাম্মদ (সাঃ) এবং উনার অনুসারীরা কুরাইশ দের তিব্র নির্যাতনের মুখে মক্কা’কে ইসলাম প্রচারের জন্য সুবিধাজনক করে তুলতে পারেন নি। ফলসরুপ ইয়াসরিব বাসীর আমন্ত্রনে এবং ইয়াসিরিবে ধর্ম প্রচারের সর্বাপেক্ষায় অনুকূলতা পেয়ে সেখানে মহানবী সাঃ হিজরত করেন। মহানবী (সাঃ) পদচারণে ততোদিনে ইয়াসরিব পরিনত হয় "মদিনাতুন্নবি" বা নবীর শহরে। একজন বিচক্ষণ নেতা হিসেবে মদিনার সনদের মাধ্যমে মোহাম্মদ সাঃ নিজেকে আসিন করেন মদিনার সর্বোচ্চ ক্ষমতায়। মদিনা রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে খুব স্বল্প সময়ে।

মুসলিমদের তুমুল জনপ্রিয়তা, ক্ষমতা, গ্রহণ যোগ্যতা আর অগ্রগতি পৌত্তলিক’তায় বিশ্বাসী মক্কার কুরাইশ নেতাদের ঈর্ষান্বিত করে তুলে এবং মদিনার মতো গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানের অধিপত্যে মুসলিমদের কখনো সহ্য করেনি কুরাইশ’রা । যার ফলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুসলিম বাহিনী বাধ্য হয় কুরাইশ দের সাথে বদর, উহুদ আর খন্দকের যুদ্ধে লড়তে। তখন'ও খালিদ বিন ওয়ালিদ মুসলিম দের বিপক্ষে ছিলেন অস্র ব্যবহার করেছেন মুসলিম দের বিরুদ্ধেই।

❐ উহুদের যুদ্ধে খালিদ।
উহুদের প্রান্তে সেদিন খালিদ বিন ওয়ালিদের আকস্মিক আক্রমণ কোনটাসা করে ফেলে মুসলিম বাহিনী’কে। হতবাক মুসলিম বাহিনী উহুদের ময়দানে স্বয়ং সাক্ষী হয় এক অকুতোভয় রণ-শৈলী’র। মাস খানিক আগে মুসলিম বাহিনীর মাত্র ৩১৩ জন সৈন্যের সাথে বদর যুদ্ধে পরাজয়ের স্বাধ পায় কুরাইশ'রা। বদরে নিহত হন কুরাইশ নেতা আবু জেহেল। পরাজয়ের গ্লানি আর মদিনার উঠতি প্রভাব দিনের পর দিন শংকিত করে তুলে মক্কার কুরাইশ দের। যার অনিবার্য পরিণতি গড়ায় উহুদের যুদ্ধে।

আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে থাকা ৩০০০ কুরাইশ সৈন্যের বিপরীতে মোহাম্মদ (সাঃ) ১০০ জন বর্মধারী ৫০ জন তীরন্দাজ সহ মোট ১০০০ সৈন্য নিয়ে উহুদ উপত্যকার উদ্দেশ্য যাত্রা শুরু করেন।
পথিমধ্যে মহানবী (সাঃ) সাথে থাকা বিশ্বাস ঘাতক আব্দুল্লাহ বিন উবাই তার ৩০০ জন সৈন্য নিয়ে মুসলিম বাহিনী’কে প্রত্যাখ্যান করে। শেষমেশ মুসলিম বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা দাঁড়াল ৭০০ জনে।
উল্লেখ্য আব্দুল্লাহ বিন উবাই কখনো মদিনার ক্ষমতায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) এবং উনার অনুসারীদের সহ্য করে নি।
মাত্র ৭০০ জন সৈন্য নিয়ে কুরাইশ দের ৩০০০ বাহিনীর মোকাবিলার জন্য অগ্রসর হন মোহাম্মদ (সাঃ) অবশেষে মুসলিম বাহিনীর পাশের গিরিপথ পাহারা দেয়ার জন্য মোহাম্মদ (সাঃ) আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়েরের নেতৃত্বে ৫০ জন তীরন্দাজ নিযুক্ত করেন এবং আদেশ জারি করেন পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত গিরিপথ ত্যাগ না করার।
যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকে মুসলিম বাহিনী ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন করে এবং কুরাইশ বাহিনী যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে পলায়ন শুরু করে। অপরদিকে যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর জয় প্রায় নিশ্চিতের আশংকায় গিরিপথরক্ষীরা জয়ের আনন্দে কুরাইশদের পরিত্যক্ত ধনসম্পদ সংগ্রহের জন্য রাসুল(সাঃ) নির্দেশনার পরোয়া না করেই গিরিপথ ত্যাগ করে।
কিন্তু তখনও কুরাইশ বাহিনীর হয়ে ময়দানে ছিলেন খালিদ বিন ওয়ালিদ। অরক্ষিত গিরিপথ দিয়ে মুসলিম বাহিনীর উপর পিছনের দিক থেকে আচমকা ঝাপিয়ে পড়েন খালিদ। আতর্কিত হামলায় মুসলিম বাহিনী বিপর্যস্থ হয়ে পরে । মহানবী (সাঃ) আহত হয়ে জ্ঞান হারান এবং পতাকাবাহী মুজাহিদ মুসাব,হামজা (রাঃ) সহ অসংখ্য সাহাবী শাহাদাত বরন করেন। হঠাৎ যুদ্ধের ময়দানে গুজব উঠে মোহাম্মদ (সাঃ) নিহত হয়েছেন । এই অনিশ্চিত আনন্দে আপ্লূত হয়ে খালিদ বিন ওয়ালিদের কুরাইশ বাহিনী যুদ্ধের ময়দান থেকে মদিনা দখল না করেই মক্কা ফিরে যায়। সেদিনকার ফলাফল অমিমাংসিত থাকলেও খালিদ বিন ওয়ালিদের যুদ্ধের সাথে কৌশলের মিমাংসা ঠিকই হয়েছিল।

❐ ইসলাম ধর্মে খালিদ বিন ওয়ালিদ।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) আরব উপদ্বীপে ইসলামের যে বটবৃক্ষ রোপন করেছিলেন তার সু-শীতল ছায়াতলে ঠাই হয়েছে এমন দিগ্বিজয়ী বীরদের হয়তো গুনে শেষ করা যাবে না। তবে অসংখ্য অগনিতের মধ্যে খালিদ ছিলেন একের ভিতর অনেক।
যেই পাল আরব থেকে যাত্রা শুরু করেছিল উমর, আলীর ন্যায় সেই পালে হাওয়া দিতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেন’নি খালিদ বিন ওয়ালিদ। হুদায়বিয়ার পর মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর চিন্তা চেতনাকে গভীর ভাবে অনুদাবন করতে পেরেছিলেন তিনি । আসলে খালিদ বিন ওয়ালিদ কুরাইশদের পৌত্তলিক’তাকে অতটা হৃদয়ে ধারণ করতেন না। অনেক রাজনৈতিক সমীকরণ উপেক্ষা করে খালিদ বিন ওয়ালিদ ও চলে আসেন ইসলামের পতাকা’তলে। আর ইসলাম তাকে আমুল পাল্টে দেয়। পরবর্তী কালে খালিদ পরিণত হয়েছিলেন ইসলামের শক্তিশালী হাতিয়ারে। আপাতদৃষ্টিতে খালিদের ইসলাম গ্রহণ অতি শীঘ্র মনে হলেও এটা ছিল খালিদ বিন ওয়ালিদের ইসলামের উপর দীর্ঘ দিনের অনুসরণের ফল।

❐ মুতা’হ যুদ্ধের বীর সেনানী খালিদ বিন ওয়ালিদ।
খালিদ বিন ওয়ালিদ ততোদিনে মুসলিম বাহিনীর একজন সুযোগ্য সৈনিক। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) প্রায়ই আশেপাশের বিভিন্ন অঞ্চলে মদিনা থেকে বিভিন্ন গোত্র প্রধানদের কাছে দূতের মাধ্যমে ইসলামের বাণী লিখে চিঠি পাঠাতেন। একদিন চিঠি পাঠানো হল বুসরার গাসসান গোত্র প্রধানের কাছে। কিন্তু চিঠি যথাস্থানে পৌছে নি! খবর এলো বার্তাবাহক’কে পথিমধ্যে আক্রান্ত করা হয়েছে। রোমান সম্রাটের শুরাহবিল বিন আমর নামের এক প্রতিনিধি সেই বার্তাবাহক’কে ধরে নিয়ে যায় এবং শারীরিক নির্যাতন সহ তাকে হত্যা করে। সেই সময় দূত হত্যাকে চরম অপমানজনক এবং অসৌজন্যমূলক আচরণ বলে ভাবা হতো সাথে যুদ্ধ আহ্বানের সাংকেতিক চিহ্ন হিসেবে বিবেচনা করা হতো। যা পরবর্তীতে মুসলিম বাহিনী’কে মুতা’হ যুদ্ধে উষ্কে দেয়। অসাধারণ সব গুনাবলি থাকা স্বত্তেও খালিদ খুব সাধারণ সৈন্যের ন্যায় মুতা'হ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ইতিপূর্বে মহানবী (সাঃ) একেকজনের মৃত্যুর পর সেনাপ্রধান হিসেবে নির্বাচিত করে দেন যায়েদ বিন হারিস (রাঃ), জাফর এবং আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রাঃ)কে। রোমান দের লক্ষাধিক সৈন্যের বিপরীতে মুসলিম বাহিনীতে সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র তিন হাজার। মাআন নামক এলাকায় দুই রাত অতিবাহিত করার পর মুসলিম বাহিনী বালকার দিকে অগ্রসর হয়। অন্যদিকে রোমান বাহিনী হিরাক্লিয়াসের নেতৃত্বে বিশাল সেনা বহর নিয়ে এগিয়ে আসলে মুসলিম বাহিনী মুতা নামক জায়গায় সমবেত হয়। হাজার খানিক মুসলিম সৈন্য লক্ষাধিক রোমানদের বিরুদ্ধে জড়িয়ে পরে এক অকল্পনীয় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে। যুদ্ধে এগিয়ে যান যায়েদ বিন হারিস। বীরত্বের কোনও ঘাটতি রাখেন নি। পুরোদমে যুদ্ধ করে শাহাদাত বরন করেন। পরবর্তী দায়িত্ব এসে বার্তায় জাফর (রাঃ) কাছে। খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ) সহ অন্যান্যরা ব্যাস্ত ছিলেন রোমানদের উপর আক্রমণ চালিয়ে যেতে। পালাক্রমে জাফর (রাঃ) ও শাহাদাত বরন করেন। জানা যায় জাফর (রাঃ) যুদ্ধের ময়দানে ডান হাত কেটে যায়, বাঁ হাতেই লড়াই চালিয়ে গিয়েছিলেন। শাহাদাতের পর জাফর (রাঃ) শরীরে ৯০ টির মতো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল। ধর্মের জন্য ত্যাগের এমন নিদর্শন পৃথবীর ইতিহাসে বিরল। এরপর আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রাঃ) ও বীর বিক্রমে যুদ্ধ করে শহীদ হন। মুসলিম বাহিনী নেতৃত্ব শূন্য হয়ে পড়ে! তবে উপায় কী? আছেন, খালিদ বিন ওয়ালিদ আছেন। সাহাবারা পরামর্শ করে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব আরোপ করেন খালিদ বিন ওয়ালিদের উপর। ওয়ালিদের দায়িত্ব গ্রহনের পরেই শুরু হয় রোমান বাহিনীর উপর তিব্র আক্রমণ। অবশ্য একজন দক্ষ সমরবিদ হিসেবে খালিদ পূর্বের তিন জনের চেয়ে আলাদা যুদ্ধ কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি আক্রমণে পরিবর্তন আনেন ফলে পর্যদুস্ত হতে বাধ্য হয় রোমান বাহিনী। খালিদ মুসলিম বাহিনীর দুই পার্শ্বের, পিছনের এবং সামনের সৈন্যদের অবস্থান পাল্টে তিনি মধ্যভাগ থেকে আক্রমণ করেন। খালিদ বিন ওয়ালিদের প্রবল আক্রমণের মুখে রোমান বাহিনী পিছু হাটতে বাধ্য হয়। তিনি এতটাই পরাক্রম দেখান যে, “মুতা’হ যুদ্ধের দিনে আমার হাতে নয়টি তলোয়ার ভেংগেছে। এরপর আমার হাতে একটি ইয়েমেনী ছোট তলোয়ার অবশিষ্ট ছিল”।
[ স্বয়ং খালিদ বিন ওয়ালিদ রাঃ থেকে বর্নিত। ]
আবার পাল্টা আক্রমণের শিকার হয় মুসলিম বাহিনী তখন বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে বেশি সময় নেন’নি ওয়ালিদ। তিনি যুদ্ধ করতে করতে রোমান বাহিনী’কে ধিরে ধিরে মরুভূমির দিকে নিয়ে আসেন যেখানে যাওয়া মানে রোমানদের জন্য নিশ্চিত মরণ ফাঁদ হয়তো রোমানদের কবর রচিত হতো সেখানে। খালিদ বিন ওয়ালিদের এই কৌশল সম্পর্কে টের পেয়ে যায় রোমান বাহিনী আবার পিছু হাটে। এভাবেই দুই বাহিনীর নিরাপদ দূরত্ব সৃষ্টির পর মুতা'হ যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে।

❐ মহাবীর খালিদ বিন ওয়ালিদের পুরো জীবন নিয়ে বিচার বিশ্লেষণের প্রয়োজন নেই শুধুমাত্র মুতা’হ যুদ্ধের প্রেক্ষাপটই তাকে সময়ের সেরা সমর নায়কের খেতাব এনে দেয়ার জন্য যথেষ্ট।

❐জীবনের শেষ দিনগুলো,
শাহাদতবরণের তীব্র ইচ্ছে যার প্রতিটি স্পন্দনে ছিল সেই খালিদ বিন ওয়ালিদের সাভাবিক মৃত্যু যেন অনেকটাই অগ্রহণযোগ্য! এরকম সাভাবিক মৃত্যুর জন্য শেষ অব্দি যথেষ্ট আফসোস ভরা হৃদয় ছিল খালিদ বিন ওয়ালিদের। "কেনও আমার জন্য শাহাদাত নয়? শরীরের প্রতিটি ক্ষত’ই তো আঘাতের" উত্তরে ছিল আপনি আল্লাহর তরবারি আর আল্লাহর তরবারি কী যুদ্ধ ক্ষেত্রে ভাঙতে পারে! মহানায়ক খালিদের প্রস্থানে সে’দিন আরব উপদ্বীপ এক বিশ্ব বরণ্য সমরবিদ’কে হারিয়ে ছিল।

মানব সভ্যতার ইতিহাসে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ) একবার’ই এসেছিলেন আর আসবেন না তবে সৃষ্টি করে গেছেন এক অমর ইতিহাস যার জীবনের উদাহরণ যুগের পরে যুগ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কালের সাক্ষী হয়ে থাকবে আর একটি জাতি বলবে আমাদের খালিদ বিন ওয়ালিদ ছিলেন। গুটিকয়েক যুদ্ধে খালিদ বিন ওয়ালিদের সম্পৃক্ততা এবং কারণ তুলে ধরা হয়েছে বস্তুত তিনি বিশ্বখ্যাত আরও অসংখ্য যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন

লিখেছেন— Nur Ahmed

ওমর রা. সংক্ষিপ্ত পরিচয়


কোমলতার কিংবা কঠোরতা, ন্যায়ের পথে অবিচল আর অন্যায়ের প্রতি আপোষহীন, সহজ সরলতা’র সাথে  বিচক্ষণতা এ-সবের অনন্য সমন্বয় তার চরিত্রে এনে দিয়েছিল সমুচিত এক অনবদ্য জীবন শৈলী।
ভদ্র প্রকৃতির তবে সিদ্ধান্তে দৃঢ়চিত্ত, ক্ষমাশীল কিন্তু  অতটা নয়, তুমুল ক্ষমতা আর জনপ্রিয়তা অথচ  অনাড়ম্বর’তা দেখে টের পাওয়া বেশ দুর্বোধ্য। সম্মান, সম্পদ, ক্ষমতা আর খ্যাতি কী ছিলনা, উচ্চ পদমর্যাদা আর বিত্তশালী জীবনযাত্রার সব উপাদান। এত্ত সবের মধ্যে খুব সাধারণ জীবন যাপন – যেখানে শাসক শ্রেণী থেকে  প্রজা,ধনী কিংবা গরিব উঁচু নিচু সবার সাথে মিশে যাওয়া যায়! হ্যা, তিনি এরকম জীবন অতিবাহিত করতে পেরেছিলেন! তিনি গতানুগতিক কেউ নন আর দশ জন শাসকের চেয়ে আলাদা  তদানিন্তন অর্ধ্ব পৃথিবীর অধিপতি মুসলিম জাহানের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব। 

❐শুরুর দিকে, 

যুদ্ধাংদেহী মনোভাব, বীরত্ব, রুক্ষতা আর আক্রমণাত্নক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্য শুরু থেকেই কোরাইশদের কাছে যেনো  উমরের জুড়ি মেলা ভার, তবে তার সুনির্দিষ্ট আরেকটি কারণ’ও  আছে,  তখনকার  মক্কায় হাতেগোনা যে কয়জন শিক্ষিত ছিলেন তাদের মধ্যে উমর একজন! তিনি শুধু শিক্ষিত’ও নন সাথে আরবের একজন নামজাদা কুস্তিগির’ও! উনার ক্ষেত্রে এক মহা ব্যাপার স্যাপার’ই ভাবা যায়। 

শিক্ষিত হওয়ার মতো দুর্লভ গুনাবলির জন্য কোরাইশদের কাছে খ্যাতি অর্জনে দিন গুনতে হয়নি উমরের। 

আনুমানিক ৫৮০–৫৮৩ খ্রিষ্টাব্দের দিকে মক্কার বিখ্যাত কুরাইশ বংশের বনু আদি গোত্রে জন্ম নেন উমর। পিতা খাত্তাব ইবনে নুফাইল এবং মাতা হানতামা। জন্মের পর বাবা মা তাকে ‘হাফস’ বলেই ডাকতেন। কোরাইশদের মধ্যে পিতা ইবনে নুফাইলের অবস্থান বেশ সুদৃঢ় থাকার পাশাপাশি মাতা হানতামা ছিলেন বিখ্যাত সেনাপতি হিসাম ইবনে মুগিরা’র কন্যা। 

তরবারি চালনার কৌশল, এর মাঝে  ব্যাবসা বানিজ্যে মনযোগ কিংবা হঠাৎ কবিতা প্রীতি সাথে  কুস্তি খেলায় নিজের তবিয়ত টিকিয়ে রাখা পক্ষান্তরে মক্কার অলিগলি’তে দাপুটে পদচারণা এসবের মধ্যেই ছিলেন উমর। তেজস্বী ব্যাক্তিত্ব, অগ্নি ঝরানো বাগ্নী’তা, বজ্র কন্ঠের এক মল্লযুদ্ধবিশারদ বিকল্পে একজন পুরোদস্তর বণিক! অনেকের মতে উমরের প্রাথমিক জীবনের এই বর্ণিল রুপ পরবর্তী কালে তার দীর্ঘ  যাত্রাকে অনেকাংশেই সুগম করেছিল। 

❐ ইসলাম ধর্মে উমর 

অনেকটা খামখেয়ালি ভাবেই দিন যাচ্ছিল উমরের একদিন পথিমধ্যে  শুনলেন কে যেনো বাপ দাদার ধর্মে চুনকালি মেরে নতুন ধর্ম নিয়ে  আবির্ভাব হয়েছে! 
কে সে? উত্তরে নাম আসলো— মোহাম্মদ! 

কসম তরবারি উন্মুক্ত করে যাচ্ছি মোহাম্মদ’কে হত্যা না করে ফিরব না! 

কিন্ত যাত্রাপথে বাধার সম্মুখিন হলেন; শুনলেন নিজের বোন ফাতিমা এবং বোনের স্বামী সাঈদ  ইসলাম গ্রহণ করেছেন। উমর এই উদ্ভট খবর শুনে মুহাম্মদ থেকে ফিরে গেলেন! রাগান্বিত হয়ে ওই দুই জনের বাড়ির দিকে চলে গেলেন এবং প্রচন্ড প্রহার করে ইসলাম বিমুখ করার আপ্রাণ চেষ্টা করলেন কিন্তু ব্যার্থ হলেন। ইসলাম ধর্মের উপর ফাতিমা এবং সাঈদের অবিচল মনোভাব উমর’কে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে উদ্ভুদ্ধ করেছিল বলে মনে করা হয়। 
(সংক্ষেপিত) [ইতিহাসে মতবেদ রয়েছে] 

ইসলাম ধর্ম গ্রহণে এবং ইসলাম প্রচারে উমরের নীতি ছিল প্রকাশ্য। ইসলামের পতাকা’তলে আসার পর ভূষিত হয়েছিলেন ‘ফারুক’ উপাধিতে।  
উমরের ইসলাম ধর্মে দীক্ষা আর অবিশ্বাস্য পরিবর্তন হতবাক করে দিয়েছিল কোরাইশ’দের। ফলশ্রুতিতে উমর কোরাইশ’দের কাছে মক্কা বিজয়ের আগ অব্দি ছিলেন এক অপ্রতিরোধ্য বিদ্রোহী। 

❐ মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত, কিন্তু কেন? 

উমরের ইসলাম গ্রহণের পর মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাঃ এবং উনার অনুসারী’রা পবিত্র মক্কা ভূমিতে সর্ব সাধারণের কাছে প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করলে কোরাইশ’রা তাদের উপর জোড়ালে আক্রমণ আরও বাড়িয়ে দেয়। হামজা, আলী আর উমরের মতো বীর যোদ্ধাদের ইসলামের ছায়াতলে সমাগম’কে কোরাইশ’রা কখনো সহজ ভাবে নেয় নি। যার ভীতি তাদের আর’ও উষ্কে দেয় মুসলিম দের বিরুদ্ধে।  কোরাইশ দের তিব্র নির্যাতনের মুখে মুসলিম’রা বাধ্য হয় মক্কা ভূমি ত্যাগ করতে। 

মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাঃ এর সিদ্ধান্তে  মদিনায় হিজরতের ধারাবাহিকতায় সাহাবী’রা মক্কা ছাড়তে শুরু করেন। 

হিজরতের সময় অন্যান্য সাহাবা’রা যখন কোরাইশ অধ্যুষিত “মক্কা” গোপনে ত্যাগ করে’ও পার পাচ্ছিলেন না তখন উমর নাকি প্রকাশ্যে বলে গিয়েছিলেন  ”কেউ যদি তার মাকে সন্তানহারা এবং স্ত্রীকে বিধবা করতে চায়, সে যেন আমাকে বাধা দিতে এগিয়ে আসে”। আরব উপ–দ্বীপে ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রারম্ভিক ক্ষণে উমরের ন্যায় বিপজ্জনক কাজে উদ্যমী হয়তো আর কেউ ছিলেন না যে গুণ তাকে শুরু থেকেই অনন্য করে তুলেছিল! 

❐ খলিফা হযরত উমর। 

ততো দিনে কেটে গেছে অনেক গুলো বছর স্ব–শরীরে অংশ নিয়েছেন ইসলামের অনেক গুলো যুদ্ধে। ইসলাম প্রতিষ্ঠায় নিজের মেধা,শ্রম,শক্তি,সম্পদ ঘাম আর রক্ত যাই বলেন  সবই উজাড় করে দিয়েছেন। ইসলাম’কে দেয়ার বেলায় বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেন নি,  ছিলেন  ইসলামের প্রতি এক নিবেদিত প্রান। 

খিলাফতের ধারাবাহিকতায় চলে গেছে হজরত আবুবকর রাঃ শাসনামল। ওসমান, আলী সহ সাহাবা’দের সর্বসম্মতি ক্রমে খিলাফতের পরবর্তী গুরুদায়িত্ব আসে উমরের কাধে। ফলশ্রুতিতে উমর ইবনুল খাত্তাব  উপবিষ্ট হন ইসলামের ইতিহাসে খুলাফায়ে রাশেদিনের দ্বিতীয় খলিফা হিসেবে। 

আমর ইবনে আল আস, সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস, আবু ওবায়দা আর খালিদ বিন ওয়ালিদের মতো অদম্য যোদ্ধাদের নিয়ে ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে দীর্ঘ দশ বছর দোর্দণ্ড প্রতাপে পারস্য আর রোমের মতো সাম্রাজ্য’কে গুটিয়ে দিয়ে  ইসলামি সাম্রাজ্য’কে এক শক্ত ভিত্তির উপর  প্রতিষ্ঠা করে গেছেন খলিফা উমর। 

❐ পারস্য বিজয়ের নেপথ্যে উমর ইবনুল খাত্তাব। 

আজকের দিনের ইরাক তখনো পারস্য সাম্রাজ্যের অধিনে যদি বলেন ভৌগলিক কারন তবে, মুসলিম দের এই অঞ্চলে প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা অবশ্যম্ভাবী’ই ছিল তবে এর ব্যুৎপত্তি অতটা সহজ ছিল না। 

পারস্য সাম্রাজ্যের সাথে মুসলিম দের বিরোধ অনেক আগ থেকেই মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাঃ এর দূতকে তাচ্ছিল্য কিংবা আবুবকরের আমলে মুসলিম সাম্রাজ্যে বিদ্রোহীদের উস্কানি, রাজনৈতিক অর্থনৈতিক কিংবা ভৌগলিক সব গুলো কারণ’ই সমান ভাবে তরুণ মুসলিম সাম্রাজ্যে’কে পরবর্তী কালে পারস্যের বিরুদ্ধে অনেক গুলো যুদ্ধে ঠেলে দিয়েছিল। 

আদতে,
পারস্য বিজয় ছিল অনেক গুলো যুদ্ধের যোগফল 
সকল যুদ্ধে উমরের বাহিনী নিরন্তর বিজয়ের স্বাধ পায়নি....। তবে বিচ্ছিন্ন বিজয়ের তৃপ্তি’ও কম ছিলেনা, মুসান্নার নেতৃত্বে বুওয়ায়েবের যুদ্ধে বিজয় মুসলিম দের এনে দিয়েছিল বিস্তৃত ভূভাগ, সাদ বিন আবি ওয়াক্কাসের নায়কতায় কাদেসিয়ার যুদ্ধে মুসলিম দের ত্রিশ হাজার সৈন্যের বিপরীতে এক লক্ষের বেশি সৈন্য নিয়ে পরাজয়ের স্বাধ পায় রুস্তমের পারস্য বাহিনী। 
ফলশ্রুতি’তে টাইগ্রিস নদীর পশ্চিম তীর অব্দি চলে আসে উমরের দাপট। উল্লেখ্য কাদেসিয়ার যুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমে পারস্য সাম্রাজ্যে’কে এক প্রকার পঙ্গু  করে দিয়েছিলেন উমর। 

উমরের যুদ্ধ বিজয়ের ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠিত হয় কুফা ও বসরার মতো বিশ্বখ্যাত নগরী। 

❐জেরুজালেম বিজয়–

জর্ডান, সিরিয়া, জেরুজালেম আর নীল নদের তীরবর্তী মিশরের বিশাল বেলাভূমি ছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অধীনে। নিজেদের পবিত্র নগরী কিংবা চিরচেনা বাণিজ্য কেন্দ্র দখলে থাকা মানেই বিশেষ কিছু, হয়তো এরকম কোনও স্বপ্ন উমর’কে তাড়া করেছিল, আর সীমান্ত সংঘর্ষের সুরাহা সে তো স্বপ্ন নয় প্রয়োজন’ও বটে। উমরের পদক্ষেপ সময়ের ব্যাপার ছিল মাত্র। উমর দেখতে পেতেন তার যোদ্ধারা আত্নপ্রত্যয়ে টইটুম্বুর উনি দেখতেন আবু ওবায়দা’কে, আমর ইবনে আল আস’কে, খালিদ বিন ওয়ালিদ’কে, সুরাহ বিল’কে যেনো একঝাঁক সিংহ ! আদেশ আরোপ করলেই পাহাড় গুড়িয়ে দেবে, সাগরের ঢেউ রুখে দেবে মহাপ্লাবন ফিরিয়ে দেবে। ইয়ারমুকের যুদ্ধ, সিরিয়া’য় অভিযান, জর্ডান বিজয়, জেরুজালেম অধিকার এসবের ব্যাতিক্রম ছিল না! জানা যায় ইয়ারমুকের যুদ্ধে মুসলিম  বাহিনীর প্রায় তিন হাজার সৈন্য শাহদত বরণ করেন এবং রোমানদের এক লক্ষের কাছাকাছি সৈন্য নিহত হয়। বিজয় অভিযানের ক্রমিকে উমর ইবনুল খাত্তাব লেবানন, আলেপ্পো আর এন্টিওক নিজের হস্তগত করে নেন। এদিকে আমর, মসজিদ আল আকসার শহর  জেরুজালেম অবরুদ্ধ করে বসেন উপায়ন্তর না পেয়ে তখনকার শাসক আত্নগোপন করেন এবং জেরুজালেমের প্রধান ধর্ম যাজক সফ্রেনিয়াস স্বয়ং উমরের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করার প্রশ্নে আত্নসমর্পণের শর্ত জুড়ে দেন। খবর পৌছে গেল উমরের কানে, যে জেরুজালেমের জনগন সরাসরি খলিফার কাছে ক্ষমতা অর্পণ করতে চায়, খবর পেয়েই উমর  ছুটলেন জেরুজালেমের পাণে সে তো শহর নয় একটা স্পন্দন একটা অনুভূতি যে অনুভূতি স্মৃতি কাতরতার। একজন পরিচারকের সাথে উট নিয়ে রওনা হলেন, খানিকটা পথ অতিক্রমের পর উট থেকে নেমে পরিচারক কে বললেন তুমি ওঠো আমি উট  টেনে নিয়ে যাচ্ছি, ক্লান্ত হওয়ার পর আবার উঠলেন, পালাক্রমে জেরুজালেম পৌছানোর আগে পরিচারক ছিল উটের পিঠে, হতবাক সবাই সাক্ষী হলো এক অহংবোধ হীন শাসকের! তিনিই এখন, জেরুজালেমের অধিপতি অথচ নেই কোন জাকজমক পূর্ন আয়োজন আহ, ! কি সাদামাটা জীবন শৈলী! সফ্রেনিয়াস বাকরুদ্ধ,ইনিই বুঝি এদের খলিফা! শহরে ঢুকে’ই  সাধারণ ক্ষমা ঘোষনা করলেন উমর ইবনুল খাত্তাব। ঘুরে দেখলেন পুরো শহর। জানা যায়, সফ্রেনিয়াস নাকি নিজেদের গির্জায় উমর রাঃ’কে নামাজের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন কিন্তু উমর তা আর পড়েন নি উনি বলেছিলেন আমি যদি এখানে নামাজ পড়ি মুসলিম’রা পরবর্তী কালে এই গির্জা গুড়িয়ে দিয়ে মসজিদ বানিয়ে ফেলতে পারে । তাই অন্যথায় পড়বেন। হতবাক সফ্রেনিয়াস সেদিন সাক্ষী হয়েছিলেন এক ইতিহাস খ্যাত মহানুভবতার। 

❐ জীবনের শেষ দিন গুলো – 

৬৪৪ সালের এক ভোরে মসজিদে নববীতে ফজরের নামাজের ইমামতি’তে থাকা অবস্থায় পারস্যের এক আততায়ী’র হাতে ছুরির আঘাতে শাহাদাত বরণ করেন উমর ইবনুল খাত্তাব। বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি হয়েও ভোগবিলাস আর আড়ম্বরতা’কে উপেক্ষা করে গেছেন উমর। পরেছেন তালিযুক্ত জামা। ইসলামী সাম্রাজ্যের  দুঃসময়ে আধারে আলো’র মশাল হয়ে পথ দেখিয়ে গেছেন আজীবন । 

উমর রাঃ জীবনের গুটিকয়েক গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরার চেষ্টা করেছি বস্তুত উনার জীবনের পরিসংখ্যান আরো বিশাল এই কয়েক লাইনে হয়তো কখন’ও সম্ভব নয়। 

লিখেছেন— Nur Ahmed