শুক্রবার, ২৯ জুলাই, ২০২২

ইবনে আল-নাফিস বা ইবনুন নাফিসের পরিচয় ও কৃতিত্ব | Ibn al-Nafis


হৃদযন্ত্রে রক্ত সঞ্চালন তত্ত্ব আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে একটি মৌলিক ও যুগান্তকারী আবিষ্কার। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সংজ্ঞা অনুযায়ী পালমনারি সঞ্চালন মানে হলো হৃদযন্ত্রের ডান প্রকোষ্ঠ থেকে শিরার মধ্য দিয়ে ফুসফুসে রক্ত চলাচল করা এবং ফুসফুসে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন গ্রহণ করার পর শিরার মধ্য দিয়ে হৃদযন্ত্রের বাম প্রকোষ্ঠে পুনরায় রক্ত ফিরে যাওয়া। হৃদযন্ত্রে রক্তপ্রবাহের এ আবিষ্কার হচ্ছে বিখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানী ইবনুল নাফিসের অমর কীর্তি।

তিনিই প্রথম ব্যক্তি গ্যালেন স্কুলের দীর্ঘকাল ধরে চলা বিতর্ককে চ্যালেন্জ করেছিলেন যে, কার্ডিয়াক ইন্টারভেন্ট্রীকুলার দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হতে পারে।

এর সাথে মিল রেখে তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে বাম ভেন্ট্রীকেলে পৌছানো সমস্ত রক্ত ফুসফুসের মধ্যে দিয়ে রায়।

ইবনে আল-নাফিসের ডান দিকের (পালমোনারি) সঞ্চালন সম্পর্কিত কাজ উইলিয়াম হার্ভের পরবর্তী কাজের (১৬২৮) পূর্বের। উভয় তত্ত্বই সঞ্চালন ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। ২য় শতাব্দীর গ্রীক চিকিৎসক গ্যালেনের রক্তসংবহনতন্ত্রের শারীরবিদ্যা সম্বন্ধে তত্ত্বটি ইবন আল-নাফিসের কাজ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন ছিল, যার জন্য তাকে "সংবহনতন্ত্রের জনক" বা "সংবহন শারীরবৃত্তির জনক" হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

উনাকে নিয়ে গবেষণা কম হওয়ার কারণ- তার জীবনী সম্পর্কে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। জানা যায় যে, তাঁর সমসাময়িক অন্য এক বিজ্ঞানী ইবনে আবি উসায়বিয়া মুসলিম স্কলারদের জীবনী লেখে খ্যাতি অর্জন করলেও ঈর্ষাবশত তাঁর নাম উল্লেখ করেন নি।

পুরোনাম:
আলাউদ্দিন আবুল হাসান আলী ইবনে আবিল হাজম ইবনুল নাফিস আল কোরাইশি আল মিসরি আশশাফি। সংক্ষেপে তিনি ‘ইবনুল নাফিস’ নামেই সর্বাধিক পরিচিত।

জন্ম:
তিনি ১২১৩ সালে ৬০৭হিজরী মোতাবেক দামেস্কের কারাশিয়ার নামের একটি গ্রামে আরব পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

জ্ঞানার্জন:
ইবনু নাফিস তার প্রাথমিক জীবন দামেস্কে অতিবাহিত করেন।

এরপর ১৬ বছর বয়সে তিনি দামেস্কের নুরি হাসপাতালে দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে ডাক্তারি পড়া শুরু করেন, যা দ্বাদশ শতাব্দীতে তুরস্কের বাদশাহ নুরউদ্দিন জেনগি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

মহাজজিব উদ্দীন আদ খাওয়ারের নিকট তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানে এত ব্যুপত্তি লাভ করেন যে, তাৎকালীন সময়ে তাঁর সমকক্ষ আর কেউ ছিল না।

তিনি বিখ্যাত দামাসিন চিকিৎসক ইবনে আবি উসাইবিয়ার সাথে সমসাময়িক ছিলেন এবং তারা দুজনেই দামেস্কের একটি মেডিকেল স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা আল-দাখওয়ার কাছে শিক্ষা গ্ৰহণ করেছিলেন।

বর্ণঢ্যময় কর্মজীবন:
১২৩৬ সালে ইবনে আল-নাফিস তার কয়েকজন সহকর্মীর সাথে আইয়ুবিদ সুলতান আল-কামিলের অনুরোধে মিশরে চলে যান। ইবনে আল-নাফিস সালাহউদ্দিন আইয়ুবী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত আল-নাসেরি হাসপাতালে প্রধান চিকিৎসক হিসেবে নিযুক্ত হন।
সেখানে তিনি বেশ কয়েক বছর চিকিৎসা শিক্ষা ও অনুশীলন করেন।

তার অন্যতম উল্লেখযোগ্য ছাত্র ছিলেন বিখ্যাত খ্রীষ্টান চিকিৎসক ইবনে আল-কাফ। ইবনে আল-নাফিস আল-মাসরুরিয়া মাদরাসায় আইনশাস্ত্রও পড়াতেন। অন্যান্য পণ্ডিতদের মধ্যে তাঁর নাম পাওয়া যায়, যা দ্বারা বোঝা যায় যে তিনি ধর্মীয় আইনের অধ্যয়ন এবং অনুশীলনে  কতটা অভিজ্ঞ ছিলেন।

ইবনে নাফিস তার জীবনের অধিকাংশ সময় মিশরে অতিবাহিত করেন।

বাগদাদের পতন ও মামলুকদের উত্থান এজাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলীর সাক্ষী ছিলেন।

একসময় সুলতান বায়বার্স এর ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এমনকি তিনি কায়রোর প্রধান চিকিৎসক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

পরবর্তী জীবনে, যখন তার বয়স ৭৪ বছর, তখন ইবনে আল-নাফিসকে নবপ্রতিষ্ঠিত আল-মানসোরি হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসক হিসেবে নিযুক্ত করা হয় যেখানে তিনি আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

চিকিৎসাশাস্ত্রে খ্যাতি অর্জনের কারণে তিনি বিপুল অর্থের মালিক হয়েছিলেন। কায়রো শহরের প্রাণকেন্দ্রে তাঁর জন্য নির্মিত করা হয়ছিল একটি বিলাসবহুল প্রাসাদ। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি তাঁর প্রাসাদ, বিশাল সম্পত্তি ও মূল্যবান গ্রন্থরাজি সুলতান আলাউদ্দিন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত (১২৮৪) মনসুরী হাসপাতালে দান করে যান।

চিকিৎসা বিজ্ঞানে অবদান:
চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই মুসলিম বিজ্ঞানীর (Muslim Scientist) নাম স্মরণীয় হয়ে আছেন রক্ত চলাচল সম্পর্কে তৎকালীন প্রচলিত মতবাদের বলিষ্ঠ প্রতিবাদ এবং এর সম্পর্কে নিজের নতুন মতবাদের প্রকাশ করার মাধ্যমে। মানবদেহে বায়ু ও রক্ত সঞ্চালনের ব্যবস্থা আবিস্কারের জন্য বিখ্যাত ছিলেন ইবনে নাফিস।

তিনি ফুসফুস এবং হৃৎপিন্ডের এনটামি নিয়ে আলোচনা করেন । ইবনে সিনা এ্যারিস্টটলের মতবাদের সাথে একমত করে হৃৎপিন্ডের ৩টি হৃৎপ্রকোষ্ঠ রয়েছে বলে যে মত প্রকাশ করেছেন। তিনি তাঁর তীব্র প্রতিবাদ করেন । এ্যারিস্টটল মনে করতেন যে, দেহের পরিমাণে অনুসারেই হৃৎপ্রকোষ্ঠর সংখ্যার কম বেশী হয় তিনি এই মতকে ভুল বলে প্রমাণ করেন । তাঁর মতে হৃৎপিন্ডে মাত্র দু’টো হৃৎপ্রকোষ্ঠ আছে । একটা থাকে রক্তে পরিপূর্ণ এবং এটা থাকে ডান দিকে আর অন্যটিতে থাকে জীবনতেজ, এটা রয়েছে বাম দিকে। এ দু’য়ের মধ্যে চলাচলের কোন পথই নেই । যদি তা থাকত তাহলে রক্ত জীবনতেজের জায়গায় বয়ে গিয়ে সেটাকে নষ্ট করে ফেলত ।

হৃৎপিন্ডের এনাটমি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ইবনুন নাফিস যুক্তি দেখান যে, ডান দিকের হৃৎপ্রকোষ্ঠে কোন কার্যকরী চলন নেই এবং হৃৎপিন্ডকে মাংসপেশীই বলা হউক বা অন্য কিছুই বলা হউক তাতে কিছু আসে যায় না।

তিনি মানবদেহে রক্তসঞ্চালন পদ্ধতি, ফুসফুসের সঠিক গঠন পদ্ধতি, শ্বাসনালী, হৃদপিন্ড, শরীরে শিরা উপশিরায় বায়ু ও রক্তের প্রবাহ ইত্যাদি সম্পর্কে গবেষণা করে চিকিৎসা বিজ্ঞানের জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছেন।

রক্ত চলাচল সম্বন্ধে তৎকালীন প্রচলিত গ্যালেনের মতবাদকে ভুল প্রমাণিত করে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ১৩০০ শতাব্দীতে বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন কে এই বিখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানী (Muslim Scientist)।বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞানে এ মতবাদটি সম্পূর্ণ বিজ্ঞান সম্মত বলে গৃহীত হলেও ইবনুন নাফিসকে বিজ্ঞান জগতে স্বীকৃতি দেয়া হয় না।  

শ্বাসনালির অভ্যন্তরীণ অবস্থা, মানবদেহে বায়ু ও রক্তপ্রবাহের মধ্যে ক্রিয়া-প্রক্রিয়ার কিভাবে ঘটে, ফুসফুসের নির্মাণ কৌশল সম্পর্কে গবেষণা করে আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রকে সমৃদ্ধ করেছেন।

ইবনে নাফিসের (Ibn Al Nafis) এ যুগান্তকারী আবিষ্কার আধুনিক ও বিজ্ঞান সম্মত। কিন্তু ছয় শতাব্দী ধরে তাঁর এই মতবাদ সম্পর্কে আমাদের অন্ধকারে রেখেছিল। বর্তমানে এই গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ আবিষ্কারক হিসেবে সম্মান দেয়া হয় সতের শতকের বিশিষ্ট ইংলিশ চিকিৎসাবিদ উইলিয়াম হার্ভকে। অথচ হার্ভের জন্মের ৩০০বছর পূর্বে আরব বিজ্ঞানী ইবনে নাফিস এই থিওরি আবিস্কার করে। মিশরের বিখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞানী ১৯২৪ সালে তার ডক্টরেট অভিসন্দর্ভে ইবনে নাফিসের উক্ত আবিষ্কারের কথা তুলে ধরেন।

অন্যান্য বিষয়ে অবদান:
চিকিৎসা ছাড়াও, ইবনে আল-নাফিস আইনশাস্ত্র, সাহিত্য এবং ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন করেছিলেন। তিনি শাফিঈ মাযহাবের আইনশাস্ত্রের একজন  বিশেষজ্ঞ ছিলেন।

ব্যক্তি জীবনে সুন্নাহর অনুসরণকারী ইবনে নাফিস ধর্ম ও দর্শন পারস্পরিক সম্পর্কিত বিষয় বলে মত প্রকাশ করেন। দর্শন বিষয়ে তিনি মৌলিক গ্রন্থও প্রণয়ন করেন। মুসলিম সভ্যতার পতন রোধের উদ্দেশ্যে ইবনে নাফিস তরুণদেরকে সুন্নতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর অনুসরণ করতে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেন এবং তিনি সুন্নতে রাসূল-এর অন্তর্ভুক্ত আচরণসমূহের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রদান করেন। 

এই সময়ই তিনি রচনা করেন আরবী সাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রথম দিকের মৌলিক উপন্যাস ‘‘আল রিসালাহ  আল কামিল ফি- সিরাতিল নবী’’। 

তার নিজের বৈজ্ঞানিক এবং দার্শনিক মতবাদের প্রকাশ করাও এই উপন্যাস রচনার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। তিনি ১২৬৮ থেকে ১২৭৭ সালের মধ্যে এই গ্রন্থ রচনা করেন। এই গ্রন্থটির নামের অর্থ হচ্ছে ‘‘নবীর সিরাত বা জীবন-এর উপর কামিলের রচনা বা থিসিস। গ্রন্থটি রিসালায়ে ফাদিল বিন নাতিক নামেও পরিচিত।

ইবনে বিভিন্ন শাস্ত্র বিশেষত শরীরবিদ্যা
ও মনোবিজ্ঞান বিষয়ে তার গবেষণার ফলাফল এবং বিভিন্ন বিজ্ঞান বিষয়ে তার মতামত ও এই বইটির মাধ্যমে প্রকাশ করেন। তিনি এই উপন্যাসে প্রমান করতে চেষ্টা করেন যে, মানুষের মন যুক্তি ও বিশ্লেষণের সাহায্য প্রাকৃতিক। দার্শনিক ও ধর্মীয় সার সত্যকে আবিষ্কার করতে পারে।

ইবনে নাফিসের এই উপন্যাস প্রাথমিক কল্পবিজ্ঞান (সায়েন্স ফিকশন) বিষয়ক রচনার একটি অন্যতম উদাহরণ। এই উপন্যাসে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সত্যকে তার কাল্পনিক ব্যবহার দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ইবনে নাফিস তার এই রচনাটিকে বলেছেন ইসলামকে বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিগতভাবে রক্ষার চেষ্টা।

ইবনে নাফিস ছিলেন ইসলামি সভ্যতা ও বিজ্ঞানের একজন প্রধান বিশেষজ্ঞ। বিজ্ঞান বিশেষত শরীরবিজ্ঞান বিষয়ে তিনি ছিলেন প্রথম আধুনিক গবেষক যার গবেষণা এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব কিছু ছাড়াও তিনি পৃথিবীর অন্যতম প্রথম এবং প্রথম মুসলিম সাইন্স ফিকশন রচয়িতা হিসেবেও চির স্মরণীয়।

রচনাবলী:
তার বইগুলির মধ্যে সবচেয়ে বড় বই হল আল-শামিল ফি আল-তিব (মেডিসিনের উপর বই), যা ৩০০টি খন্ড সমন্বিত একটি বিশ্বকোষ হওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। যাইহোক, ইবনে আল-নাফিস তার মৃত্যুর আগে মাত্র ৮০টি প্রকাশ করতে সক্ষম হন এবং কাজটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এই সত্য সত্ত্বেও, কাজটি একজন ব্যক্তির দ্বারা লিখিত সর্ববৃহৎ চিকিৎসাশাস্ত্রে বিশ্বকোষগুলির মধ্যে একটি হিসাবে বিবেচিত হয় এবং এটি তৎকালীন ইসলামী বিশ্বের চিকিৎসা জ্ঞানের সম্পূর্ণ সারসংক্ষেপ দেয়। ইবনে আল-নাফিস তার সমস্ত লাইব্রেরির সাথে তার বিশ্বকোষ দান করেন মনসুরি হাসপাতালে যেখানে তিনি তার মৃত্যুর আগে কাজ করেছিলেন।

সময়ের সাথে সাথে, বিশ্বকোষের বেশিরভাগ খন্ড হারিয়ে গেছে অথবা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে মাত্র ২টি খণ্ড এখনও মিশরে বিদ্যমান রয়েছে। মিশরীয় পণ্ডিত ইউসেফ জিদান এই কাজের বিদ্যমান পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ ও পরীক্ষা করার একটি প্রকল্প শুরু করেছিলেন যা ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার, বডলিয়ান গ্রন্থাগার এবং স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘লেন মেডিকেল গ্রন্থাগার’ সহ বিশ্বের অনেক গ্রন্থাগারে তালিকাভুক্ত করা আছে।

তিনি হাদীসশাস্ত্রের উপরও কয়েকখানা ভাষ্য লেখেন । এছাড়া তিনি আরো বহু গ্রন্থ রচনা করেন । যেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে –  ‘আল্ মুখতার মিনাল আগজিয়া (মানবদেহে খাদ্যের সম্বন্ধে), ‘আল কিতাবুল মুহাজ ফিল কুহল (চক্ষু রোগ সম্বন্ধে), ‘শারহে মাসায়েলে ফিত, তিব্ব’, ‘তারিকুল ফাসাহ’, ‘মুখতাসারুল মানতেক’ প্রভৃতি।

ইবনে নাফিস কর্তৃক রচিত বাইশটি গ্রন্থের নাম জানা যায়। তাছাড়াও অন্যান্য রচনাবলীর মধ্যে রয়েছে-
১. আল-শামিল ফি আল-তিব্ব (Al-Shamil fi Al-tibb)
২. শারহ তাশরিন আল-কানুন (Sharh Tashrih al-Qanun)
৩. ন্যাচার অফ ম্যান (Nature of Man)
৪. এন্ডামিক (Endemics)

এছাড়া তিনি কয়েকটি ব্যাখ্যাগ্রন্থও রচনা করেন। চিকিৎসা, ভাষাতত্ত্ব ও আইন বিষয়কগ্রন্থ। তবে তাঁর রক্ত চলাচল বিষয়ে সুত্রের আবিষ্কার তাঁকে বিজ্ঞান জগতে সু-প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছে।

মৃত্যু:
তিনি ৬৮৭ হিজরী মোতাবেক ১২৮৮ খ্রীঃ কায়রোতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন । তাঁকে সুস্থ করে তোলার প্রায় সকল চিকিৎসাই ব্যর্থ হয়ে যায় । অবশেষে মৃত্যু শয্যায় তাঁর মিসর ও কায়রোর চিকিৎসক বন্ধুরা তাঁর রোগের প্রতিষেধক হিসেবে তাঁকে মদ পান করতে অনুরোধ করেন । মদ পান করলেই তাঁর রোগ সেরে যাবে বলে তাঁরা পরামর্শ দেন । কিন্তু তিনি এক ফোঁটা মদ পান করতেও রাজি হলেন না । তিনি বন্ধুদেরকে উত্তর দিলেন, “আমি আল্লাহ পাকের দরবারে চলে যেতে প্রস্তুতি নিচ্ছি । আমি চিরদিন এ নশ্বর পৃথিবীতে থাকতে আসিনি । আল্লাহ আমাকে যতটুকু ক্ষমতা দিয়েছেন আমি চেষ্টা করেছি মানুষের কল্যাণে কিছু করে যেতে । বিদায়ের এ লগ্নে শরীরে মদ নিয়ে আল্লাহ পাকের দরবারে উপস্থিত হতে আমি চাই না ।”
অতঃপর ৬৮৭ হিজরীর ২১শে জিলকদ মোতাবেক ১২৮৮ খ্রীষ্টাব্দের ১৮ই ডিসেম্বর রোজ শুক্রবার সকালে এ মহামনীষী ইন্তেকাল করেন । মৃত্যুকালে তিনি তাঁর একমাত্র বাড়িটি এবং তাঁর সমস্ত বইপত্র মনসুর হাসপাতালে দান করে যান ।

তথ্য সুত্র:

1:ইনকিলাব
3: কালের কণ্ঠ ১৫-২-২০২২
3:Numan, Mohammed T. (২০১৪-১০-০১)। "Ibn Al Nafis: His Seminal Contributions to Cardiology"। Pediatric Cardiology
4: উইকিপিডিয়া

লিখেছেন— Raqib Hussain

বুধবার, ২৭ জুলাই, ২০২২

মুয়াল্লিম আল-ফারাবি | Abu Nasr Al-Farabi | Alpharabius


পৃথিবীতে মুসলমানদের উন্নতির জন্য মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আশীর্বাদ হিসেবে যুগে যুগে যে সকল মুসলিম বিজ্ঞানী ও দার্শনিককে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন আল ফারাবি তাদের অন্যতম।

জন্ম:
তার পূর্ব পুরুষগণ ছিলেন পারস্যের অধিবাসী। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ ও রাজনৈতিক কারণে তার পূর্ব পুরুষগণ পারস্য ত্যাগ করে তুর্কিস্থানে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

আবু নসর আল ফারাবী আনুমানিক  ৮৭২, মতান্তরে ৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে তুর্কিস্তানের অন্তর্গত 'ফারাব' নামক শহরের নিকটবর্তী 'আল ওয়াসিজ' নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

নাম:
মুসলিম বিজ্ঞানী ও দার্শনিক আল ফারাবির আসল নাম আবুনাসের মোহাম্মদ ইবনে ফারাখ আলফারাবি।
আল ফারাবির পিতা ছিলেন উচ্চ শিক্ষিত এবং সেনাবাহিনীর একজন উচ্চ পদস্ত কর্মকর্তা।

জ্ঞানার্জন:
তিনি প্রাথমিক শিক্ষা নিজ এলাকা ফারাবেই সম্পন্ন করেন।অত:পর তিনি বুখারারার কাজি নিযুক্ত হন।

ঘটনা বৈচিত্র্য তাঁর জীবন ছিল পরিপূর্ণ।জ্ঞান সাধনার অদম্য বাসনা নিয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্যে তিনিবাগদাদ গমন করেন।  তিনি সেখানে প্রায় ৪০ বছর ধরে অধ্যায়ন ও গবেষণা চালিয়ে যেতে থাকেন। জ্ঞানের অন্বেষণে তিনি ছুটে গিয়েছেন দামেস্কে, মিসরে এবং দেশ-বিদেশের আরও বহুস্থানে।

কয়েকটি ভাষার উপর তিনি পূর্ণ দখল অর্জন করেন।মুসলিম সমাজের একেবারে প্রথম দিককার মনিষীদের মধ্যে আল ফারাবি একজন, যিনি জ্ঞানার্জনের জন্য খ্রিস্টান মিশনারি কিংবা ভারতবর্ষের আর্য বা হিন্দুদের সাথে অনেক সময় কাটিয়েছেন।

বর্ণাঢ্যময় কর্মজীবন:
তিনি জ্ঞান বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায়  পারদর্শী ছিলেন। তবে দার্শনিক বিজ্ঞানী হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছাড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। জ্ঞানের সন্ধানে তিনি ছুটি গিয়েছেন দামেস্কে, দেশ-বিদেশের আরো অনেক স্থানে পদার্থবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, দর্শন, যুক্তিশাস্ত্র, গণিতশাস্ত্র, চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রভৃতিতে তিনি উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। মূলত দর্শন ও বিজ্ঞানে তাঁর অবদান সর্বাধিক। পদার্থ বিজ্ঞানে তিনি শূন্যতার অবস্থান প্রমাণ করেছিলেন। তিনি বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক হিসেবে আরোহন করেছিলেন জ্ঞানের শীর্ষে।তিনি সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন, যুক্তিশাস্ত্র প্রভৃতি বিষয়ে বহু রচনা লিখেছেন। তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় শতাধিক।তবে এ সকল অমূল্য অধিকাংশ গ্রন্থের সন্ধান মেলেনি। পদার্থবিজ্ঞানে তিনি শূন্যতার অবস্থান প্রমাণ করেছিলেন ।

বিভিন্ন শাস্ত্রে অবদান:

দর্শন:
প্লেটো ও এরিস্টটলএর দর্শনের উপর তিনি বিস্তর আলোচনা করেছেন। প্লেটোর রিপাবলিক-এর মত তিনিও একটি আদর্শ রাষ্ট্র-এর কল্পনা করেছেন তার আদর্শ নগর গ্রন্থে।

মধ্যযুগের দার্শনিকগণ, কী মুসলিম কী খ্রিস্টান, সকলেই নিজের ধর্ম দ্বারা ভীষণভাবে প্রভাবিত ছিলেন। সহজ করে বলতে গেলে তাদের নিকট দর্শন মানেই ছিল ধর্মীয় দর্শন।কিন্তু আল ফারাবি এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসেন।

তিনি স্রষ্টার সর্বাধিপত্য স্বীকারের পাশাপাশি সৃষ্টিকেও শাশ্বত বলে মনে করতেন। তিনি কোন চরম মত পোষণ করতেন না এবং চিন্তার ক্ষেত্রে পরস্পর-বিরোধী মতকে প্রায়শই একসাথে মিলাবার চেষ্টা করেছেন।  তিনি ধর্ম আর দর্শনের মাঝে তফাৎ স্পষ্ট করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সৃষ্টিকর্তা মানুষকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ করেছেন জ্ঞান-বুদ্ধিতে উৎকর্ষ সাধনের জন্যই। 

রাষ্ট্র দর্শন:
তার সময়ে মুসলিম দার্শনিকদের মধ্যে রাজনীতি অনীহার যে রোগ ছিল তা থেকেও মুক্ত ছিলেন আল ফারাবি। তিনি বেশ রাজনৈতিক সচেতন ছিলেন এবং রাজনৈতিক দর্শন নিয়েও কাজ করেছেন।

আদর্শ নগর-এ তার রাষ্ট্রনায়ক-এর একনায়ক বৈশিষ্ট্য প্রকট। তার মতে রাষ্ট্রের প্রধান রাষ্ট্রের সর্বৈব ক্ষমতা পোষণ করবেন এবং অন্য সবাই তার বাধ্য থাকবেন। নাগরিকদের ক্ষমতায়ও থাকবে শ্রেণী বিভাজন, যেখানে কোনো শ্রেণী তার উপরের শ্রেণীর আদেশ মান্য করবে ও নিচের শ্রেণীর উপর আদেশ জারী করবে। তৎকালীন বহুধাবিভক্ত সামন্ততান্ত্রিক সমাজকে এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর আওতায় আনতে এই রাষ্ট্র দর্শন প্রভাব বিস্তার করে এবং সময়ের বিচারে এরূপ ভাবধারা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

আদর্শ রাষ্ট্রের নেতার ক্ষেত্রে প্লেটো যেমন ‘ফিলসফার কিং’ এর কথা বলেছিলেন, ফারাবি এখানে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ইমাম বা ধর্মীয় নেতার কথা বলেছেন। তার মতে একজন ইমামই সকল ভালো-মন্দের পার্থক্য সঠিকরূপে বুঝতে পারেন এবং রাষ্ট্র সঠিকভাবে পরিচালনা করতে সক্ষম হবেন। তিনি হযরত মুহাম্মদ (সা) এর সময়ের মদিনা শহরকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পণ্য নগরের উদাহরণ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

আদর্শ রাষ্ট্রকে তিনি অসম্ভব উল্লেখ করলেও এটি অর্জনের জন্য মানুষের চিরন্তন প্রচেষ্টাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করেন। মুসলিম মিল্লাতে তার অবদান অনস্বীকার্য।


যুক্তিশাস্ত্র:

যুক্তিশাস্ত্রে আল ফারাবি অ্যারিস্টটলীয় পন্থা অবলম্বন করলেও তিনি অ্যারিস্টটলের বাইরে গিয়েও অনেক কিছু আলোচনা করেছেন। তিনি ‘কন্ডিশনাল সিলোজিজম’ বা শর্তাধীন অনুমান এবং ‘অ্যানালজিক্যাল ইন্টারফিয়ারেন্স’ বা সাদৃশ্যমূলক হস্তক্ষেপ (যুক্তিশাস্ত্রের কিছু পদ্ধতি) নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেন। তিনি অ্যারিস্টটলের কাজের উপর বেশ কিছু টীকাও লেখেন। আল-ফারাবীর মতে, যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনে তেমন কোন পার্থক্য নেই। বরং দর্শন হল উচ্চতর যুক্তিবিদ্যা।

রচনাবলী:
আল ফারাবি দর্শন, ধর্মতত্ত্ব,রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি, চিকিৎসা, যুক্তিশাস্ত্র,পদার্থ বিজ্ঞান,সমাজ বিজ্ঞান,সঙ্গীত,গণিত,
ফালসাফা প্রভৃতি বিষয়ে শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেন।তবে বিজ্ঞান ও দর্শনে তার অবদান ছিল সর্বাধিক। পদার্থ বিজ্ঞানে তিনিই “শূন্যতার” অবস্থান প্রমাণ করেছিলেন। দার্শনিক হিসেবে ছিলেন নিউ প্লেটনিষ্টদের পর্যায়ে বিবেচিত।

তিনি সর্বপ্রথম ইসলামী তর্কশাস্ত্র ও ইসলামী বিশ্বকোষ রচনা করেন।

তাঁর রচিত গ্রন্থে পীথাগোরাস, হিরোক্লিটাস, সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল, থিও ফ্রিসটাস, অ্যারিস্টিপাস, ডাইওজেনিস, ইপিকিউরিয়ান, স্টোয়িক প্রমুখ দার্শনিকের উদ্ধতি ও ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। আল-ফারাবী একজন সত্যের সন্ধানী দার্শনিক ছিলেন। তিনি অতি সাবধানে তাঁর দর্শনগ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর দর্শনে ধর্মতাত্ত্বিক মতবাদের প্রকাশ নেই।

তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হচ্ছে:
১: আল মদীনাতুল ফাজীলা
২: আল মদীনাতুল মাদানিয়া
৩: জাওয়ামিনুস সিয়াসাত
৪: ইজতিমাউ মাদানিয়া
৫: খাওয়ামি নেয়ামত
৬: কিতাব আল মুসিকি আল কবির (দ্য গ্রেট বুক অব মিউজিক)
৭: কিতাব ইহসা আল উলুম (দ্য ইন্ট্রোডাকশন টু নলেজ)
৮: কিতাব ইহসা আল ইকাআত (ক্লাসিফিকেশন অব রিদমস)

আল ফারাবি একজন উর্বর লেখক ছিলেন, যার লেখার প্রধান দিক ছিল নিওপ্লেটোনিজম এবং লেখার স্টাইল ছিল অ্যারিস্টটলীয়। তার একটি ভালো দিক ছিল এই যে তিনি নিজ দর্শন প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে অসংখ্য দার্শনিক এবং তাদের দর্শনের কথা আলোচনা করেছেন। অন্যদিকে তার লেখা রাজনৈতিক ট্রিটিগুলো মধ্যযুগের সবচেয়ে প্রভাবশালী ইহুদি দার্শনিক ম্যামোনাইডসকেও প্রভাবিত করেছিল। তিনি আল ফারাবিকে মুসলিমদের মধ্যে প্রথম যুক্তিবাদী বলে আখ্যায়িত করেছেন। এজন্য তাকে মুয়াল্লিম আছ-ছানী বলা হয়।

মৃত্যু:
আল ফারাবি শেষ জীবনে সিরিয়ার আলেপ্পোতে বসবাস শুরু করেন। সেখানেই ৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যু বরণ করেন।

তথ্যসূত্রঃ
1. আল ফারাবি ইসলামী দর্শনে এক গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক, রোদ্দুরে ডটকম।
2. দর্শনকোষ সরদার ফজলুল করিম।
3. বিশিষ্ট দার্শনিক আল ফারাবি
4. উইকিপিডিয়া

লিখেছেন— Raqib Hussain

মঙ্গলবার, ২৬ জুলাই, ২০২২

ইখতিয়ার উদ্দীন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি কে দেওয়া অপবাদ | Muhammad Bakhtiyar Khalji


১২০৪ সালে মাত্র ১৭ জন্য সৈন্য নিয়ে বাংলা জয়ে করেছিলেন বখতিয়ার খিলজি। হিন্দু এবং সেকুলাঙ্গার ঐতিহাসিকেরা বঙ্গবিজয়ী মহান মুজাহিদ ইখতিয়ার উদ্দীন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজিকে বিতর্কিত করতে যে অপবাদগুলো দেয় সেই অভিযোগগুলো নিচে দেওয়া হলো। সাধারন মুসলমানরাও এদের মিথ্যাচারে বিভ্রান্ত হয়ে বঙ্গবিজয়ী এই মহান মুজাহিদ সম্বন্ধে বিরূপ ধারণা পোষণ করে থাকেন।

এখন আসুন দেখা যাক এগুলোর সত্যতা কতটুকু..

১: নদীয়াতে গনহত্যা- ভাগীরথীর তীরে অবস্থিত তৎকালীন নদিয়া ছিলো হিন্দুদের অন্যতম একটি তীর্থস্থান। এখানে বসবাস ছিল হিন্দু এলিট শ্রেণীর, লক্ষ্মণসেন নিজের শেষ সময়টা কাটানোর জন্য এটি বেচে নেন।অধীবাসীদের বেশিরভাগই ছিলো ব্রাহ্মণ,এদের চরিত্র সম্বন্ধে বলার প্রয়োজন মনে করছিনা। খলজীর নদীয়া আক্রমণের প্রায় বছর দুয়েক আগেই এরা সুযোগ বুঝে পালাতে থাকে,কারণ খলজীর প্রভাব বিস্তার সম্পর্কে এরা অবগত ছিল। খলজী নদীয়া আক্রমণ করেন পশ্চিম সীমান্তের ঝাড়খন্ডের দূর্গম জঙ্গলের ভিতর দিয়ে। তো ভাই, এই দূর্গম জঙ্গলের ভিতর খলজী গণহত্যা কার উপর চালিয়েছেন গাছের উপর.!! তিনি যখন মূল শহরে প্রবেশ করেন তখন তাঁর সঙ্গে ছিলো মাত্র ১৭ জন!যদিও ধরেনিই এই সতেরো জন সৈন্য নিয়েই তিনি গণহত্যা চালাচ্ছিলেন,তখন হিন্দু মহাবীরেরা কি করছিল! এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যেমন তাদের কাছে নেই,তাদের দাবি করা অভিযোগগুলোর বিষয়েও তাদের কাছে কোন ঐতিহাসিক দলীল নেই। সত্য হলো বখতিয়ার কোন গনহত্যা চালান নি।

২: নালান্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংশ- বিহারে অবস্থিত নালন্দা কিন্তু হিন্দুদের কোন মানমন্দির নয়,এটি উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে বৌদ্ধদের দ্বারা,এটা পরিচালিতও হতো বৌদ্ধদের দ্বারা।

নালন্দা মোট তিনবার আক্রান্ত হয়—
• প্রথম আক্রমণের শিকার হয় প্রতিষ্ঠার একশত বছরের মধ্যে হুনদের দ্বারা।
• দ্বিতীয় আক্রমণের শিকার হয় হিন্দুদের মহারাজা শশাঙ্কের হাতে।

[ঐতিহাসিক ডিডি গোস্বামী এ সম্পর্কে বলেন,,সর্বপ্রথম এই মহাবিহারের উপর আক্রমণ আসে শশাঙ্ক নরেন্দ্রগুপ্তের দ্বারা। তার বৌদ্ধ বিদ্বেষ এতোটাই তীব্র ছিল যে পশ্চিমবঙ্গ থেকে সেনাবাহিনী নিয়ে এসে গাঙ্গেয় উপদ্বীপ দখল বৌদ্ধ অনুরুক্ত হর্ষবর্ধনকে হত্যার করার পর বোধিবৃক্ষকে উপড়ে নদীতে ফেলে দেন, বৌদ্ধের পদচিহ্ন ধ্বংস করেন। নালন্দার প্রভূত ক্ষতি সাধন করেন তিনি,চীনা পর্যটক হিউয়েন সাঙ্গের আগমনের সময়ও নালন্দা তার দৈন্যদশা থেকে বের হতে পারে নি।]


• তৃতীয় আক্রমণ হয় এক বহিঃশত্রু দ্বারা ১১৯৩ সালে, এই সময় নালন্দা পুরোপুরি ভস্মীভূত করা হয়। এই আক্রমণের সময়কাল নিয়ে কোন সন্দেহ নেই।

এখন আসুন, খলজীর দিকে ফিরে যায়। হিন্দু রাজ ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকারের ভাষায়,খলজী হিন্দুস্থানে আসেন ১১৯৫ সালে,হুসাম উদ্দীনের কাছে কাজ পান ১১৯৬ সালে, উদন্তপুরী বিহার আক্রমণ করেন ১১৯৯ সালে,ইরফান হাবিবের ভাষ্যমতে ১১৯৯ সালে দক্ষিণ বিহারে অভিযান চালিয়ে খলজী গোবিন্দপালকে পরাজিত করেন। নালন্দা থেকে এর দূরত্ব প্রায় পঞ্চান্ন কিলোমিটার, তাবাকাতে নাসিরিতে যে টিকিওয়ালা ব্রাহ্মণদের হত্যা এবং মন্দির ধ্বংসের কথা বলা হয়েছে, এটি হচ্ছে মূলত বৌদ্ধদের এই উদন্তপুরী বিহার,খলজী দূর্গ ভেবে বিভ্রান্ত হয়ে এটি আক্রমণ করেন,যা ছিল লক্ষণসেনেরই চাল।

যদুনাথ সরকারের মতে খলজীর বাংলা আক্রমণ ছিলো ১২০১ সালে। এখানে সবচেয়ে মজার বিষয়টি হচ্ছে সকল ঐতিহাসিকের দাবি অনুযায়ী খলজী বঙ্গবিজয় করেন ১২০৪ সালের ১০ ই মে।অন্যদিকে অধিকাংশ ঐতিহাসিকদের মতে নালন্দাবিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করা হয় ১১৯৩ সালে। যে লোকটি বাংলায় আসেন ১২০৪ সালে,সে কি করে ১১৯৩ সালে নালন্দা ধ্বংস করলো তা ইতিহাস বিকৃতিকারীরাই ভালো বলতে পারবে।১১৯৩ সালে নালন্দা যার হাতে ধ্বংস হয়েছিল তিনি হচ্ছেন তীরহুতের হিন্দুরাজা অর্জুন, যার দায় চাপানো হয় মহান মুজাহিদ মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির উপর। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জান্নাতবাসী করুক।

৩. বিদেশী আক্রমণকারী- তুর্কিদের খলজী গোত্রের মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজিকে হিন্দু ঐতিহাসিকেরা প্রথম আক্রমণকারী হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করে। আসলেই কি খলজীই প্রথম বিদেশী, যিনি বাংলা আক্রমণ করেন!

উত্তর— এ দাবিটা সম্পূর্ণ ভুয়া। বৈদিক যুগের শেষদিকে হিন্দু আর্যরা প্রথম বাংলা আক্রমণ করেন,তবে তারা সফল না হলেও ব্রাক্ষণরা বাংলায় প্রভাব বিস্তার শুরু করে, এবং বাংলার অধিবাসীদের উপর জাতপাত প্রথা চাপিয়ে দেন। এরপর বাংলা আক্রমণ করে অবাঙ্গালী গুপ্ত হিন্দুরা বৌদ্ধদের উপর নির্যাতনের ফলে একসময়ের বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলা হয়ে উঠে হিন্দুদের অভয়ারণ্য। হুনদের আক্রমণে গুপ্তদের যখন পতন ঘটে বাংলা দখল করেন কর্ণাট দেশ থেকে আগত হিন্দু সেনরা,বৌদ্ধদের উপর অত্যাচার যথারীতি চলতে থাকে।

৫. ধর্মান্তরে বাধ্য করা- খলজিকে দেয়া আরেকটি অভিযোগ হচ্ছে তিনি নাকি গণহারে ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করেন এবং যারা অস্বীকার করে তাদের নৃশংসভাবে হত্যা করেন। এই অভিযোগটিও সম্পূর্ণ ভূয়া। খলজীর আগমনের অনেক আগেই এদেশে সুফি-দরবেশদের মাধ্যমে ইসলামের আগমন ঘটে।এসব সুফিদের মধ্যে অন্যতম পান্ডুয়ার সুফি শেখ তাবরীজি এবং তাঁর শিষ্যরা।তাদের আচরণে আকৃষ্ট হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বহু মুসলিম জনগোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল। সেইসময় মঙ্গোলিয়ানদের আক্রমন থেকে বাঁচতে মধ্য এশিয়া থেকে অনেক সুফি বখতিয়ার খিলজির আমন্ত্রণে তার রাজ্যে আসেন। সেসব সুফিদের ধর্মপ্রচারের কারনে মুসলিমদের সংখ্যা বেড়েছে।

৬. বাংলা লুণ্ঠনের জন্য অভিযান- এই অভিযোগটি খোদ একশ্রেণির কথিত মুসলমানদের মধ্যেও দেখা যায়! তিনি বাংলা আক্রমণ করলেন কেন, এসবের কি দরকার ছিল?

উত্তর:- সেসব কুলাংগারদের জেনে রাখা উচিত।কেয়ামতের ময়দানে প্রত্যেক মুসলমানকেই তাঁর প্রতিবেশী অমুসলিম ভাইয়ের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, আশপাশের অমুসলিমদের সে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিল কিনা? তিনি যদি বাংলা আক্রমণ না করতেন আমরা এখনো কুফরীতেই লিপ্ত থাকতাম। নিজেরা নামে মুসলিম পরিচয়টাও দিতে পারতাম কিনা সন্দেহ!! তাঁর বাংলা আক্রমণের কারণ হিসেবে ধরতে গেলে প্রথমত স্থানীয় মুসলমানদের উপর হিন্দুদের অত্যাচার,এর পর আসে ইসলাম সম্পর্কে এই ভুখন্ডের অধীবাসীদের আগ্রহ। যদি তা না হতো তাঁর আক্রমণের সময় গণপ্রতিরোধ গড়ে উঠতো,তা না হওয়ায় বুঝা যায় তারা এই অভিযানকে খুশিমনেই নিয়েছিলো। দ্বিতীয়ত হিন্দুদের হাতে নির্যাতিত বৌদ্ধদের আমন্ত্রণ। রাজ্যবিস্তার একজন বীরের সহজাত প্রবৃত্তি,আর খলজী ছিলেন একজন সেনানায়ক এবং দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। রাষ্ট্রিয়ভাবে বাঙ্গালীদের উপর হিন্দুধর্ম চাপিয়ে দেয়া সম্রাট অশোক,নালন্দা ধ্বংসকারী শশাঙ্ক যদি হিন্দুদের কাছে বীর হয়,উন্নত চরিত্র দিয়ে ইসলাম প্রচারকারী মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি আমাদের কাছে হওয়া দরকার ছিলো মহাবীর।কিন্তু আফসোস, শতকরা ৯০% মুসলমান তাঁকে লুণ্ঠনকারী হিসেবেই চিনে।

কবি আল মাহমুদের ভাষায় বখতিয়ার খিলজি,

"আল্লার সেপাই তিনি, দুঃখীদের রাজা।
যেখানে আজান দিতে ভয় পান মোমেনেরা,
আর মানুষ করে মানুষের পূজা,
সেখানেই আসেন তিনি।
খিলজীদের শাদা ঘোড়ার সোয়ারি।
দ্যাখো দ্যাখো জালিম পালায় খিড়কি দিয়ে
দ্যাখো, দ্যাখো।" 

(কবিতা- বখতিয়ারের ঘোড়া)

সোমবার, ২৫ জুলাই, ২০২২

মুতার যুদ্ধের ঘটনা ও ফলাফল | Battle of Mu'tah


হুদাইবিয়া সন্ধি শেষ হলো। মক্কার কাফেরদের থেকে মুসলমানগণ এখন নিরাপদ। তাই রাসূলে কারীম  (ﷺ) পৃথিবীর শাসকবর্গের নিকট ইসলামের দাওয়াতী পত্র প্রেরণের সিদ্ধান্ত নিলেন। পত্র পাঠালেন খসরু-হিরাকল, শুরাহবিল-আম্মারসহ আরো অনেকের নিকটই। কেউ ইসলামের শীতল ছায়ায় আশ্রয় নিলো,আবার কেউ কুফুরের অতল গহ্বরে ডুবে রইলো। শুরাহবিল ছিলো সে হতভাগাদের একজন।


রাসূলে কারীম (ﷺ) হারিছ ইবনে ওমায়ের (রাযি) কে বসরার গভর্নর শুরাহবিল ইবনে আমরের দরবারে পাঠান। সে ইবনে ওমায়ের (রাযি.) কে প্রথমে বাঁধার নির্দেশ দেয়, অতঃপর শহীদ করে।

এ সংবাদ রাসূলের নিকট পৌঁছলে তিনি ভীষণ মর্মাহত হলেন এবং একটি সৈন্যদল গঠন করেন। কারণ দূত হত্যা ছিলো সর্বযুগেই জঘন্য অপরাধ। কিন্তু ইসলাম বিদ্বেষ এমনই অন্ধ করে রেখেছিলো তাদেরকে যে,নীতি ও নৈতিকতা সবকিছু বিসর্জন দিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হতো না তারা। রাসূলে কারীম (ﷺ)  হযরত যায়েদ (রাযি.) কে সেনাপতি ঘোষণা করে তিন হাজারের একটি বাহিনী গঠন করেন। আর ওছীয়ত করে দেন,‘ যদি যায়েদ শহীদ হয়, তাহলে জা’ফর বিন আবী তালিব সেনাপতি হবে,যদি সে শহীদ হয়, তাহলে আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা ঝাণ্ডা হাতে তোলে নিবে।

মুসলিমবাহিনী মদীনা থেকে যাত্রা করলেন। মা’আন নামক স্থানে যাত্রাবিরতি দিলেন। খবর পৌঁছলো, খোদ রোমসম্রাট হিরাক্লিয়াস একলক্ষ্য সৈন্যবহর নিয়ে বালকা' নামক স্থানে অবস্থান করছে।[১] স্বভাবতই মুসলিম বাহিনীতে কিছুটা চিন্তা-ভাবনা ও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দেখা দিলো। নিজেদের শলা-পরামর্শে সাহাবায়ে কেরাম সিদ্ধান্ত নিলেন, রাসূল (ﷺ) কে এ সম্পর্কে অবগত করবেন এবং পরবর্তী সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করবেন। কিন্তু হযরত আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা রাযি. দৃঢ়তার সঙ্গে এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করলেন এবং বললেন,
‘‘হে রাসূলের সাহাবাগণ! কী হলো তোমাদের, শত্রুর সংখ্যাধিক্যে কেন তোমরা চিন্তিত? আমরা সংখ্যা-শক্তির ভিত্তিতে লড়াই করি না। মনে রেখো,বিজয়ের বেশে ঘরে ফিরে যাওয়ার জন্য আমরা আসিনি। আমরা এসেছি শাহাদাতের আবে-হায়াতে ঠোঁট ভিজিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করতে। সুতরাং অগ্রসর হও,ঝাঁপিয়ে পড়ো এবং রক্তের দরিয়ায় সাঁতার দিয়ে জান্নাতের সবুজ বাগিচায় গিয়ে হাজির হও’’! 

সিপাহসালারের এ ভাষণ শুনে মুজাহিদদের হৃদয়ে যেন ঈমানের বিদ্যুৎ প্রবাহিত হলো এবং শাহাদাতের তামান্নায় তাঁরা জিহাদের ময়দানে অগ্রসর হতে লাগলেন। বালকা’ সীমান্তে পৌঁছলে মুশারিফ নামক স্থানে রোমানদের মুখোমুখি হলেন, শত্রুরা অগ্রসর হলে তারা মূতা নামক গ্রামে সমবেত হোন,এখানেই সংঘটিত হয় ‘ঐতিহাসিক মূতার যুদ্ধ’! [২]

মূতার প্রাঙ্গণে সারিবদ্ধ দু’দল। হক-বাতিলের যুদ্ধ। ঈমান ও কুফুরের লড়াই, যা চলতে থাকবে কেয়ামত পর্যন্ত। যু্দ্ধে রোমানদের সংখ্যা দেড় লাখ, বিপরীতে মুসলমানদের সংখ্যা ছিলো মাত্র তিন হাজার! বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও এটা বাস্তব সত্য। যেন পিঁপড়ে-হাতির লড়াই!

তাকবীরের ধ্বনি তোলে সাহাবীগণ এগিয়ে গেলেন। হযরত যায়েদের হাতে রাসূলের প্রদত্ত সে হেলালী ঝাণ্ডা। শুরু হলো তুমুল যুদ্ধ। পিঁপড়ে-হাতির লড়াই মনে হলেও বাস্তবে যেন বাঘ-সিংহের লড়াই! হযরত যায়েদ বীরবিক্রমে যুদ্ধ করতে লাগলেন, কিন্তু একসময় বল্লমের আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে গেলো গোটা দেহ। ঝাণ্ডা হাতে নিলেন হযরত জা’ফর বিন আবি তালিব রাযি.। যুদ্ধের চাপ বেড়ে যাওয়ায় তিনি অশ্বপিঠ থেকে নেমে পড়লেন এবং যুদ্ধ করতে থাকলেন। এমতাবস্থায় কাফেরের আঘাতে তার ডানহাত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। তিনি বামহাতে ঝাণ্ডা নিলেন। কিন্তু এ হাতও কেটে ফেললো। অতঃপর তিনি উভয় বাহু দ্বারা ঝাণ্ডাটি ঝাঁপটে ধরলেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যে শহীদ হয়ে গেলেন। [৩]

জা’ফর রাযি. এর শাহাদাতের পর রাসূলের মনোনীত সর্বশেষ সেনাপতি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রাযি. ঝাণ্ডা হাতে নিলেন। অশ্বপিঠে চড়ে তিনি শত্রুদের দিকে এগিয়ে গেলেন এবং শত্রুর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করলেন।

অতঃপর ছাবিত ইবনে আরকাম রাযি. ঝাণ্ডা হাতে নিয়ে জনতার প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানালেন,‘‘হে মুসলিম জনতা, তোমরা শলা-পরামর্শের মাধ্যমে একজনকে সেনাপতি নিযুক্ত করো! জবাবে তারা বললেন; আপনি তো আছেনই। তখন তিনি বললেন, না আমি এর যোগ্য নই’’। তখন সকলের পরামর্শের ভিত্তিতে হযরত খালেদ বিন ওয়ালীদ রাযি. সেনাপতি নিযুক্ত করেন।

প্রিয় নবীর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী মুসলিম বাহিনীর তিন সিপাহসালার একে একে শহীদ হয়েছেন। এখন মুহূর্তে ঝাণ্ডা হাতে তুলে নিলেন মহাবীর হযরত খালেদ বিন ওয়ালীদ।
হযরত খালেদ রাযি. এর নেতৃত্বে আবারো শুরু হলো তুমুল যুদ্ধ। কটুকাটা হচ্ছিলো শত-সহস্র কাফের। রক্তক্ষয়ী এ যুদ্ধের বর্ণনা পাওয়া যায় স্বয়ং হযরত খালেদ রাযি. এর থেকে। তিনি বলেন, ‘‘মূতার যু্দ্ধে আমার হাতে নয়টি তরবারী ভেঙ্গে ছিলো,শুধু মাত্র ছোট একটি ইয়ামানী তরবারী অবশিষ্ট ছিলো’’! সন্ধা হলে যু্দ্ধবিরতির ঘোষণা হলো। রাতের বেলা হযরত খালেদ রাযি. অভিনব এক কৌশল অবলম্বন করলেন। সৈন্যদের তিনি নতুনভাবে ঢেলে সাজালেন। পিছনের সারির সৈন্যদের সামনে ও সামনের সারির সৈন্যদের পিছনে নিয়ে গেলেন এবং ডান সারির সৈন্যের বামে ও বাম সারির সৈন্যদের ডানে রদবদল করলেন। তাঁর এ কৌশল ছিলো অতি উচ্চ সামরিক দূরদর্শিতার পরিচয়!

পরদিন ভোরবেলা। সৈন্যদের তাকবীর-ধ্বনিতে প্রকম্পিত হলো গোটা রণাঙ্গন। হতবিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রােমান সেনারা। ভাবলো মদীনা থেকে তাজাদম সৈন্যের যোগান চলে এসেছে। কানাঘুষা শুরু হলো,‘ক্ষুদ্র এ বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে যদি এতই নাজেহাল হতে হয়, নতুন সে বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করে নিজেদের বিপদে ফেলা আহম্মকি ছাড়া কিছু নয়’!

আল্লাহ পাক কাফেরদের মনে ভীতি সঞ্চার করেছেন। এরপর তারা পিছু হটা শুরু করলো। মুজাহিদগণও তাদের ধাওয়া করাটা সমীচীন মনে করেননি। পরিশেষে তারাও মদীনায় ফিরে আসলেন।

আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদের বিজয় দান করলেন। এ বিজয়ের ফলে আরবের আরো অনেক গোত্র ইসলামের শীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করে। বিশ্ববাসীর নিকট মুসলমানদের শৌর্যবীর্য নতুনভাবে প্রকাশিত হয় এবং একথার পুনঃপ্রকাশ ঘটে, “মুসলমানরা সংখ্যা-শক্তির ভিত্তিতে লড়াই করে না, বরং তারা নিজ ঈমানের বলে এবং মহান আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে যু্দ্ধ করে”।

➤[১]বনু লাখাম,জুযাম,বালকীনসহ আরো অনেক গোত্র তাদের সঙ্গে যোগদান করেছিলো।
➤[২]মূতা পূর্ব জর্ডানের কির্ক শহরের দক্ষিণে ১২ কি.মি. দূরত্বে অবস্থিত। মদীনা ও মূতার দূরত্ব ছিলো প্রায় ১১০০ কি.মি.
➤ [৩] শাহাদাতের পর দেখা যায় তাঁর শরীরে ৫০টির বেশী যখমের চিহ্ন ছিলো, অন্য বর্ণনায় ৯৩টির কথা বলা হয়েছে।

তথ্যসূত্র
-সীরাতে ইবনে হিশাম
-আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া
-আররাহীকুল মাখতূম
-নবীয়ে রহমত
-সীরাতে খাতামুল আম্বিয়া
-তোমাকে ভালোবাসি হে নবী!
-বিবিধ

শুক্রবার, ২২ জুলাই, ২০২২

আলী ইবনে আবী তালিবের (রা.) সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

আলী ইবনে আবি তালিবের সমাধি

আলী ইবনে আবী তালিব (আরবি: علي ابن أبي طالب‎, প্রতিবর্ণী. Ali ibn Abi Talib‎ ; আনু. ১৩ সেপ্টেম্বর ৬০১ – আনু. ২৯ জানুয়ারি ৬৬১)[৫][৬] ছিলেন ইসলামের নবী মুহম্মদের চাচাতো ভাই, জামাতা ও সাহাবি যিনি ৬৫৬ থেকে ৬৬১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত খলিফা হিসেবে মুসলিম বিশ্ব শাসন করেন। সুন্নি ইসলাম অনুসারে তিনি চতুর্থ রাশিদুন খলিফা। তিনি ছিলেন আবু তালিব ইবনে আবদুল মুত্তালিব ও ফাতিমা বিনতে আসাদের পুত্র, ফাতিমার স্বামী এবং হাসান ও হোসাইনের পিতা।

পরিচিতির কারণ- জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বীরত্ব, সাহসিকতা, নেতৃত্ব, আধ্যাত্মিকতা, দার্শনিকতা, বাগ্মিতা, ন্যায়বিচার

জন্ম ও বংশপরিচয়ঃ
আলী মক্কায় কুরাইশ বংশে আনুমানিক ৬০১ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। এই বংশের দ্বায়িত্ব ছিল পবিত্র কাবার রক্ষণাবেক্ষণ করা। এই বংশের একটি শাখা হচ্ছে হাশেমি। আলীর মাতা ও পিতা উভয়েই হাশেমি বংশের ছিলেন। আলীর পিতা আবু তালিব কাবা'র প্রহরী এবং শক্তিশালী কুরাইশ গোত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা বানু হাশিমের শেখ ছিলেন৷ আলীর দাদা বনি হাশিম বংশের কিছু সদস্যসহ হানিফ ছিলেন বা উত্থানের পূর্বে একেশ্বরবাদী বিশ্বাস পদ্ধতির অনুসারী ছিলেন।তাঁর পিতা ছিলেন আবু তালিব ইবনে আবদুল মুত্তালিব এবং মাতা ফাতিমা বিনতে আসাদ।ইসলামের ইতিহাসে তিনি সর্বপ্রথম নবুয়ত ডাকে সাড়া দিয়ে মাত্র ১০ বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনিই প্রথম পুরুষ মানুষ যিনি ইসলাম ধর্মগ্রহণ করেছিলেন ও তিনি পুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম যিনি মুহাম্মাদের সাথে নামাজ আদায় করেন। বদর যুদ্ধ বিশেষ বীরত্বের জন্য মুহাম্মদ তাঁকে জুলফিকার নামক তরবারি উপহার দেন।

কুফায় গুপ্তহত্যাঃ
৪০ হিজরীর ১৯শে রমজান বা ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দের ২৭শে জানুয়ারি মসজিদে কুফায় নামাজ পড়ার সময় তিনি, খারেজী আব্দুর রহমান ইবনে মুলজাম কর্তৃক হামলার শিকার হন। তিনি নামাজে সেজদা দেওয়ার সময় ইবনে মুলজামের বিষ-মাখানো তরবারী দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হন।[৩০] আলী তার পুত্রকে নির্দেশ দেন কেউ যেন খারেজীদের আক্রমণ না করে, তার বদলে তিনি নির্দেশ দেন যে, যদি তিনি বেঁচে যান, তবে যেন ইবনে মুলজামকে ক্ষমা করে দেয়া হয়; আর যদি তিনি মারা যান, তবে ইবনে মুলজামকে যেন নিজ আঘাতের সমতুল্য একটি আঘাত করা হয় (তাতে ইবনে মুলজামের মৃত্যু হোক বা না হোক।)।[৩১] আলী হামলার দুদিন পর ২৯শে জানুয়ারি ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দে (২১শে রমজান ৪০ হিজরী) মৃত্যুবরণ করেন।

মুহম্মদের ﷺ নেতৃত্বাধীন যুদ্ধসমূহঃ

বদরের যুদ্ধঃ বদরের যুদ্ধ ২ হিজরির ১৭ রমজান মদিনার মুসলিম ও মক্কার কুরাইশদের মধ্যে সংঘটিত হয়। ইসলামের ইতিহাসে এটি প্রথম প্রধান যুদ্ধ। এতে জয়ের ফলে মুসলিমদের ক্ষমতা পূর্বের তুলনায় বৃদ্ধি পায়।

উহুদের যুদ্ধঃ উহুদের যুদ্ধ ৩ হিজরির ৭ শাওয়াল উহুদ পর্বতের সংলগ্ন স্থানে সংঘটিত হয়। মদিনার মুসলিম ও মক্কার কুরাইশদের মধ্যে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। এই দুই পক্ষের নেতৃত্বে ছিলেন যথাক্রমে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ও আবু সুফিয়ান। ইসলামের ইতিহাসে সংঘটিত প্রধান যুদ্ধসমূহের মধ্যে এটি দ্বিতীয়। এর পূর্বে ৬২৪ সালে এই দুইপক্ষের মধ্যে বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।

খন্দকের যুদ্ধঃ খন্দকের যুদ্ধ বা আহযাবের যুদ্ধ ৫ হিজরিতে সংঘটিত হয়। এসময় ২৭দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলি মদিনা অবরোধ করে রাখে। জোট বাহিনীর সেনাসংখ্যা ছিল প্রায় ১০,০০০ এবং সেসাথে তাদের ৬০০ ঘোড়া ও কিছু উট ছিল। অন্যদিকে মদিনার বাহিনীতে সেনাসংখ্যা ছিল ৩,০০০।

ফাদাক বিজয়ঃ ফাদাক বিজয় ৬২৮ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে এবং হিজরী ৭ম সনের দ্বিতীয় মাসে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

খায়বারের যুদ্ধঃ খায়বারের যুদ্ধ ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন আরবের মদিনা নগরী থেকে ১৫০ কিলোমিটার (৯৩ মা) দুরে অবস্থিত খায়বার নামক মরুভূমিতে বসবাসরত ইহুদিগণের সাথে মুসলিমগণের সঙ্ঘটিত একটি যুদ্ধ। মুসলিমদের ইতিহাস অনুসারে, মুসলিমগণ সেখানে দুর্গে আশ্রয় নেয়া ইহুদিদেরকে আক্রমণ করেছিল ।

মুতার যুদ্ধঃ মুতার যুদ্ধ (আরবি: معركة مؤتة, غزوة مؤتة‎‎) হলো মুতার প্রান্তে মুসলমান ও রোমানদের মাঝের একটি যুদ্ধ।

আল-ফুলস অভিযানঃ বনু তাই গোত্রের বিরুদ্ধে আলী ইবনে আবি তালিবের অভিযান, আগস্ট ৬৩০ খ্রিস্টাব্দ, ৯হিঃ, ইসলামী ক্যালেন্ডারের দ্বিতীয় মাসে সংঘটিত হয়। পৌত্তলিক দেবতা আল-ফুলস (আল-কুল্লুস) এর মূর্তি (মূর্তি) ধ্বংস করা।

মক্কা বিজয়ঃ ইসলামের নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) খ্রিস্টীয় ৬৩০ অব্দে রক্তপাতহীনভাবে মক্কা নগরী জয় করেন। ইতিহাসে এই ঘটনা মক্কা বিজয় নামে খ্যাত। ঐতিহাসিকদের মতে মক্কা বিজয় ইসলামের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ বিজয়। এই বিজয়ের ফলে মুসলমানদের পক্ষে আরবের অন্যান্য এলাকা বিজয় করা সহজসাধ্য হয়ে পড়ে।

হুনাইনের যুদ্ধঃ গাজওয়া এ হুনাইন নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) ও তার অনুসারীগণ কর্তৃক বেদুঈন গোত্র হাওয়াজিন ও তার উপশাখা সাকিফ এর বিরুদ্ধে মক্কা থেকে তাইফের পথে একটি রাস্তায় ৬৩০ সালে লড়াইকৃত একটি যুদ্ধ। মুসলিমদের বিজয়ের মাধ্যমে যুদ্ধটি সমাপ্ত হয়, তারা অসংখ্য গনিমতের মাল দখল করে নেয়। সূরা তওবাতে এই যুদ্ধের উল্লেখ আছে, যা কুরআনে উল্লেখিত স্বল্পসংখ্যক যুদ্ধের মধ্যে অন্যতম।

হামদান অভিযানঃ আলী ইবনে আবি তালিবের অভিযান, ইয়েমেনের জনগণকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করার জন্য ১০ হিজরি বা ৬৩১ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত হয়েছিল।

উটের যুদ্ধঃ ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দের শেষের দিকে ইরাকের বসরায় সংঘটিত হয়। এটি ইসলামের ইতিহাসের প্রথম গৃহযুদ্ধ যা উটের যুদ্ধ বা উষ্ট্রের যুদ্ধ বা (Arabic জামালের যুদ্ধ) বা (English: Battle of the Camel) নামে পরিচিত। এই যুদ্ধ ছিল ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রাঃ) এর বিরুদ্ধে তালহা-হযরতজুবায়ের (রাঃ) ও আয়েশা সম্মলিত যুদ্ধ।

সিফফিনের যুদ্ধঃ সিফিনের যুদ্ধ ছিল উটের যুদ্ধের পরে প্রথম ফিতনার দ্বিতীয় যুদ্ধ। রাশিদুন খলিফাদের চতুর্থ আলী ইবনে আবি তালিব এবং প্রথম মুয়াবিয়া এর মধ্যে লড়াই হয় বর্তমান সিরিয়ার শহর রাক্কার আশেপাশে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে সিফফিন নামক স্থানে। যুদ্ধের দুই মাসেরও বেশি সময় আগে সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে শিবির করে এবং অবশেষে ২৬ জুলাই আলীর সেনাবাহিনীতে হামলা চালানো হয় এবং যুদ্ধ ২৮ জুলাই পর্যন্ত চলে । যুদ্ধ শেষ হয় যখন সিরিয়ার সেনাবাহিনীকে উৎখাত করা হয় কিন্তু হঠাৎ করে উভয় পক্ষ সালিশির বা আলোচনার মাধ্যমে তাদের দ্বন্দ্ব নিষ্পত্তি করতে সম্মত হয়।
 
নাহরাওয়ানের যুদ্ধঃ ইসলামের প্রথম গৃহযুদ্ধের অন্যতম নাহরাওয়ানের যুদ্ধ ৬৫৮ সালের জুলাই মাসে খলিফা হযরত আলী ইবনে আবি তালিব রা: এবং মুহাক্কামা নামক বিদ্রোহী দলের মধ্যে সংঘটিত হয়। নাহরাওয়ান বাগদাদ ও হেলওয়ানের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত একটি জায়গা। এই যুদ্ধটি ছিল মাওলা আলী রা: ও আমিরে শাম মুয়াবিয়া রা: এর মাঝে সংঘটিত সিফফিনের যুদ্ধের ফল, যে যুদ্ধটি বর্শার উপর কুরআন রেখে উত্তোলন করে মধ্যস্থতা চুক্তির মাধ্যমে শেষ হয়েছিল, যা ইশারা করে আল্লাহর কিতাব দিয়ে সালিশের প্রয়োজনীয়তাকে। সে সময় একটি দল সালিশ প্রত্যাখ্যান করে, তাদের সংখ্যা ছিল বারো হাজার, নেতৃত্বে ছিল আব্দুল্লাহ বিন ওয়াহব আল-রাসেবি, তারা সে সময় তাদের বিখ্যাত স্লোগান তুলেছিল: লা হুকমা ইল্লা লিল্লাহ। তাদের উপর আলী বিন আবি তালিবের সেনাবাহিনীর বিজয়ের মাধ্যমে এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। মুহাক্কামীদের মাত্র চল্লিশ জন বেঁচে যান। মুহাক্কামীরা হল খারেজীয়তের মূল এবং এই মিল্লাতের উৎপত্তিস্থল।